একটি আধুনিক মাদ্রাসার পাগড়ি জলসা

  আল ফাতাহ মামুন ০৮ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

তখন সবেমাত্র সন্ধ্যা নেমেছে। লাশের খাটিয়া কাঁধে একদল ছোট্ট শিশু গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছে মঞ্চের দিকে। উৎসুক দর্শনার্থীদের চোখ সীমাহীন বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে শিশু দলটির দিকে। মঞ্চে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থাপক ঘোষণা করলেন- এখন আপনাদের সামনে জানাজার নামাজ প্রদর্শন করবেন আবিদুন্নেসা শরীফ তাহফিজুল কোরআন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। পাঁচজনের এ দলটি দেখাল কীভাবে জানাজার নামাজ পড়তে হয়-পড়াতে হয়। কীভাবে লাশ ধরতে হয়। মাদ্রাসাটির চতুর্থ বাৎসরিক মাহফিলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রদর্শনীতে আরও দেখানো হয় জুমা ও ঈদের নামাজ পড়া, মুখস্থ খুতবা বলা, বাংলা-ইংরেজি-আরবি হাতের লেখা ইত্যাদি। পুরস্কার বিতরণ ও হাফেজ ছাত্রদের পাগড়ি পরানো উপলক্ষে আয়োজিত মাহফিলের এ ব্যতিক্রমী প্রদর্শনী মন কেড়ে নিল সবার।

নবাবগঞ্জ জেলার আওনা গ্রামের এ আধুনিক মাদ্রাসাটি ইতিমধ্যেই ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এলাকা ও এলাকার বাইরে। শহর পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতা এবং বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে বেশ সুনাম কুড়িয়েছে মাদ্রাসাটি। অবাক হলেও সত্য! দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কোমলমতি শিশুরা কোরআনে হাফেজ হওয়ার জন্য জড়ো হয় অজপাড়াগাঁয়ের এ মাদ্রাসাতে। মাদ্রাসাটির সফলতা ও অর্জন সম্পর্কে জানতে চাইলে গ্রামবাসী মাদ্রাসা নিয়ে গর্বিত বলে জানায়।

অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী মোক্তার হোসেন ছুটি কাটাতে গ্রামে এসেছেন। দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন শিশুদের প্রদর্শনী। চোখে মুখে তার মুগ্ধতার ছাপ। জানতে চাইলাম, কেমন লাগছে শিশুদের আয়োজন? অনেকটা উত্তেজিত ভঙ্গীতেই বললেন, ‘অ্যাম্যাজিং! শিশুরা যে এত সুন্দর করে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলো প্রদর্শনী করতে পারল- ব্যাপারটি আমাকে মুগ্ধ করেছে। অস্ট্রেলিয়ায় তো এসব কল্পনাও করা যায় না। আমাদের দেশ এবং দেশের মানুষের ধর্মপ্রিয়তার গল্প প্রায়ই করি। এবার শিশুদের মনমুগ্ধকর প্রদর্শনীর গল্প করা যাবে অস্ট্রেলিয়ার মুসলমান বন্ধুদের কাছে।’ ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন স্থানীয় তরুণ সোহাগ। তিনি বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা এখনও ভালো করে জানাজা এবং ঈদের নামাজ পড়তে জানি না। জুমার নামাজ পড়তে হয় তাই পড়ি। এ ছাড়া ইসলামের অনেক জরুরি বিধান আমরা পালন করতে পারি না। আওনা মাদ্রাসাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি শিশুদের মাধ্যমে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধানগুলো আমাদের শেখানোর জন্য। এ ধরনের প্রদর্শনী চালু থাকলে ০আশা করি, আমাদের তরুণদের জন্য বেশ উপকার হবে।’

এ বছর মোট ১২ জন ছাত্র হাফেজ হয়েছে, আবিদুন্নেসা শরীফ তাহফিজুল কোরআন মাদ্রাসা থেকে। ‘১২ জন! সংখ্যাটি মোটেও মামুলি নয়। শহরে এমন অনেক মাদ্রাসা পাওয়া যাবে, বছরে টেনেটুনে এক-দু’জন হাফেজ তৈরি করতে কষ্ট হয়। একজন হাফেজও বের হয় না- এমন ‘ব্যয়বহুল’ মাদ্রাসার সংখ্যাও কম নয়। সেখানে এই অজপাড়াগাঁয়ের মাদ্রাসা থেকে ১২ জন হাফেজ বের হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়’- হাফেজ ছাত্রদের পাগড়ি পরানোর আগ মুহূর্তে কথাগুলো বলছিলেন সিলেটের প্রবীণ আলেমে দ্বীন এবং দেশ বরেণ্য মুফাসসিরে কোরআন মাওলানা নাসিরুদ্দিন আনসারী। তিনি বলেন, ‘আজ ছাত্রদের আমি পাগড়ি পরাচ্ছি ঠিক। কিন্তু যেসব শিক্ষকরা রক্ত পানি করে ছাত্রদের তিলে তিলে হাফেজ হিসেবে গড়ে তুলেছেন, তাদের প্রতিদান আল্লাহ দেবেন। আর শিক্ষক এবং ছাত্রদের সুখে-দুঃখের সঙ্গী হিসেবে যে মানুষটি শত ব্যস্ততার ভেতরে নিয়মিত মাদ্রাসার তদারকি করেন, এ মাদ্রাসার সভাপতি এবং সৃজনশীল প্রকাশনী সালাউদ্দিন বইঘরের স্বত্বাধিকারী আলহাজ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন ভাইয়ের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা আমার জানা নেই। আল্লাহপাক তার খেদমত কবুল করুন। এ মাদ্রাসা তার মায়ের নামে করা হয়েছে। তার বাবা-মা দু’জনকেই আল্লাহ জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুণ।

মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আলহাজ সালাউদ্দিন বলেন, ‘এ মাদ্রাসাটি নিয়ে আমি অনেক স্বপ্ন দেখি। একটি বড় প্রকাশনী চালাই। নানা ব্যস্ততা আমাকে ঘিরে থাকে। তারপরও সশরীরে মাদ্রাসায় এসে খোঁজখবর নিই। সব কষ্ট ভুলে যাই, যখন শুনি একজন ছাত্র কোরআনে হাফেজ হয়েছে, যখন গ্রামের মানুষ মুগ্ধ হয়ে শিশুদের তিলাওয়াত শোনে প্রদর্শনী দেখে- সে আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’ সভাপতি আরও বলেন, ‘এ মাদ্রাসাটি নিয়ে আমি অনেক বড় স্বপ্ন দেখি। দুনিয়া তো অনেক কামিয়েছি। এবার একটু আখেরাত কামানোর চেষ্টা করছি কোরআনের খেদমত করে। রব্বে করিম যদি আমার এ খেদমত কবুল করেন, তবেই সার্থক হবে আমার যত চেষ্টা-প্রচেষ্টা।’ আবিদুন্নেসা শরীফ মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য কম্পিউটার শিক্ষা এবং কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। আল্লাহপাক এ মাদ্রাসার মাধ্যমে নবাবগঞ্জের ঘরে ঘরে কোরআনের আলো জ্বেলে দিন- এ দোয়া দেশবাসীর কাছে কামনা করছি।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Email : [email protected]

আরও পড়ুন
--
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×