আপনার সন্তানের ইমান কেড়ে নিচ্ছে পর্নোগ্রাফি

প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সাইফুল ইসলাম আল আজহারি

আমরা বসবাস করছি নির্লজ্জ এক পৃথিবীতে। এ এমন পৃথিবী, যেখানে আপনার হাতের মুঠোফোন দিয়েই যে কোনো ওয়েবসাইট থেকে যে কোনো ভিডিও চালানো যায় ইচ্ছামতো। পর্নোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রি আজকের দুনিয়ায় শতকোটি ডলারের ইন্ডাস্ট্রি! যার উদ্দেশ্য হল আমাদের প্রত্যেককেই কোনো না কোনোভাবে এসব নোংরামির ভোক্তা বানানো।

প্রতিটা নারী-পুরুষ ও কিশোরদের সামনে এগুলো যেন উন্মোচিত হয় এবং তাদের আশা আপনিও এ সবে আসক্ত হয়ে পরিণত হবেন আরও একজন ভোক্তায়!

আর এসব তৈরি করছে এক শ্রেণীর দানব, যারা এ সভ্য সমাজের নারী-পুরুষ ও কোমলমতি সন্তানদের বানাতে চাচ্ছে পশু ও যৌন বিকারগ্রস্ত মানুষ।

আমাদের সমাজে অনেকে এ আসক্তিতে জড়িয়ে পড়েছি এবং নিয়মিত এসব খারাপ সাইডগুলো উপভোগ না করলে নিজেকে সভ্য ভাবতে পারছি না। আমরা নিজেরা দেখছি আবার নিজেদের মোবাইলের বিভিন্ন ডিভাইস বা অ্যাপে এ ভিডিওগুলো সেইভ করে রাখছি। এ আসক্তি আমাদের এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, অনুশোচনা হয় না খারাপও লাগে না। কেননা আমরা নিজেরাই মনেমনে নিজেদের জন্য এগুলোকে গ্রহণযোগ্য ধরে নিয়েছি।

আমাদের মধ্যে অনেকে আবার ভাবি, এসব দেখে অন্তত আমি তো আর কারও ক্ষতি করছি না, অন্য কাউকে তো দেখাচ্ছি না, শুধু নিজেই দেখছি। আপনার চিন্তা হয়তো ঠিক, কিন্তু বাস্তবতা জানেন কি? ভেতরে ভেতরে আপনার আত্মা নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে! আপনার ভেতরে আর আত্মার কিছুই তাজা নেই। এগুলো আমাদের পরিণত করছে পশুতে। যার ফলে, আমরা এখন আর স্বাভাবিক কোনো দিকে তাকাতে পারি না, যখন একজন নারী আমাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যায় আমরা দেখি যেন একটি মাংসপিণ্ড হেঁটে যাচ্ছে। আর আমরা তাকে একজন মানুষ হিসেবে দেখতে পারি না, তারও রয়েছে সম্মান পাওয়ার অধিকার। আল্লাহতায়ালা কোরআনে ইরশাদ করেন- নিশ্চয়! আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি। [সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত-৭০]।

আমাদের দু’চোখ খুঁজে ফেরে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নারীকে। সারাক্ষণ আমরা তাকিয়ে থাকি, চোখ নামিয়ে নিতে আমাদের রীতিমতো কষ্ট হয়, যখন আমরা ক্যাম্পাসে, কর্মক্ষেত্রে, শপিংমলে অথবা রাস্তা দিয়ে হাঁটি, পারছি না নিজেদের সংযত রাখতে। হয়তো একটা বিলবোর্ডের দিকে তাকালাম, দ্বিতীয়বার, তৃতীয়বার আবার ফিরে তাকাই। এমন একটা সুযোগও আমরা হাতছাড়া করি না যা দিয়ে আমাদের অন্তরটা কলুষিত না হয়।

আমরা পরিপূর্ণ একজন আসক্ত ব্যক্তি। যার ফলশ্রুতিতে আমাদের সালাত (নামাজ) হয়ে গেছে অন্তঃসারশূন্য। সালাতে খুশু (মনোযোগ) নেই। আমরা এখন আল্লাহর দরবারে সালাতের ভেতরে বা বাইরে একটুও চোখের পানি ফেলতে পারি না। কেননা, আমাদের হৃদয়ে আল্লাহর ভয় এতটাই কমে গেছে যে সেসব নোংরামি যা আমরা দেখে আসছি এতদিন ধরে- এসব তারই ফলাফল।

পাঠকবৃন্দ আমি আপনাদের অনুরোধ করে বলছি, এটা একটা যুদ্ধ এবং এই যুদ্ধ সামরিক যুদ্ধের চেয়েও ভয়ংকর। এটি সেই যুদ্ধ, যা কিনা ধ্বংস করে দিচ্ছে আমাদের অন্তরকে। এ পর্নোগ্রাফি আমাদের ঘর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়ে ধ্বংস করে দিচ্ছে আমাদের আগামীর স্বপ্ন প্রিয় সন্তানদের।

