চার পাশের সতিন কাহিনী

  জাবীন হামিদ ০৮ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান, সবাই যাকে ক্রিকেট তারকা হিসেবেই বেশি চেনেন। তার সাবেক বিদেশি স্ত্রী জেমিমা ব্রিটিশ নাগরিক। তিনি অনেকদিন ধরেই অবাক হয়ে দেখছিলেন কীভাবে ব্রিটিশ মুসলিম নারীরা সতিনকে মেনে নিয়ে সংসার করছেন।

এরা যে অশিক্ষিত-গরিব পরিবারের মেয়ে তা-ও নয়। তিনি হতবাক হয়ে গেলেন এটা দেখে যে, উচ্চশিক্ষিতা চাকরিজীবী নারী যাদেরকে সমাজ স্বাধীন নারী হিসেবে মনে করে; তারা কোনো বিবাহিত পুরুষের দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্ত্রী হয়ে সংসার জীবন শুরু করছেন।

বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত বা আফ্রিকার কোনো দেশ হলে বলা যেত পুরুষশাসিত সমাজে মেয়েদের ঘর করতে বাধ্য করা হচ্ছে। মুসলিমদের সমালোচনা করতে গিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে অশোভন আক্রমণ করা হতো। শেষ নবী মুহাম্মদ সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তথাকথিত নিরপেক্ষ গণমাধ্যম, কিছু ব্লগার আর নারীবাদীরা কী পরিমাণ জঘন্য ভাষায় গালিগালাজ করত তার নমুনা আমরা অনেক দেখেছি।

আরও বলা হতো, অভাবের জন্য মেয়েরা পেটের দায়ে বাধ্য হয়ে সতিনকে মেনে নিচ্ছে।

কেন পশ্চিমা বিশ্বের আধুনিকা, স্বাধীন নারীরা সতিনকে মেনে নিচ্ছেন?-

জেমিমার মনে প্রশ্ন জাগল, ব্রিটেনের মতো ইউরোপের ধনী দেশের উচ্চশিক্ষিতা চাকরিজীবী বা ব্যবসায়ী আধুনিক নারীরা কেন সতিনকে মেনে নিচ্ছে? এখানে তো কেউ তাদের বাধ্য করছে না।

যারা সতিনের সঙ্গে সংসার করছেন এবং করতে চান আর এ ধরনের বিয়ের আয়োজন করেন এমন কিছু ঘটকালি সংস্থার সঙ্গে জেমিমা এ নিয়ে কথা বলেন। তিনি তাদের মতামত অনলাইনে তুলে ধরেছেন। এখানে সব ঘটনাই সত্য; তবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রাখতে ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে।

ফারজানা একজন সিনিয়র নার্স। বয়স ৩৬। দেখতে স্মার্ট, সুন্দরী। তিনি বললেন, আমি সতীনকে মেনে নিয়ে সংসার জীবন শুরু করার চিন্তা করছি। আপনি যদি ইসলামের আলোকে ভালোবাসা-বিয়ে ইত্যাদি নিয়ে চিন্তা করেন তাহলে সতিনকে মেনে নেয়া অযৌক্তিক কিছু না।

মিজান রাজা লন্ডনে মুসলিমদের বিয়ের ঘটকালি করেন। মুসলিম পুরুষদের মধ্যে যারা বিপত্নীক বা ডিভোর্সড বা এক বউ থাকার পরও নানা কারণে একাধিক বিয়ে করতে চান যেসব মুসলিম নারীর সতিনে আপত্তি নেই- তাদের মধ্যে তিনি জোড় বেঁধে দেন। বলতে গেলে রোজই তিনি এমন বিয়ের ঘটকালি করার জন্য ব্রিটিশ মুসলিম নারীদের থেকে অনুরোধ পান। এজন্য তিনি মাঝে মধ্যে ম্যাচ মেকিং অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এমনই এক অনুষ্ঠানে জেমিমা আলাপ করেন এদের অনেকের সঙ্গে।

রাজা বললেন, অনেক পেশাজীবী নারী আছেন যারা ফুলটাইম স্বামী চান না। কেননা, সারা দিন পেশাগত ব্যস্ততার পর ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরে স্বামীর জন্য তাদের হাতে সময় থাকে না। তাই পার্টটাইম স্বামী পেতেই তারা বেশি আগ্রহী। ক্যারিয়ারকে যারা গুরুত্ব দিতে চান, সেসব নারী সংসার করতে চাইলেও এর পেছনে বেশি সময় দিতে চান না। তা ছাড়া স্বামী, সংসার, ক্যারিয়ার নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়লে নিজের জন্য কোনো সময় থাকে না। তাই স্বামী ও সংসারের প্রতি যে দায়িত্ব তা আরেকজনের সঙ্গে ভাগ করতে তাদের আপত্তি নেই। তখন কিছু অবসর সময় পাওয়া যায় বিশ্রামের জন্য নিজের পছন্দমতো কাজ করার জন্য। নওমুসলিমা সারাহ জানালেন, তিনি নিজেই এক বিবাহিত পুরুষকে প্রস্তাব দেন তাকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে। তিনি পড়াশোনা নিয়ে এত ব্যস্ত থাকেন যে ফুল টাইম স্বামীর জন্য তার সময় নেই।

