চেতনার রঙে রাঙানো বাংলা ভাষা

  মাহমুদা আক্তার নীনা ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চেতনার রঙে রাঙানো বাংলা ভাষা

প্রত্যেক রাসূলকেই আমি স্বজাতির ভাষা দিয়ে প্রেরণ করেছি, যেন তাদের (স্বজাতিকে) পরিষ্কারভাবে বুঝাতে পারে। (সূরা ইবরাহিম-৪ আয়াত)। নিজ ভাষায় আয়াতটি পাঠ করে চমকে গিয়ে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছি।

কেননা আমার অনুসন্ধানী মন কোরআনের মাঝে এমন কিছুরই সন্ধান করে ফিরছিল। এ আয়াতে মানবজাতিকে যেমন জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে তেমনি করেই প্রতিটি জাতিকে জাতিসত্তার ভাষা বা মাতৃভাষা চেতনায়ও উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে।

এ আয়াত সুস্পষ্টভাবেই বুঝিয়ে দেয় মাতৃভাষা চেতনা মানবীয় চেতনা। তাই তো বাস্তবেও দেখা যায় সূরা ইবরাহিমের ৪ আয়াতের আবেদন ও চেতনার সঙ্গে আমাদের মহান একুশের চেতনা মিলেমিশে একাকার। একটি থেকে আরেকটিকে আলাদা করা অসম্ভব। এ আয়াতে সব জাতির জন্যই যেমন বোঝার হুকুম জারি করে দেয়া হয়েছে, তেমনি বোঝার জন্য জাতিসত্তার ভাষা বা মাতৃভাষার পথটিও দেখিয়ে দেয়া হয়েছে।

যখনই আমি এ আয়াত স্মরণ করি তখনই আমি শিকড়ের টানে ফিরে আসি গভীর গবেষণার পথ ধরে। আরও উদ্যমে চলে আমার কোরআন ও পৃথিবীর বাস্তবতাভিত্তিক গবেষণা কাজ। সুস্পষ্টভাবেই বুঝতে পারি চেতনার রাঙানো পথ আলোকিত মাতৃভাষার পথেই আমাদের হাঁটতে হবে। যে পথ ধরে আল্লাহর নবী-রাসূলরা এবং আমাদের ভাষা শহীদরা চলে গেছেন বিজয়ের অভীষ্ঠ লক্ষ্যে। বীর শহীদরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে এ পথটিকে করে গেছেন খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি।

আল্লাহই তো সব নবী-রাসূলদের নিজ নিজ জাতিসত্তার ভাষায় কিতাব ও ওহি দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন তার কিতাবের শিক্ষা, জ্ঞান ও হেদায়েত যেমন সর্বজনীন, তেমনই মাতৃভাষাও সর্বজনীন ভাষা। তাই তো তিনি তার কিতাবের শিক্ষা থেকে বান্দাদের জাতিসত্তার ভাষা বা মুখের ভাষা মায়ের ভাষাকে বাদ দেননি। সুতরাং স্পষ্টই বোঝা যায় নিজ নিজ ভাষায় কোরআন পাঠ কিংবা শ্রবণে কোরআনের শিক্ষা ও জ্ঞান অর্জন করা সবার জন্যই ফরজ বা অপরিহার্য।

আল্লাহ কোরআন নাজিল করেছেন গোটা মানবজাতির জন্য রহমত হিসেবে, তেমনি রাসূলুল্লাহ (সা.) কেও প্রেরণ করা হয়েছে গোটা বিশ্বের জন্য রহমত হিসেবে। এ বিষয়ে কোরআনে পাকে আল্লাহ বলেন, ‘আমি আপনাকে (মুহাম্মদ) প্রেরণ করেছি বিশ্বজগতের জন্য রহমত করে (সূরা আম্বিয়া ১০৭ আয়াত)। কিন্তু আরবি ভাষার কারণে আরবি কোরআনকে আল্লাহ মক্কা ও তার পার্শ্ববর্তীদের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

এ বিষয়ে কোরআনের সূরা আশ-শুরার ৭নং আয়াত এবং সূরা আন আমের ৯২নং আয়াতে একইভাবে আল্লাহ বলেছেন, ‘এভাবেই আমি তোমার প্রতি আরবি কোরআন নাজিল করেছি, যেন এর মাধ্যমে তুমি মক্কাবাসী ও তার পার্শ্ববর্তীদের সতর্ক করতে পার।

