মায়ের ভাষায় পড়ে কোরআন জুড়াই মন ও প্রাণ

একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতীয় জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির গৌরব ও ইতিহাস। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে আমাদের মাতৃভাষার অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম হয়েছিল তারই স্মৃতিবিজড়িত তারিখ

প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির

মাতৃভাষা বাংলা ভাষা খোদার সেরা দান

মানুষের আবেগ, অনুভূতি, চিন্তা ও ভাব প্রকাশের বাহন ভাষা। ইরশাদ হচ্ছে, ‘খালাকাল ইনসানা আল্লামাহুল বয়ান’- তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে ‘বয়ান’ শিখিয়েছেন। বাংলা আমাদের মুখের ভাষা, মায়ের ভাষা, রাষ্ট্র ভাষা। এ ভাষার জন্য লড়াই করতে হয়েছিল ৬৫ বছর আগে। তাই ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন জাতীয় ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়।

পৃথিবীতে যেমন নানা দেশ রয়েছে, তেমনি রয়েছে নানা জাতি, গোত্র, বর্ণ, ধর্ম ও ভাষা। এই পৃথিবীতে যত প্রাণী রয়েছে প্রত্যেকের ভাষা ভিন্ন। এমনকি একই ভাষাভাষী মানুষের কণ্ঠস্বর, উচ্চারণভঙ্গি পৃথক পৃথক। এটা সম্পূর্ণ আল্লাহতায়ালার কুদরতের নিদর্শন। কোরআনে এরশাদ হয়েছে, আর তারই (কুদরতের) অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি এবং পৃথক পৃথক হওয়া তোমাদের ভাষা ও বর্ণের নিশ্চয় এতে (কুদরতের) নিদর্শনগুলো রয়েছে জ্ঞানবানদের জন্য। (সূরা রুম : ২২)

পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের কাছে তার দেশের ভাষা প্রিয় ও মধুর। মাতৃভাষা বাংলা আমাদের কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। কারণ আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলে আনন্দ ও তৃপ্তি পাই। তাছাড়া মাতৃভাষা বাংলা আজ আন্তর্জাতিক ভাষার মর্যাদা লাভ করেছে। এটা আমাদের বাঙালি জাতির কাছে সবচেয়ে গৌরবের।

আল্লাহতায়ালা হলেন অন্তর্যামী, আমরা যে ভাষাতেই তাকে ডাকিনা কেন তাতে তিনি সাড়া দেবেন। কালামে পাকে রয়েছে ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সব শোনেন, সব জানেন। (সূরা বাকারা-১৮২)’ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সব শোনেন, সব দেখেন। (সূরা মুজাদালাহ-১)’ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পূর্ণভাবে জানেন (তোমাদের) অন্তরগুলোর কথাও। (সূরা মায়িদাহ-৭)’

হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে হজরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত রাসূলগণকে আল্লাহতায়ালা পৃথিবীতে পাঠিয়ে মানুষকে হেদায়াতের জন্য যে ১০৪টি আসমানি কিতাব দিয়েছেন তা প্রত্যেক রাসূলের কওমের ভাষায় করেছেন। প্রধান ৪টি আসমানি কিতাবের মধ্যে তাওরাত লেখা হয় হজরত মূসা (আ.)-এর ওপর সুরয়ানি (হিব্রু) ভাষায় এবং সর্বশেষ মহাগ্রন্থ আল কোরআন আনে হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সা.)-এর ওপর আরবি ভাষায়। আল কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আমি সব রাসূলকেই তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করেই প্রেরণ করেছি, যাতে তাদের (পরিষ্কারভাবে আল্লাহর হুকুমগুলো) বুঝাতে পারে। (সূরা ইবরাহিম-৪)’। কোরআন আরবি ভাষায় দেয়ার পেছনে যদিও নানাবিধ কারণ রয়েছে, এর প্রধানতম কারণ হচ্ছে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাতৃভাষা আরবি এবং যাদের প্রথম এ গ্রন্থ বুঝানো হবে তাদের ভাষা ছিল আরবি। আল্লাহতায়ালার ঘোষণা- ‘আমি একে নাজিল করেছি কোরআন আরবি ভাষায় যেন (আরবি ভাষা হওয়ার কারণে প্রথমে) তোমরা বুঝতে পার। (সূরা ইউসুফ-২) অতএব, পবিত্র কোরআনের আলোকে বোঝা যায়, পৃথিবীতে প্রত্যেকটি মানুষ সৃষ্টিগতভাবে সমান। অর্থাৎ জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, বংশ ও ভাষা নিয়ে গর্ব করার কিছুই নাই। এগুলোর বিভক্তি শুধু পরিচয়ের জন্য। তবে আল্লাহর কাছে ওই ব্যক্তিই উত্তম, যে ইমানদার, সৎকর্মশীল ও পরহেজগার। আল্লাহ পাক বলেন, ‘হে মানবজাতি আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ আদম (আ.) এবং একজন নারী হাওয়া (আ.) থেকে (এ দিক দিয়ে তোমরা সবাই সমান) আর তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যেন তোমরা একে অপরকে চিনতে পার। বস্তুত আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা মর্যাদাশীল সে, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা পরহেজগার।’ (সূরা হুজরাত-১৩)।