অনুষ্ঠানে আগত এক পুরুষ অতিথি পার্টটাইম স্বামী মেয়েদের পছন্দ- এ মত ঠিক না বললেন। তার মত হল- ব্রিটিশ মুসলিম নারী যাদের বয়স ৩০ হয়ে গেছে বা যারা তালাকপ্রাপ্ত, সন্তানসহ বিধবা, তাদের জন্য পাত্র পাওয়া কঠিন। কেননা, মুসলিমরা সেখানে সংখ্যায় কম। এ ছাড়া ভারতীয় উপমহাদেশের অসংখ্য পুরুষ পরিবারের চাপে দেশে গিয়ে বিয়ে করতে বাধ্য হন। অনেক বিয়ে আত্মীয়দের মধ্যে হয়। তা ছাড়া বাচ্চাসহ কোনো মাকে বিয়ে করতে খুব বেশি পুরুষ আগ্রহী নয়।

তাই বেশি বয়সের ও ডিভোর্সি, বিধবা নারীরা বাধ্য হয়ে সতিনকে মেনে নিচ্ছে।

সতিনকে মেনে নেয়া না বিয়ে বিচ্ছেদ?-

স্বামীর একাধিক বিয়েতে রাজি হওয়া বনাম বিচ্ছেদ- এ দুইয়ের মধ্যে অনেক মেয়ে প্রথমটিকে মেনে নেন, অনেকে বিচ্ছেদের পথে যান। ফলে অনেক বছরের সাজানো সংসার ভেঙে যায়; বাচ্চারা মা-বাবার সঙ্গে একসঙ্গে থাকতে না পেরে হতাশায় ভোগে। তা ছাড়া চার পাশের মানুষের নানা কথায় তাদের মন ভেঙে যায়। বাবার আরেক বিয়েকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে কেউ তাদের শেখায় না। ফলে এতদিনের প্রিয় মানুষটি সংসারে সবার কাছে আচমকা হয়ে যায় ভিলেন।

হুমায়ূন আহমেদ আর গুলতেকিনের সাজানো সংসার খানখান হয়ে ভেঙে পড়া থেকে কি আটকানো যেত? আমাদের দেশ যদিও মুসলিম প্রধান- পশ্চিমা মিডিয়ার নেতিবাচক প্রভাবে এ দেশে পুরুষের বহুবিবাহকে পাপ হিসেবে মনে করা হয়। প্রথম স্ত্রীর লিখিত অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু যদি মানুষকে বলা হতো আল্লাহ্ যেটাকে বৈধ করেছেন সেটাকে ঘৃণা করা মুমিনের কাজ না- তাহলে হয়তো এমন হাজারও সংসার ভেঙে যেত না। কেউ ভাববেন না স্ত্রীকে লুকিয়ে গোপনে প্রেম করার পক্ষে আমি। অবৈধ প্রেমে জড়িয়ে তারপর ইসলামের দোহাই দিলে চলবে না- আর ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ। [সূরা বনি ইসরাঈল : ৩২]। কোনো কারণে কারও একাধিক স্ত্রীর দরকার হলে শরিয়াহ নির্ধারিত পথে পাত্রী দেখতে হবে।

সতিন শত্রু নাকি প্রিয় বান্ধবী : এক মহিলা স্বামীকে বলতেন, যে কোনো বিয়ে বা আনন্দ অনুষ্ঠানে ছোট বউকে নিয়ে যেতে; কেননা তার বয়স কম, শখ আবদার বেশি। আর তিনি নিজে শোকের কোনো ঘটনা ঘটলে যেমন কেউ মারা গেছেন বা খুবই অসুস্থ, তখন স্বামীর সঙ্গে সেখানে যেতেন। এভাবে পারিবারিক দায়িত্ব তিনি সতিনের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিলেন।

একজন বাবা যখনই তার মেয়েকে ফোন করতেন, আগে খোঁজ নিতেন তার সতিন কেমন আছে। এভাবে তিনি মেয়ের সঙ্গে তার সতিনের সম্পর্ক ভালো রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতেন। অথচ এ দেশের অনেক মা, বাবা মেয়েকে পরামর্শ দেন স্বামীর ওপর চাপ দিতে যেন অন্য স্ত্রীকে সে তালাক দেয়। এভাবে পরিবারের সদস্যদের খারাপ পরামর্শে সতিনকে এসিড মারা থেকে শুরু করে বাচ্চাসহ খুন করার ঘটনাও ঘটে। সতিন মানেই পরম শত্রু- সে যদি মৃত হয় তখন প্রতিপক্ষ হয় সতিনের বাচ্চারা। কোনো বিপত্নীক পুরুষ যদি তার নাবালক বাচ্চাদের জন্য নতুন মা নিয়ে আসে, তবে সেই মা হয়ে যায় রূপকথার ডাইনি বুড়ি। [চলবে]

বিদেশি প্রতিবেদন ও শখের ঘটকালির অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছি এ লেখা।

লেখক : সমাজ গবেষক ও প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×