বিশ্ব ইজতেমার সঙ্গে যুগান্তরের দুই দশক

  আল ফাতাহ মামুন ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘আলহামদুলিল্লাহ! অবশেষে সুন্দরভাবেই ইজতেমা হবে!’ একজন আরেকজনকে বলছে। ‘হ্যাঁ। আল্লাহর খাস রহমত না থাকলে এত দ্রুত মীমাংসা হতো না।’ অন্যজন বলল। ‘এখানে কিন্তু মিডিয়ার অবদানও ছিল ভাই।’ মাঝখানে আমি বললাম। দু’জন ঘুরে তাকাল আমার দিকে। সত্তরোর্ধ্ব দুই মুরব্বির মাঝে আমার কথা বলাটা বোধ হয় ঠিক হয়নি। আবার এমন জ্বলজ্যান্ত সত্য না বলেও থাকতে পারছিলাম না।

আসর নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে বেরোনোর সময় কানে লাগে তাদের কথোপকথোন। তাদের একজন আমাকে খুব পরখ করছিলেন। অনেকক্ষণ পর রুমালের খুঁটে চশমা মুছতে মুছতে বললেন, ‘মেরে ব্যাটা! তুম আচ্ছা বলতে হ্যায়।’ আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, ‘বাবা! তোমার কি সময় হবে?’ বলেই আমার হাত ধরে মসজিদের ভেতর নিয়ে যান। প্রথমে ভেবেছি, বৈকালিক আসরে বসার জন্য এনেছেন। কিন্তু যে অভিজ্ঞতা হল, তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।

পোস্তগোলা রাজাবাড়ির বাগে জান্নাত মসজিদের জিম্মাদার এ মুরব্বি থাকেন মসজিদেই। মসজিদেই খান। মসজিদের দক্ষিণকোণে তার গাঁট্টি-পেটরা। একটি ছোট ট্রাঙ্কও আছে। ট্রাঙ্ক থেকে ফাইলের মতো কিছু একটা বের করলেন। আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘খুলে দেখ বাবা!’ ফাইলটি খুলতেই দেখি অনেক পুরনো পত্রিকার কাটিং। সব কাটিং ইজতেমা এবং তাবলিগের বিষয়-আশয় সম্পর্কে বিভিন্ন খবরাখবর। দ্বন্দ্ব-সংঘাত, মীমাংসা-সমাধানের নানা খবর ও প্রবন্ধের কাটিং বড় যত্নের সঙ্গে সংগ্রহে রেখেছেন তিনি।

মনোযোগ দিয়ে পত্রিকার কাটিং দেখছি। তাবলিগের সংকট-সম্ভাবনার এমন কোনো সংবাদ বোধহয় বাদ যায়নি হুজুরের সংগ্রহ থেকে। ‘বাবা! বিস্কুট খাও।’ চোখ তুলে দেখি চা-বিস্কুট হাজির। চা খেতে খেতে গল্প হয় ইজতেমার এই প্রবীণ সাথীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাবা! আমার পড়াশোনার পরিধি খুব একটা বেশি নয়। ইসলামে ভাইয়ে ভাইয়ে দ্ধন্দ্ব শুরু হয় হজরত আলী-মুয়াবিয়ার লড়াই দিয়ে। সে থেকে আজ পর্যন্ত নবীজির দাঁতভাঙা মেহনতের ইসলাম শুধু ভাঙছেই। সর্বশেষ ভাঙন ধরেছে প্রাণের তাবলিগেও। স্বপ্নেও ভাবিনি তাবলিগের ভাঙা তরীতে ঐক্যের পাল উড়বে। ইসলামের ইতিহাসে এ বড় দুর্লভ ঘটনা।’

কিছুক্ষণ থেমে কী যেন ভাবলেন হুজুর। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, ‘এই যে ভাঙা তরীতে ঐক্যের পাল উড়ছে, ভাইয়ে ভাইয়ে দ্বন্দ্বের মিটমাট হয়েছে- এর পেছনে কার অবদান সবচেয়ে বেশি জান? মিডিয়ার। যৌবন থেকেই মুরব্বিদের বলতাম, আমাদের জন্য ফরজ মিডিয়াবন্ধব দাওয়াতি কাজ করা। আফসোস! কেউ বুঝল না। যে মিডিয়াকে আমরা দূর দূর করে তাড়িয়ে দিই, ভাগিয়ে দিই, তাদের বসার জন্য কোনো চেয়ার রাখি না, জায়গা দিই না, সে মিডিয়াই আজ আমাদের সবচেয়ে বড় কাজটি করে দিয়েছে। এঁকে দিয়েছে ইসলামের ইতিহাসের দুর্লভ চিত্রটি।’

