হামলার সময় তিলাওয়াতে ছিলেন তাকী উসমানী

  আহনাফ বিন সালমান ১২ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শায়খুল ইসলাম আল্লামা তাকী উসমানী
শায়খুল ইসলাম আল্লামা তাকী উসমানী

শায়খুল ইসলাম আল্লামা তাকী উসমানী মুসলিম জাহানের শীর্ষস্থানীয় আলিমদের একজন। তিনি মুসলিম উম্মাহর অমূল্য সম্পদ। ২২ মার্চ পাকিস্তানের করাচি শহরে তার ওপর সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। আল্লাহর রহমতে তিনি ও তার পরিবার নিরাপদ আছেন।

এ বেদনাদায়ক ঘটনায় তার সঙ্গে থাকা দু’জন শহীদ হয়েছেন, অন্য দু’জন মারাত্মক আহত হয়েছেন। পাকিস্তানের জাতীয় দৈনিক উম্মত সন্ত্রাসী হামলা নিয়ে সাক্ষাৎকার ছেপেছিল ২৬ মার্চে। ইসলাম ও জীবনের জন্য লেখাটি তরজমা করেছে-

প্রশ্ন : সন্ত্রাসী হামলা থেকে আপনার বেঁচে যাওয়া অলৌকিক ঘটনার চেয়ে কম নয়, আপনি বিষয়টিকে কীভাবে মূল্যায়ন করছেন।

উত্তর : সত্যি এটা অলৌকিক ঘটনা। গুলিবৃষ্টির মধ্যেও আল্লাহতায়ালা এমনভাবে আমাকে নিরাপদ রেখেছেন যে, একটি আঁচড়ও লাগেনি। তবে দু’জন সঙ্গীর শাহাদত এবং দু’জনের আহত হওয়ার কারণে আমি অত্যন্ত বেদনাহত। তারা তো হামলার ‘টার্গেট’ ছিল না, শুধু আমার সঙ্গে থাকার কারণে...!

প্রশ্ন : হামলার সময় কী আপনি কোনো দোয়া পড়ছিলেন?

উত্তর : দেখুন, আমি কখনও দোয়া পড়ি না, দোয়া করি এবং দোয়া চাই। দোয়া পড়ার জিনিস নয়। ভিখারি যেভাবে ভিক্ষা চায় দোয়া সেভাবে চাওয়ার বিষয়।

সাধারণত সূরা কাহাফ আমি শুক্রবার রাতেই নফলের মধ্যে পড়ে নিই। সেদিন রাতে পড়া হয়নি। তাই ওই সময় সূরা কাহাফ তিলাওয়াত করছিলাম। তিলাওয়াত শুরু করামাত্র হামলা শুরু হয়ে গেল। কয়েকটি গুলি আমার গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনে এসে লাগল। আশ্চর্যের বিষয় হল, প্রথমে গুলির আওয়াজকে আমার কাছে প্রচণ্ড বৃষ্টির আওয়াজের মতো মনে হয়েছে। আমি ভেবেছি, হঠাৎ বুঝি প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হয়েছে। গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনের ওপর যখন নজর পড়ল তখন বুঝলাম যে বৃষ্টি নয়, গুলিবৃষ্টি। ...

প্রশ্ন : তখন আপনার কী ধারণা হল?

উত্তর : প্রথমেই আমার ধারণা হয়ে গেল যে, এটা কোনো সন্ত্রাসী হামলা, যা আমাকে লক্ষ্যস্থল বানাতে চাচ্ছে। হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে করে সামনে-পেছনে ছিল, ওই অবস্থায় গুলি চালিয়ে যাচ্ছিল।

প্রশ্ন : খবরে যেমন এসেছে, হামলাকারীরা তিনটি মোটরসাইকেলে ছিল?

উত্তর : হ্যাঁ, প্রত্যেক মোটরসাইকেলে দু’জন করে ছিল। তবে প্রথম দিকে হামলাকারীদের সংখ্যা আমি আন্দাজ করতে পারিনি। আমার হাতে কোরআন শরিফ ছিল, আর তিলাওয়াতে আমি এমন নিমগ্ন ছিলাম যে, আমার কোনো ধারণাই ছিল না, পথের কোন্ স্থানে আমরা আছি। এ কারণে হামলাকারীদের সংখ্যার দিকেও আমার চিন্তা যায়নি।

সফরে আমি হয় তিলাওয়াত করি, না হয় কোনো কাজে থাকি। তাই সাধারণত আমার জানা থাকে না যে, গাড়ি কোন্ পথ অতিক্রম করছে। হামলার দিনও এ অবস্থাই ছিল।

প্রশ্ন : গুলি আপনার কতটা পাশ দিয়ে যাচ্ছিল?

