ঐশিক আলোয় গড়া অদৃশ্য ফেরেশতা

  মোহাম্মদ মাকছুদ উল্লাহ ২২ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফেরেশতাদের আকৃতি সম্পর্কে বিশদভাবে কোনো কিছু জানা যায় না।

ফেরেশতা শব্দটি ফার্সি ও উর্দু ভাষা থেকে এসেছে যা আরবি মালাকুন শব্দের ভাষান্তর।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ প্রকাশিত ‘সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ’-এ লিখিত হয়েছে, (মালাইকা) ফেরেশতা, প্রাচীন সেমেটিক শব্দ মালআকের অনিয়মিত বহুবচন; নুর তথা আলোক নির্মিত হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণিত একটি হাদিসে রয়েছে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ফেরেশতা আলোক তথা নুর সৃষ্টি (খুলিকাত মিন নুর) এবং জিন আগুন ‘মাআরিজে’ সৃষ্টি এবং আদম যা তোমাদেরকে বলা হয়েছে।’ (জামে মা’মার, হাদিস : ২০৯০৪, মুসনাদে ইসহাক, হাদিস : ৭৮৬)

ফেরেশতাদের আকৃতি সম্পর্কে বিশদভাবে কোনো কিছু জানা যায় না। তবে আল্লাহর দেয়া ক্ষমতা বলে তারা যে কোনো আকৃতি ধারণ করতে পারে। এ তথ্য বিভিন্ন হাদিস থেকে পাওয়া যায়।

পবিত্র কোরআনে সংক্ষেপে এতটুকু বলা হয়েছে, সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি, আসমান ও জমিনের সৃষ্টিকর্তা। যিনি ফেরেশতাদের বার্তাবাহক হিসেবে নিয়োগ করেছেন, যাদের পালক বিশিষ্ট দু-দুটি, তিন-তিনটি এবং চার-চারটি ডানা রয়েছে। তিনি সৃষ্টিতে যত ইচ্ছা করে থাকেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সব বিষয়ে চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী। (সূরা আল-ফাতির : ১)

উদ্ধৃত আয়াত থেকে এ বিষয়টি জানা যায়, ফেরেশতারা ডানাবিশিষ্ট। তাই বলে ফেরেশতাদের পাখি বলা যাবে না। কারণ ফেরেশতা যে নুর বা জ্যোতি থেকে সৃষ্টি সে কথা সহিহ হাদিসে প্রমাণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন সময় হজরত জিবরাইল (আ.)কে দেখেছেন এবং তিনি তার বর্ণনা সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর কাছে দিয়েছেন।

তবে এ জাতীয় হাদিসগুলোয়ও হজরত জিবরাইল (আ.)-এর পূর্ণ আকৃতির বিবরণ নেই। ইমাম আহমাদ (রহ.) রচিত ‘কিতাবুল যুহ্দ’-এ সংকলিত হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণিত এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি জিবরাইল (আ.)কে নামতে দেখেছি এমন অবস্থায় যে তিনি আসমানের দুই পাশ ঘিরে রেখেছিলেন, তার গায়ে অত্যন্ত সুন্দর ও পাতলা কাপড় ছিল, যার সঙ্গে অত্যন্ত মূল্যবান মোতি ও ইয়াকুত লাগান ছিল।’

অপর এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জিবরাইল (আ.)-এর দুই কাঁধের দূরত্ব উড়ন্ত পাখির ৫০০ বছরের রাস্তার সমান।’ অন্য এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, হজরত জিবরাইলের ৬০০ ডানা আছে। বিভিন্ন হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) হজরত জিবরাইল (আ.) ও অন্য ফেরেশতাদের বিভিন্ন অঙ্গের যে বিবরণ দিয়েছেন, সেগুলো পড়ে বোঝা যায়, রাসূলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন সময়ে ফেরেশতাদের যে আকৃতিতে দেখেছেন তিনি তার বিবরণ দিয়েছেন।

বস্তুত ফেরেশতারা যেহেতু নুরের তৈরি আর নুর বা আলোর কোনো নির্দিষ্ট রূপ বা আকৃতি নেই, অতএব, ফেরেশতাদেরও কোনো নির্দিষ্ট আকৃতি নেই। তারা বিভিন্ন আকৃতিতে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও পূর্ববর্তী নবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন।

হজরত লুত (আ.), হজরত মারইয়াম (আ.) ও হজরত মূসা (আ.) এবং আরও অন্য নবীদের সঙ্গে ফেরেশতাদের মানবাকৃতিতে সাক্ষাৎ করার বিষয়টি পবিত্র কোরআনের বিবরণ থেকে জানা যায়। হজরত জিবরাইল (আ.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে মানুষের আকৃতিতে সাক্ষাৎ করেছেন। সহিহ আল-বোখারির প্রসিদ্ধ হাদিসে জিবরাইলের বিষয়টি প্রমাণিত।

ফেরেশতারা নিষ্পাপ তাদের পাপাচারের কোনো ক্ষমতা দেয়া হয়নি। আল্লাহ যে কাজের জন্য, যে ফেরেশতাকে সৃষ্টি করেছেন বা নির্দেশ দিয়েছেন ওই কাজের বাইরে ভালো কি মন্দ অন্য কোনো কাজ করার এখতিয়ার বা ক্ষমতা কোনো ফেরেশতার নেই।