মক্কাবাসী ও তার পার্শ্ববর্তীরা আরবি ভাষী বলে আল্লাহ আরবি ভাষার কোরআনকে তাদের জন্যই নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সুতরাং প্রশ্ন আসতে বাধ্য যে এর বাইরের জন্য জাতিরা সতর্ক হবে কী দিয়ে এবং কেমন করে? এ আয়াতের মর্মে বোঝাই যায় এর বাইরের (অনারবি ভাষার) লোকেরা সতর্ক হবে যার যার ভাষায় কোরআন ভাষান্তর বা অনুবাদ করে নিয়ে।

যেমন রাসূলুল্লাহ নিজের উপস্থিতিতেই ইথিওপিয়ার বাদশা নাজ্জাশির কাছে ইসলামের দাওয়াতপত্রে কোরআনের উদ্ধৃতি তুলে ধরেছেন ভাষান্তরের মাধ্যমে। এ ছাড়া রাসূলুল্লাহ (সা.) তার সাহাবি সালমান ফারসিকে ফারসি ভাষীদের জন্য সূরা ফাতিহাকে ভাষান্তর বা অনুবাদ করে দিতে বলেন। ভাষান্তর যদি অকল্যাণকর, অশুভ কিংবা অবৈধই হতো তাহলে রাসূলুল্লাহই এ কাজ থেকে বিরত থাকতেন এবং অন্যদের বিরত রাখতেন।

রাসূলুল্লাহর এ উদ্যোগ থেকেই বোঝা যায় কোরআন তো কোরআনই। বিষয়বস্তু ঠিক রেখে ভাষার পরিবর্তন প্রকৃতপক্ষে বাণী বা কথার পরিবর্তন নয়। কথা বা বাণীর ভাষা পরিবর্তনযোগ্য। আলেম শ্রেণী ও ধার্মিক শ্রেণীর অবশ্যই বাস্তববাদী হয়ে ব্যাখ্যা দিতে হবে।

আল্লাহ তার সৃষ্টির পরতে পরতে ছড়িয়ে দিয়েছেন তার উজ্জ্বল ও অপূর্ব নিদর্শন। তিনিই বিশ্বজগতের একমাত্র স্রষ্টা। স্রষ্টা তার কোরআনের পাতায় পাতায় তারই উল্লেখ করেছেন। বারবার বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ্র সৃষ্টির মাঝে জ্ঞানবানদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।

এ আয়াতগুলোই প্রাণের মাঝে দোলা দিয়েছে। দূরদর্শিতা এনেছে। যেমন দেখুন সূরা বাকারার ১৬৪নং আয়াত পাঠ করে। আল্লাহতায়ালা সূরা রুমের ২২ আয়াতে ঘোষণা করেছেন মানুষের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য তারই সৃষ্টির নিদর্শন। মুমিন ব্যক্তি কোরআনের দিকনির্দেশনাই মেনে চলে, কোরআনের ওপরই নির্ভর করে। কেননা আল্লাহ্ পাক কোরআনে মানুষকে সব বিষয়ের (মৌলিক) দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

তাই তো আল্লাহ্ বলেছেন, আসমান ও জমিনে এমন কোনো গোপন রহস্য নেই যা সুস্পষ্ট গ্রন্থে নেই। (সূরা নাহল-৭৫ আয়াত)। পৃথিবীর সব কিছুই আল্লাহর সৃষ্টি। তাই তো তিনি কোরআনে বলেন, পূর্ব ও পশ্চিম সবই আল্লাহর। অতএব, তুমি যেদিকেই মুখ ফিরাবে সেদিকেই আল্লাহ্ বিরাজমান। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সর্বব্যাপী সর্বজ্ঞান। (সূরা বাকারা-১১৫ আয়াত)।

যে কোরআন অনুসরণ করে চলে, কোরআনই তার জন্য যথেষ্ট। কেননা এ কোরআন মানবজাতির জন্য আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত ও অনুগ্রহ। কোরআনের জ্ঞান ও শিক্ষা মানবজাতির জন্য আল্লাহর রহমত ও হেদায়েত।

এ বিষয়ে আল্লাহ্ বলেন, নিঃসন্দেহে এ (কিতাব) হচ্ছে ইমানদারদের জন্য হেদায়েত ও রহমত।’ (সূরা নাহল-৭৭ আয়াত)। এ ছাড়াও অন্যত্র আল্লাহ্ বলেন, কোরআন হচ্ছে মানব জাতির জন্য হেদায়েত বা সরল-সঠিক পথের দিশা, সৎপথের সুস্পষ্ট নিদর্শন, (হক-বাতিলের) পার্থক্যকারী।’ (সূরা বাকারা-১৮৫ আয়াত)।