উত্তর : পুলিশ প্রহরী চালকের পাশের আসনে বসা ছিল। আমি আমার স্ত্রী ও পৌত্র-পৌত্রীর সঙ্গে পেছনের আসনে ছিলাম। আমি বাম দিকের দরজার পাশে ছিলাম। গুলি তখন লাগাতার চলছিল। বিশেষ করে পেছন থেকে আসা গুলি আমাদের মাথার প্রায় চুল ছুঁয়ে সামনের আসনের পেছনে বিদ্ধ হচ্ছিল। এর মধ্যে ডান দিক থেকে আসা একটি গুলি আমার গাড়ির চালক হাবীবের শরীর বিদ্ধ হল। সে নিজের কথা চিন্তা না করে আমাকে চিৎকার করে বলল, আপনি নিচে শুয়ে পড়ুন। তখন তিনদিক থেকেই গুলি বর্ষিত হচ্ছিল। আহত অবস্থায়ও চালক হাবীব পূর্ণ গতিতে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিল।

আশ্চর্যের কথা বলি। আমি তো বাম দিকের দরজার পাশে ছিলাম। একটি গুলি বামপাশের দরজায় ঠিক ওই স্থানে আঘাত করল যেখানে আমার পা ছিল। এখনও ভেবে পাচ্ছি না যে, গুলিটা পায়ে না লেগে দরজায় কীভাবে বিদ্ধ হল! হয়তো কোনোদিনই এ রহস্য জানা যাবে না।

আমি এবং আমার পরিবার যেহেতু পেছনের আসনে ছিলাম তাই হামলার জোরটা পেছন দিক থেকেই ছিল। পেছনের কাচ তো চুরচুর হয়ে গেল, কিন্তু আল্লাহর কী শান! একটা গুলিও আমাদের স্পর্শ করেনি!

প্রশ্ন : ওই সময় আপনার স্ত্রীর প্রতিক্রিয়া কী ছিল? নিষ্পাপ বাচ্চা দুটির অবস্থাই বা কী ছিল?

উত্তর : পৌত্র ইয়ামান হল পাঁচ বছরের, আর পৌত্রী দীনা হল সাত বছরের। সুতরাং তাদের তো জানাই ছিল না যে, আসলে কী হচ্ছে। তবে চালক ও প্রহরী যখন গুলিবিদ্ধ হল তখন ইয়ামান বুকে হাত রেখে বলল, ‘বাবা, আমার এখানে লেগেছে।

আমার তখন হতভম্ব অবস্থা, বলতে পারেন এক ধরনের কেয়ামত হয়ে গেল। বে-কারারির হালতে আমি শুধু দোয়া করলাম, ‘আয় আল্লাহ, আমার বাচ্চাটাকে বাঁচান!’

আমি তাড়াতাড়ি ইয়ামানের জামার বুতাম খুলে দেখলাম। তখন বুঝতে পারলাম গুলিতে চূর্ণ হওয়া কাচের টুকরো ওর বুকে লেগেছে। কাচের টুকরো আমার স্ত্রীর হাতেও লেগেছে। তার হাতেও কোরআন ছিল। তিনিও তিলাওয়াত করছিলেন। আলহামদুলিল্লাহ, আমার মতো তারও অন্তরে কোনো ভয়ভীতি ছিল না। হামলার সময় তিনি সূরা ইয়াসীন তিলাওয়াত করছিলেন। তখন তিনি যে আয়াত তিলাওয়াত করছিলেন তার অর্থ হল-

‘আমরা তাদের সামনে-পেছনে দেয়াল তুলে দিলাম, আর তাদের চোখ ঢেকে দিলাম, ফলে তারা কিছু দেখতে পেল না।

সত্যি সত্যি আল্লাহতায়ালা আয়াতের মু’জিজা দেখিয়েছেন। নইলে এটা অকল্পনীয় যে, এত কাছে থেকে ছোড়া একটা গুলিও আমাদের চারজনের কাউকে স্পর্শ করল না!

লেখক : ছাত্র, মাদ্রাসাতুল মাদীনা, বয়স ১৩

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×