কিন্তু তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নিজেদের বাঙালি জাতির চেয়ে শ্রেষ্ঠ জাতি এবং বাংলা ভাষার চেয়ে উর্দুকে শ্রেষ্ঠ ভাষা হিসেবে মনে করায়, সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের ভাষা ‘বাংলা ভাষা’ হওয়া সত্ত্বেও উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করার অপপ্রয়াস চালায়। যার ফলে বাঙালি জাতি সেদিন এ জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল সম্মিলিতভাবে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি (৮ ফাল্গুন) বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে বাংলা ভাষার মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তাদের মধ্যে রফিক, বরকত, জব্বার সালামসহ আরও অনেকে। আমরা আজও তাদের ভুলতে পারিনি এবং ভুলব না। পবিত্র কোরআন ও হাদিস শরিফে উল্লেখ রয়েছে- ‘তোমরা অন্যায়ভাবে কারও ওপর কিছু চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা কর না, কারও ওপর অত্যাচার ও জুলুম কর না, আল্লাহ জালিমদের পছন্দ করেন না। হাদিস শরিফে আছে, তোমাদের সামনে কেউ যদি কোনো অন্যায় কাজ করে, তবে তোমরা প্রথমে শক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করবে, তা যদি না পার কথা দিয়ে করবে, তাও যদি না পার তাহলে তা আন্তরিকভাবে ঘৃণা করবে।’ তাই ইসলামের দৃষ্টিতে বাঙালি জাতির ভাষা আন্দোলন ছিল সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত ও ন্যায়সঙ্গত। একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতীয় জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির গৌরব ও ইতিহাস। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে আমাদের মাতৃভাষার অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম হয়েছিল তারই স্মৃতিবিজড়িত তারিখ একুশে ফেব্রুয়ারি। আর এরই ধারাবাহিকতায় বাঙালি ধীরে ধীরে তার অধিকার অর্জনের সংগ্রামে এগিয়ে গেছে এবং পরবর্তীতে রক্তার্জিত স্বাধীনতার অভ্যুদয় ঘটে। তাই একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির জীবনে উদ্দীপ্ত চেতনার প্রতীক। আর এ চেতনা ও বোধের ব্যাপ্তি বর্তমানে শুধু আমাদের জাতীয় ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয় বরং তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিস্তৃতি লাভ করেছে।

আমরা পুণ্য লাভের জন্য যেমন কোরআন ও হাদিস শরিফ পড়ব, তেমনি ইসলাম যে একটি মানবতাবাদী ধর্ম, বিজ্ঞান ও যুুক্তিভিত্তিক ধর্ম, একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান এবং এর আদেশ ও নিষেধ জানার জন্য বাংলায় এর অনুবাদ ও ব্যাখ্যা অধ্যয়ন করব। কারণ কোরআন ও হাদিস শরিফে কোরআনকে বুঝে পড়ার তাগিদ দেয়া হয়েছে। আর কোরআন বুঝে পড়তে হলে ও মনের ভাব প্রকাশ করতে মাতৃভাষার বিকল্প নেই। বাংলা ভাষাভাষী প্রত্যেকটি মুসলমান যখন মাতৃভাষা বাংলার মাধ্যমে কোরআন ও হাদিস শরিফ বুঝে পড়তে পারবে তখনই তারা ইসলামের পরিপূর্ণ সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে পারবে।

মাতৃভাষার লালন ও বিকাশের মাধ্যমেই মানব জীবনের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব, যা দেশ সমাজ ও বিশ্বের জন্য সামগ্রিক কল্যাণই বয়ে আনবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক

ই-মেইল : [email protected]