তার কবিতা পড়ে মানুষ ও জিন বলে ওঠে আমিন আমিন

  আল ফাতাহ মামুন ০১ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলা ভাষার শক্তিমান কবি আল মাহমুদ
বাংলা ভাষার শক্তিমান কবি আল মাহমুদ

বাংলা ভাষার শক্তিমান কবি আল মাহমুদ চেয়েছেন শুক্রবারে মৃত্যু। কবির কলম যখন আল্লাহর আরশের চেয়ে দামি কলবের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন আল্লাহতায়ালা এভাবেই কলমের প্রার্থনা কবুল করে নেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার মৃত্যুর ফেরেশতা আল মাহমুদকে ডেকে নেন আরশে আজিমে।

‘কোনো এক ভোরবেলা, রাত্রি শেষে শুভ শুক্রবারে/ মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাকিদ/ অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে/ ভালোমন্দ যা ঘটুক মেনে নেব এ আমার ঈদ’।

১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই বাবা মীর আবদুর রব এবং মা রওশন আরার কোলে আসেন আল মাহমুদ। ধর্মই ছিল তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য। এ বাড়ির ছেলেদের ডাকা হতো মোল্লাবাড়ির ছেলে। দাদা মীর আবদুল ওয়াহাব আরবি-ফারসি-সংস্কৃত ভাষার পণ্ডিত ছিলেন। লিখতেন জারি গান। সুর ও ছন্দ তাই আল মাহমুদের রক্তে মেশা। ওগো মোর বনহংসী’তে তিনি লেখেন, ‘আমার জন্ম হয়েছিল একটি নদীর পাড়ে। একটি ছোট শহরে। শহরটিকে সঙ্গীতের শহর বলা হতো। ভাবি আমি কবি না হলে নিশ্চয়ই সঙ্গীতজ্ঞ হতাম। তারের বাদ্য আমার হাতে ঝঙ্কার দিয়ে উঠত।’

দাদি বেগম হাসিনা বানু মীরের কাছে শুরু হয় অ আ ক খ’র পাঠ। আল মাহমুদ বলেন, ‘আমি বলতে শিখেছি আমার দাদির কোলে বসে। দাদি যেভাবে গল্প শোনাতেন সেভাবেই গল্প বলে উপন্যাস লিখে আজ বিখ্যাত হয়ে উঠেছি।’ বাবার কাছে নেন ধর্মের পাঠ। বাবা সম্পর্কে তিনি এভাবে বলেন- ‘আমার আব্বা একজন দরবেশ মানুষ ছিলেন। আধ্যাত্মিক ধরনের মানুষ ছিলেন। নিয়মিত নামাজ রোজা করতেন। তাহাজ্জুদ গোজারি মানুষ ছিলেন। ছিলেন নাক বরাবর শরিয়তপন্থী।’

বাবার দরবেশি জীবন গেঁথে যায় ছোট্ট মাহমুদের মনেও। তিনি বলেন, আধ্যাত্মিক মানুষ হওয়ার কারণে আব্বার কাছে ফকির-দরবেশদের আসা-যাওয়া ছিল। বড়ই অদ্ভুত ছিল তাদের আচার-আচরণ। আমার শিশুমনে গভীর প্রভাব ফেলে তারা। আত্মজৈবনিক গ্রন্থ যেভাবে বেড়ে ওঠি’তে আল মাহমুদ পীর-ফকিরদের নানা আশ্চর্য কিচ্ছা বলেছেন। এমনকি তিনি মনে করেন, তার জন্মের পেছনেও আছে ফকির-দরবেশদের দোয়া। বিবাহের চৌদ্দ বছর পরও যখন আল মাহমুদের বাবা-মা পুত্র সন্তানের মুখ দেখেননি, তখন এক পাগলি এসে তার বাবাকে বলেন, ‘এই শাক বাড়ি নিয়ে যা। তোর বউকে খাওয়া। তোর পুত হইব।’ তখন ছিল গভীর রাত। শাক না নিয়েই বাড়ি ফিরলেন আল মাহমুদের বাবা। ঘটনাটি বললেন স্ত্রীকে। আল মাহমুদের মা-ও ছিলেন আধ্যাত্মিক ঘরানার। রাত দুটায় স্বামীকে ফের পাঠালেন শাক আনতে বাজারে। পাগলির বাতলানো ওই শাক খাওয়ার পরই গর্ভে আসে আল মাহমুদ।

মা রওশন আরা মীর প্রায়ই ঘটনাটি বলতেন আল মাহমুদকে। আল মাহমুদের বেঁচে থাকার পেছনেও ছিল ফকির-দরবেশদের দোয়া। তখন তিনি গণকণ্ঠের সম্পাদক। বাড়ি এলে একদিন মা তাকে নিয়ে যান পীর হুজুরের কাছে। সেদিন ছিল আল মাহমুদের ঢাকায় ফেরার দিন। পীর হুজুর বলেন, ‘তোর ছেলেকে আজ ঢাকা যেতে দিস না। মাথা উইড়া যাইব।’ পরে দেখা যায়, ওইদিন গণকণ্ঠের সম্পদকের চেয়ার লক্ষ করে বিরোধীপক্ষ গুলি ছোড়ে। আল মাহমুদ বলেন, সেদিন পীর হুজুরের কথা না শুনলে আমার মাথা উড়ে যাওয়া অস্বাভাবিক ছিল না।