মাগরিবের আজান হয়। নামাজ পড়ে বিদায় নিই। রাতে দেখা হয় রামিমের সঙ্গে। সোহরাওয়ার্দী কলেজে অ্যাকাউন্টিং বিভাগে অধ্যয়নরত এ তরুণ বন্ধুটিও তাবলিগের সাথী। শেয়ার করি হুজুরের কথা। রামিমও একই কথা বলে। ‘মিডিয়া না থাকলে ভ্রাতৃঘাতী এ দ্বন্দ্ব কখনও মিট হতো কিনা সন্দেহ আছে।’ রামিম আরও বলে, ‘একদিন আমাদের ডিপার্টমেন্টের কয়েকজন সিনিয়র সাথী ভাইয়ের সঙ্গে তুলুম তর্ক বেধে যায়। তারা বলছিল, ‘তাবলিগের দ্বন্দ্ব-সংঘাত, ভালো-মন্দ নিয়ে মিডিয়া কেন মাথা ঘামাবে? সেদিন কোনোভাবেই বোঝাতে পারছিলাম না একবিংশ শতাব্দীতে মিডিয়ার মোকাবেলায় মিডিয়া দিয়েই সামলাতে হবে। আজ যখন তাবলিগের দ্বন্দ্ব মীমাংসা হয়েছে, একটি সুন্দর ইজতেমার জন্য ধর্মপ্রেমীরা অপেক্ষার প্রহর গুনছে, তখন ওই বড় ভাইরাই একদিন বলেন, রামিম! তুমিই ঠিক বলেছ। আজ মিডিয়ার কল্যাণেই তাবলিগের সমস্যা সরকারের নজরে এসেছে; সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় এর সুষ্ঠু সমাধানও হয়েছে।’

তাবলিগের সমস্যা সমাধানে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে যুগান্তরের ফিচার পাতা ইসলাম ও জীবন। কথা হয় এ পাতার বিভাগীয় সম্পাদক তাবলিগের প্রতিষ্ঠাতা মুরব্বি মরহুম মাওলানা মুনির আহমদের (রহ.) স্নেহধন্য তাবলিগপ্রেমিক হাফেজ আহমাদ উল্লাহর সঙ্গে। তিনি বলেন, ২০০০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয় যুগান্তরের সাহসী অভিযাত্রা। তখন থেকেই নিয়মিত ইজতেমা সংখ্যা করে যুগান্তর। ফটোসাংবাদিক পাঠিয়ে ইজতেমার ছবি এবং খবরও সংগ্রহ করি আমরা। যুগান্তরের দেখাদেখি প্রতিটি জাতীয় ও আন্তর্জাতির দৈনিক এখন ইজতেমার সংবাদকে প্রথম পাতায় গুরুত্ব দিচ্ছে। যখন ইজতেমা নিয়ে প্রথম সংঘাত বাধে, তখন যুগান্তরই প্রথম নিউজ করে ‘কাকরাইলে কাঁদে তাবলিগের বাণী’। তারপর নিয়মিত বিরতিতে চলমান সংকট নিরসনে প্রবন্ধ-নিবন্ধ-সাক্ষাৎ প্রকাশ হতে থাকে ইসলাম ও জীবন পাতায়। তাবলিগপ্রেমিক পাঠকরাই এর সাক্ষী। প্রতিদিন কত টেলিফোন, কত মেইল, কত চিঠি যে আসত, এখনও আসছে তার হিসাব নেই। যুগান্তর তাবলিগের সঙ্গে ছিল, আছে, থাকবে ইনশাআল্লাহ। তাবলিগকেও সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মিডিয়াকে বন্ধু করে নিতে হবে। তবেই বিশ্বজয়ে তাবলিগ রাখবে পাঞ্জেরির ভূমিকা।’

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাংবাদিক

Email : [email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×