আপনাদের মতো আমিও চাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, আমাদের স্বপ্ন প্রিয় সন্তানদের এসবের হাত থেকে শতভাগ না পারলেও যতদূর সম্ভব বাঁচাতে। কিন্তু যখন আমার সন্তান স্কুলে যায়, সেটা ইসলামিক স্কুলই হোক না কেন, কেউ একজন হতে পারে তাদেরই এক বন্ধু, তার মোবাইল কিংবা এমন কোনো ডিভাইসে ওইসব নিয়ে দেখাবে।

এটা খুবই বাস্তব, মোটেই কাল্পনিক কিছু নয়। এ জন্য আপনাকেই আপনার সন্তানদের প্রস্তুত করতে হবে এ কুৎসিত-কদাকার জগৎ সম্পর্কে যার মুখোমুখি তারা হবেই একসময়। এর থেকে পালানোর পথ নেই আজকের দুনিয়ায়, কোনো মুক্তিও নেই। এগুলো সবখানে, সব জায়গায়।

আমরা যখন ইউটিউবে ইসলামিক লেকচার দেখি নিশ্চয়ই তখন দেখি যে সেখানে যে কোনো ভিডিওর পাশ দিয়েই ফলোআপ ক্লিপগুলো দেয়া থাকে। তার মধ্যে কিছু নোংরা জিনিস থাকবেই। আর আপনাদের বেলায় আসলে কী হয়? আপনি একটা ভিডিও দেখছেন, পাশে একটা বাজে জিনিস দেখে ক্লিক করলেন, আবার আরেকটা ক্লিক করলেন, আবার আরেকটায় ক্লিক করলেন, শেষ পর্যন্ত গিয়ে ওইসব জঘন্য কিছু একটা দেখে ফেলেন। তাই হয় আপনাদের সঙ্গে। আল্লাহতায়ালা বলেন- (তারা তাদের লজ্জাস্থান হিফাজত করে। [সূরা মাআ’রিজ, আয়াত- ২৯]।

লজ্জাস্থান হিফাজত করা মানেই যে ব্যভিচার/যিনা না করা তা কিন্তু নয়, এর মানে সেসব জিনিস থেকে বিরত থাকা যা আমাদের ওই প্রলোভনের দিকে টেনে নেয়। আমাদের মনকে অস্থির করে তোলে খারাপ জগতের দিকে যেতে। আমরা জানি, কখন আমাদের সংযম-পালন আক্রমণের কবলে পড়ে। আমরা এও জানি, কখন আমাদের হায়া-লজ্জাবোধ হুমকির মুখে পড়ে। আমরা বুঝতে পারি আমাদের দুর্বলতা এবং আকাক্সক্ষা-চাহিদা সম্পর্কে।

এ তীব্র আকাক্সক্ষা আল্লাহই আমাদের ভেতরে দিয়ে দিয়েছেন এবং সেটা আল্লাহ দিয়েছেন সঙ্গত কারণেই। আর সবার হৃদয়েই এ চাহিদা আছে। এটা বলতে আমার কোনো দলিলের প্রয়োজন নেই, আমি জানি, বিশেষত যখনই লজ্জাস্থানের ব্যাপারে কথা আসে, তারা তা হিফাজত করে। তারা তাদের হায়া-লজ্জাবোধ সুরক্ষিত রাখে।

এখন প্রশ্ন হল এ ভয়ানক ব্যাধি থেকে কীভাবে আমরা নিজেদের ও আমাদের সন্তানদের রক্ষা করব, অনেকে মনে করেন এর থেকে বেঁচে থাকার সমাধান হল বিয়ে করে ফেলা। না, এ জিনিসের সমাধান বিয়ে নয়। আপনি যদি একজন যৌন-বিকারগ্রস্ত হয়ে থাকেন, তবে বিয়ের পরও আপনি তাই থাকবেন। আপনার যদি এখনই লজ্জা না থেকে থাকে, বিয়ের পরও আপনার লজ্জা থাকবে না। এটি সত্যি! আপনি ভাবছেন, বিয়ের মাধ্যমে আপনার সমস্যা শেষ হবে? না... আপনার সমস্যা বিয়ে নয়। আপনার সমস্যা আপনার আধ্যাত্মিক এবং মানসিক চিন্তা-চেতনায়। আপনাকে এসব বন্ধ করতে হবে। নিজেকেই এভাবে কষ্ট দেয়া থামাতে হবে। নয় তো আপনার ভেতরে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।