এ রকম পরিবারে বেড়ে ওঠার কারণেই মার্কসবাদে প্রভাবিত হয়েও কখনই ইমানের রওশন হারাননি তিনি। আল মাহমুদ বলেন, বামরাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম ঠিক, কিন্তু নাস্তিক ছিলাম না কখনই। আমাদের সঙ্গে যারাই মার্কসিস্টে প্রভাবিত হয়েছে, সবাই ঘরে ফিরেছে। আফতাব চৌধুরীর মতো লোক পর্যন্ত শেষ রাতে উঠে জিকির করেন হু আল্লাহু...। হু আল্লাহু...।

কারাভোগের পরই কবির জীবনে আমূল পরিবর্তন আসে। কারাগারে তিনি পুরো কোরআন অধ্যয়ন করেন। মার্কসবাদই নাকি কোরআন বুঝতে সাহায্য করেছে তাকে। কবির ভাষায়, ‘কোরআন পড়ার পর আমার মনে হল, কোরআন শরিফ আগামী দিনের মানব সমাজের জন্য পৃথিবীতে বসবাসের একমাত্র সঠিক দলিল। মার্কসবাদ আমি পড়ে এসেছি বলে আমার কোরআন বুঝতে সুবিধা হয়েছে। যেমন বণ্টনপ্রণালি। আমি যেহেতু মার্কসিস্ট, আমাকে ওই বণ্টননীতিটাই নাড়া দিল। এবং খুব নাড়া দিল। এত নাড়া দিল যে, আমি কয়েকদিন ঘুমাতেই পারিনি।’

কোরআন পড়ার পরই কবিহৃদয়ে দুলে ওঠে খোদার মায়াবী পর্দা। ছন্দের সুরে বলেছেন সে কথা-

পৃথিবীর সর্বশেষ ধর্মগ্রন্থটি বুকের ওপর রেখে

আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হায় এ ছিল সত্যিকার ঘুম

কিংবা দুপুরে খাওয়ার পর ভাতের দুলুনি। আর ঠিক তখনই

সেই মায়াবী পর্দা দুলে উঠল, যার ফাঁক দিয়ে

যে দৃশ্যই চোখে পড়ে, তোমরা বল, স্বপ্ন।

কবি আধ্যাত্মিকতার পাঠ নেন বায়তুশ শরফ দরবার শরিফের পীর শাহ সুফি আবদুল জব্বারের কাছে। কবির ভাষায়- তিনি আমাকে

দুটি মাত্র উপদেশ ঠিকমতো মেনে চলতে শিখিয়েছিলেন।

এক. সিজদায় মাথা ঠেকিয়ে রাখার সময় রক্ত-মাংসসহ নিজের ভেতরটাকে একেবারে উপুড় করে দেয়া।

দুই. কবির অহঙ্কার ছেঁড়া ন্যাকড়ার মতো ফেলে দিয়ে একেবারে আল্লাহ প্রেমিকদের ভিড়ে ফতুর হয়ে মিশে যাওয়া।

তার কাছে শিখেছিলাম কী করে নিজের আত্মাকে কেবল মানুষের জন্য দরদি করে তুলতে হয়।

নিজের পীর সম্পর্কে কবি বলেন-

কবিদের সঙ্গে তিনি ছিলেন এক দরবেশের

পোশাকধারী শায়ের। যখন আল্লাহর কালাম পেশ করতেন তখন পরিবেশটাই নিঃশ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসত।

আমরা কবিরা ভাবতাম, কবিতা দিয়ে আর কী হবে? মনে হতো ওই আয়াতের গুঞ্জরণে মৌমাছির মতো উড়তে থাকি।

আল মাহমুদের কবিতা এবং গদ্যে ফুটে উঠেছে আধ্যাত্মিকতার নানা দিক। শেষ বয়সে তিনি বারবার বলেছেন, এখন আমার চোখ আর আমার চোখ নেই। বাইরের চোখ দিয়ে মানুষ যা দেখে আমি দেখি তারও বেশি কিছু। দেখি এ জগৎ ও জগতের ভেতর-বাহির।

আল মাহমুদ লেখেন-

এখন চোখ নিয়েই হলো আমার সমস্যা। যেন আমি জন্ম থেকেই অতিরিক্ত অবলোকন শক্তিকে ধারণ করে আছি।

কানা মামুদের উড়ালকাব্যে তিনি লেখেন-এখন অন্ধ হয়ে গিয়ে অন্তর্দৃষ্টি শব্দটা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করি। অন্তর্দৃষ্টি যেন হারপুন নিয়ে খেলা। যেন একটি দুর্ধর্ষ মাছকে বল্লম দিয় গেঁথে ফেলা। ...ভবিষ্যৎ দেখতে হলে কে বলেছে যে পরিচ্ছন্ন চোখই দরকার। ঘষা কাচের মতো রহস্যময় চোখ চেয়েছিলাম আমি। আমার প্রভু আমাকে তা দিয়েছেন।

এ কবিতার শেষে তিনি সেজদায় লুটিয়ে পড়তে চেয়েছেন প্রভুর ক্ষমার মনজিলে। প্রভু তাকে ক্ষমা করুন। জায়গা দিন জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে।

অথচ ঘুমের মধ্যে কারা যেন, মানুষ না জিন আমার কবিতা প’ড়ে ব’লে ওঠে, আমিন, আমিন।

-আল মাহমুদ।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Email : [email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : ক‌বি আল মাহমু‌দ আর নেই

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×