হে যুগের তরুণ আলেম সমাজ প্রবীণ আলেমদের মতো ভাষা নিয়ে অন্ধ গোঁড়ামিতে ডুবে না থেকে অনুভূতির চোখ মেলে তাকিয়ে দেখুন, ভাষার আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তা ও গবেষণা করুন, সত্য উপলব্ধির চেষ্টা করুন। দেখুন না কোরআনে আল্লাহ্ কত সুন্দরভাবেই না উল্লেখ করেছেন। ‘আমি আপনার ওপর এ কিতাব এ জন্যই অবতীর্ণ করেছি যেন আপনি তাদের সামনে এ বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে পেশ করতে পারেন, যে বিষয়ে তারা মতানৈক্য করেছে।

বস্তুত এ কিতাব হচ্ছে ইমানদারদের জন্য আল্লাহর হেদায়েত ও রহমত। (সূরা নাহল, ৬৪ আয়াত)। এ ছাড়া সূরা বাকারার শুরুতেই আল্লাহ্ বলেন, ‘এই সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। তা মুত্তাকিদের জন্য পথপ্রদর্শক।’ সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায় কোরআন হচ্ছে মুমিনের পরম বন্ধু। পথের সঙ্গী। দীর্ঘদিন ধরে মাতৃভাষায় নামাজ-কোরআন পাঠ করছি মর্মে মর্মে তার সত্যকে উপলব্ধি করছি, হৃদয় ভরে লাভ করছি অমৃতের স্বাদ। তাই বলছি সবাই মাতৃভাষায় বুঝে নিয়ে নামাজ-কোরআন পড়ুন।

আল্লাহতায়ালা কোরআন নাজিল করেছেন মানবজাতির দেহায়েতের জন্য, শিক্ষা ও জ্ঞানদানের জন্য। মানুষ যেন অতি সহজে হেদায়েত পেতে পারে, তা বুঝতে পারে। তাই তো তিনি সব জাতির ভাষায় তার শিক্ষা ও জ্ঞানদান করেছেন।

সুতরাং কোরআন পাঠ করতে হবে হেদায়েতের জন্য। কিন্তু না বুঝলে হেদায়েত হয় না। হবেও না। কোরআন যেহেতু আল্লাহর শিক্ষা ও জ্ঞান তাই তা সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত ও রহমত। যে তা না বুঝে পাঠ করল সে তার হেদায়েত, রহমত বিশ্বাস নেয়ামত কিছুই উপলব্ধি করতে পারল না, কিছুই পেল না। যে কোরআন বুঝল না ও জানল না সে তার প্রকৃত স্বাদই পেল না।

অন্যের কথামতো যারা অক্ষরপ্রতি দশ নেকির জন্য পড়েন তারা তো মেতে রইলেন শুভঙ্করের ফাঁকিতে। যারা আরবি ভাষার সঙ্গে মাতৃভাষাও পাঠ করেন তাদের ক্ষেত্রে বলার কিছুই নেই। কিন্তু যারা না বুঝেই আরবি পাঠ করেন, তাদের বলছি, না বুঝে আরবি ভাষায় নয় বরং মাতৃভাষায় (বুঝে) কোরআন নামাজ পড়ুন।

কেননা আল্লাহর সব অনারব নবী-রাসূলই নিজ নিজ মাতৃভাষা ও স্বজাতির ভাষা ও অনারবি ভাষা দিয়েই নামাজ-কিতাব পাঠ করেছেন। আর আল্লাহ পাক বিশ্ব মানবতার ভাষা-বৈচিত্র্যকেই তার সৃষ্টির নিদর্শন করে সৃষ্টি করেছেন।

বিশ্ব মানবতার ভাষাগত ঐক্যকে তার সৃষ্টির নিদর্শন করেননি তথাপি বৃহৎ ও শক্তিশালী জাতিরা ক্ষুদ্র ও দুর্বল জাতির ওপর নিজেদের ভাষা চাপিয়ে দিয়ে বিশ্বের দিকে দিকে ভাষা হত্যা করে চলেছেন। এখনও বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার মাতৃভাষা মুমূর্ষু অবস্থায়, মৃত্যুর অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।

বিশ্ববাসীকে ভাষা চেতনায় জাগিয়ে তুলুন, রোধ করুন ভাষা হত্যা ও জারি করুন আল্লাহ্র নিদর্শন।

Mahmuda [email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×