অর্থাৎ ফেরেশতাদের সত্ত্বায় ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছা ক্রিয়শীল নয়। মানুষের রয়েছে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা। মানুষকে কাজ করতে হয় পারিপার্শ্বিকতার প্রভাবাধীনে। রয়েছে প্রবৃত্তির তাড়না আর ইবলিস শয়তানের প্রতারণার ফাঁদ। তাই সার্বিক প্রতিকূল জীবনে থেকেও আল্লাহর প্রতি মানুষের আনুগত্য ফেরেশতাদের নিষ্পাপতা থেকে মর্যাদাপূর্ণ। আল্লাহর প্রতি ফেরেশতাদের আনুগত্য স্থিরকৃত। কারণ তাদের মধ্যে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নাফরমানি করার কোনো ক্ষমতাই নেই। তারা আল্লাহর ইবাদত করছেন যা আল্লাহ আদেশ করেছেন তাই এবং সেভাবে করছেন যেভাবে করতে তারা আদিষ্ট হয়েছেন। এর পক্ষে-বিপক্ষে ভাবার ইচ্ছা তাদের নেই। অন্যদিকে মানুষকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন দান করেছেন সীমাহীন জ্ঞান। যার বলে মানুষ নব নব সৃষ্টি ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে পৃথিবীকে আল্লাহর খেলাফত কায়েমের যোগ্যতর ক্ষেত্র করে তুলছে।

ফেরেশতাদের ওপর মানুষের মর্যাদা দানের বিষয়টি আদি পিতা হজরত আদম (আ.)কে সৃষ্টির সময়ই প্রমাণ করে দিয়েছেন আল্লাহ। পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে, হজরত আদম (আ.)কে সৃষ্টির পর তার জ্ঞান ও উদ্ভাবনী শক্তির বিষয়টি ফেরেশতাদের সামনে প্রমাণ করা হয়েছে। যেমন এরশাদ হয়েছে, আল্লাহতায়ালা আদমকে প্রয়োজনীয় সব জিনিসের নাম শিক্ষা দিলেন, এরপর সেগুলো ফেরেশতাদের সামনে পেশ করে বললেন, তোমরা যদি সত্যবাদী হও, তাহলে আমাকে তোমরা এগুলোর নাম বলে দাও। ফেরেশতারা বললেন, একমাত্র তুমিই সব ত্রুটি থেকে মুক্ত, তুমি আমাদের যা শিক্ষা দিয়েছ তার বাইরে আমাদের কোনো জ্ঞান নেই, তুমিই একমাত্র জ্ঞানী, একমাত্র কুশলী। (সূরা আল-বাকারা : ৩১-৩২) সে সময়ে ফেরেশতারা তাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নিলেন। এরপর হজরত আদম (আ.) আল্লাহর আদেশে উপস্থাপিত বস্তুরাজির নাম-পরিচয় জানিয়ে দিলেন। এভাবে হজরত আদম (আ.)-এর জ্ঞান ও প্রতিভার বিষয়টি প্রমাণিত হল। আল্লাহ আদমের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়ে তার সম্মানে ফেরেশতাদের সিজদা করতে নির্দেশ দিলেন। আল্লাহর নির্দেশের সঙ্গে সঙ্গে (ইবলিস ছাড়া) সব ফেরেশতা একত্রে আদম (আ.)কে সিজদা করে। (সূরা আস-সোয়াদ : ৭৩)।

ফেরেশতাদের আল্লাহ মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করে রেখেছেন। মুসলিম শরিফে হজরত উসাইদ ইবনে হুজাইর (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিস থেকে জানা যায়, মাতৃগর্ভে সন্তানের অস্থি-মজ্জা, চক্ষু-কর্ণসহ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তৈরি ও তার আকৃতি নির্ধারণের জন্য আল্লাহর নির্দেশে একজন ফেরেশতা নিয়োজিত হন এবং আল্লাহর নির্দেশে তিনি গর্ভের সন্তানের পুত্র বা কন্যা হওয়ার বিষয়টিও নির্ধারণ করে দেন। সুনানে তিরমিজিতে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত অন্য হাদিস থেকে জানা যায়, মানুষের রিজিক সরবরাহের দায়িত্বে আল্লাহ অসংখ্য ফেরেশতা নিয়োজিত করে রেখেছেন। বিভিন্ন হাদিসের বিবরণ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, প্রত্যেক আদম সন্তানের জীবনযাত্রাকে স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত করতে আল্লাহর নির্দেশে বিভিন্ন পর্যায়ে অসংখ্য ফেরেশতা নিয়োজিত রয়েছে। যুগে যুগে নবী ও রাসূলদের সঙ্গে যখন খোদাদ্রোহী সম্প্রদায় নিষ্ঠুর আচরণ করেছে, তখন তাদের সাহায্য করার জন্য এবং খোদার দুশমনদের শাস্তি দেয়ার জন্য আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতারা রয়েছেন। কওমে আদ, সামুদ, হুদ, লুত, ফিরাউন ইত্যাদি জাতির ঘটনা পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে।

যে ফেরেশতারা আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে না, মানুষের জীবন পরিক্রমা সচল রাখতে যারা অবিরত দায়িত্ব পালন করে চলেছেন তাদের অস্তিত্বে বিশ্বাস না করলে ইমানের পূর্ণতা আসবে না।

লেখক : পেশ ইমাম, রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীয় মসজিদ

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×