এগুলোকে প্রতিরোধ করার জন্য আমাদের নেই উল্লেখযোগ্য কোনো বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা। এ ক্ষেত্রে রয়েছে আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা আর এটা বলাটাও বাস্তবসম্মত হবে না যে, এসব ফেসবুক, ইউটিউব, ইন্টারনেট এসব হারাম! এটাই বাস্তব, এগুলো এখন অক্সিজেনের মতোই স্বাভাবিক ব্যাপার। আমরা শুধু যা করতে পারি তা হল আমাদের তরুণদের সঙ্গে এ বিষয়ে পরিপক্ব আলোচনা করে তাদের শেখাতে হবে কীভাবে এসব জিনিসকে মোকাবেলা করতে হয়, কীভাবে এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, যাতে করে এগুলোর ফাঁদে পড়ে জীবন বিপন্ন না হয়।

আর এ জন্য যা প্রয়োজন তা করুন, কখনও একা থাকবেন না। সব সময় ভালো বন্ধুর সঙ্গে থাকুন। অন্য কোথাও গিয়ে পড়াশোনা করুন, লাইব্রেরিতে চলে যান আর সেখানে পড়াশোনা করুন। বাসায় বা বাইরে থাকুন, এমন কোথাও চলে যান যেখানে আপনার আশপাশে আরও মানুষ থাকবে। কারণ যখনই আপনি একা থাকেন, শয়তান আপনাকে পেয়ে বসেন। আর আল্লাহর ভয় যদি আপনার জন্য যথেষ্ট না হয়, তবে অন্তত মানুষের ভয়েও যদি কাজ হয়। অন্তত নাই মামার চেয়ে তো কানা মামা ভালো? আমরা এসব জিনিস থেকে বেঁচে থাকার জন্য ব্যক্তিবিশেষ উপায়গুলো আলোচনা করেছি। এখন পারিবারিকভাবে আমাদের পদক্ষেপগুলো নিয়ে আলোচনা করব। প্রথমে বাবা-মায়েদের বলব, যদি আপনাদের বাসায় কম্পিউটার থেকে থাকে, দয়া করে সেটা যেন ল্যাপটপ না হয়, বাসায় ডেস্কটপ রাখুন। আর মনিটরটা যেন বিরাট বড় হয়, সবচেয়ে বৃহৎ যেই মনিটরটা পাবেন, সত্যি! আর এটাও নিশ্চিত করবেন কম্পিউটার যেন ড্রয়িং বা খাওয়ার ঘরে থাকে। শোবার ঘরে ব্যবস্থা করবেন না। বাচ্চাদের ঘরে তো নয়ই, এমনকি আপনাদের ঘরেও নয়। একদম সবাই দেখতে পাচ্ছে এমন দিকে মুখ করে, সবার মুখের সামনেই থাকবে। এভাবেই আমাদের সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

অভিভাবকদের বলছি আপনার ১৮ বছরের নিচে বাচ্চাকে কখনও স্মার্টফোন দেবেন না। বাচ্চাদের আপনার ব্যবহৃত স্মার্ট ফোনটিও দেবেন না। আমি এখন প্রায় এমন দেখি যে, স্কুলের বাচ্চার হাতে আইফোন, আইফোন-ফাইভ! কীসের জন্য? অভিভাবকরা ভালো করে জানেন, এগুলো কত ভয়ংকর হতে পারে, একবার চিন্তা করে দেখুন।

আপনাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, আপনার আর আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হল আমাদের অন্তর, আমাদের হৃদয়, তারপর আমাদের সন্তান ও পরিবার। আর এ পর্নোগ্রাফি, এ নির্লজ্জতা আমাদের অন্তর ও আমাকে ধ্বংস করে দেয়। নিশ্চিহ্ন করে দেয়, আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসকে, যা আমাদের সুরক্ষিত রাখতে হবে তাহল আমাদের ইমান। আর এসব নোংরা জিনিসগুলো আমাদের ইমানকেই নষ্ট করে ফেলছে। আপনাদের ইমানকে দুমড়ে-মুচড়ে, ছিঁড়ে ফেলছে- সেই সঙ্গে আমাদের সন্তান ও আমাদের পরিবারকেও। আর আমরা লিখে বা বক্তব্যের মাধ্যমে আপনাকে সচেতন করছি বেঁচে থাকার উপায়গুলো বাতলে দিচ্ছি। কিন্তু আপনাকে দিয়ে কোনো কিছু বন্ধ করাতে আমরা পারব না। সেটা আপনার নিজেকেই করতে হবে। নিজেকে আপনার নিজেরই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আপনাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, ‘আপনার ইমান কি আসলেই যথেষ্ট মূল্যবান আপনার কাছে? আমার সালাত কি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে? প্রকৃত সালাত অবশ্যই সালাত আদায়কারীকে মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ ...নাকি যুগযুগ ধরে এভাবেই চলতে থাকব আর ভান করব ভালো মুসলমানটি আমি?

লেখক : প্রাবন্ধিক ও দূতাবাস কর্মী

[email protected]