বরকতময় রাত শবেবরাত

  সৈয়্যেদ নূরে আখতার হোসাইন ১৯ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শবেবরাত একটি গুরুত্বপূর্ণ রাত। এ রাত বিশ্ববাসীর মুক্তি, কল্যাণ ও রহমতের জন্য নির্ধারিত। এ রাতের মর্ম সবার কাছে সমান নয়। যারা আল্লাহর রহস্য সম্পর্কে যত বেশি ধারণা রাখেন তারাই এ রাতের প্রতি ততটাই যত্নবান। যে কারণে সুফি সমাজে শবেবরাতের মর্যাদা অনেক বেশি। রাসূল পাক (সা.)-এর সময়ে মসজিদে নববীর আহলুস্ সুফফার সদস্যরা শবেবরাত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করতেন। সিয়াহ সিত্তার অন্তর্ভুক্ত ইবনে মাজাহতে আহলুস্ সুফফার অন্যতম সদস্য হজরত আলী (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসূল (সা.) বলেছেন- যখন শাবানের ১৫ তারিখ আসবে তখন রাতে কিয়াম-ইবাদত বন্দেগি করবে এবং দিনে রোজা রাখবে। হজরত আলী (রা.) থেকে আরও বর্ণিত আল্লাহতায়ালা বলেছেন, লাইলাতুল নিফসে মিন শাবান কে আছ ক্ষমা প্রার্থী? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। কে আছ অভাবী? আমি তাকে রিজিক দান করব। কে আছ প্রার্থনাকারী? আমি তার প্রার্থনা কবুল করব। এভাবে এ আহ্বান ফজর পর্যন্ত চলতে থাকে।

শবেবরাতের ওপর সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবে তাবেঈন, আয়িম্মায়ে মুজতাহিদীন, ওলামায়ে দ্বীন, পীর-বুজুর্গ, সুফি সাধক, আলেম-ওলামা, সালফে সালেহীন ও মুহাদ্দিসিনে কিরামরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সমর্থন করে নিজেরা পালন করে আসছেন। এ রাতের বিশেষ ইবাদত এবং দিনের রোজা পালনের ঐতিহ্য যুগ যুগ ধরে পালিত হচ্ছে।

পবিত্র কোরআনে সূরা ‘দুখানে’ আল্লাহতায়ালা বলেছেন, নিশ্চয়ই আমি বরকতময় রাতে কিতাব নাজিল করেছি। এ রাতে প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ফায়সালা করা হয়। এ আয়াতে ‘লাইলাতুম মুবারাকাহ’ বা বরকতময় রাতটির সুনির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ না থাকায় সাহাবারা দু’রকম ব্যাখ্যা দিয়েছেন। অনেক সাহাবা লাইলাতুল বারাতের কথা বলেছেন। তাদের অন্যতম হজরত আবু হুরায়রা (রা.), হজরত ইকরামাহ (রা.), হজরত আয়েশা (রা.), শেরে খোদা হজরত আলী (রা.), হজরত আবু সালাবা (রা.), হজরত আবদুল্লাহ ইবন ওমর (রা.) প্রমুখ। কিছু সাহাবা আয়াতের অর্থ শবেকদরকেও বুঝিয়েছেন। তবে পবিত্র কোরআনের এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বিশ্বখ্যাত ২৭টি তাফসির গ্রন্থে ‘লাইলাতুম মুবারাকাহ’ বলতে শবে কদরকে প্রাধান্য দেয়া হলেও শবেবরাতের সম্ভাব্যতাও বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ শবেবরাতকে অস্বীকার করা হয়নি। এসব তাফসির গ্রন্থের উল্লেখযোগ্য হল- তাফসিরে কুরতবি, তাফসিরে কাশশাফ, তাফসিরে কবির, তাফসিরে রুহুল আ’আনি, তাফসিরে দুররে মানসুর, তাফসিরে রুহুল বয়ান, তাফসিরে বাইযাভি, তাফসিরে বাগাভি প্রভৃতি নামকরা তাফসির গ্রন্থ।

ইমাম ইবনে মাজাহ (রহ.) এবং ইমাম তিরমিজি (রহ.) শুধু শবেবরাতের হাদিস বর্ণনা করেননি। বরং তাদের গ্রন্থে স্বতন্ত্র অধ্যায় রচনা করেছেন। যাতে প্রতিফলিত হয়েছে শবেবরাতের বৈধতা এবং ইবাদতের গুরুত্ব। তারাও এ রাতে ইবাদত বন্দেগি করেছেন। সিয়াহ সিত্তার এসব জগদ্বিখ্যাত মুহাদ্দিসদের বর্ণনা ও আমলকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।

আয়িম্মায়ে মুজতাহিদীন হজরত ইমাম আবু হানিফা (রহ.), হজরত ইমাম মালেক (রহ.), হজরত ইমাম শাফেঈ (রহ.) এবং হজরত ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (রহ.) নিজেরা শবেবরাত পালন করেছেন এবং শবেবরাত পালনের পক্ষে যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন। হানাফি মতের অনুসারী হজরত আবদুল হক মোহাদ্দেস দেহলভি (রহ.) ‘মা সাবাতা বিস সুন্নাহ’ গ্রন্থে এই রাতের মর্যাদা সম্পর্কে হাদিসগুলো বর্ণনার পর কয়েকজন তাবেয়ীর বাণী ও তাদের আমলগুলো উল্লেখ করেছেন। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেন, আমাদের কাছে এই মর্মে হাদিস পৌঁছেছে যে, ৫টি রাতে দোয়া কবুল হয় : ১. জুমার রাতে, ২. ঈদুল আজহার রাতে, ৩. ঈদুল ফিতরের রাতে, ৪. রজবের প্রথম রাত ও ৫. শবেবরাতের রাত। ইমাম হাম্বল (রহ.) বলেন, আশুরার রাত, পহেলা রজবের রাত এবং শাবানের ১৫তম রাতে নফল ইবাদত করা মুস্তাহাব। ইমাম মালেক (রহ.) ‘মাদখাল’ গ্রন্থে নিজের আমল সম্পর্কে লিখেছেন, এ রাত খুবই সম্মানিত ও বরকতময়। সালাফে সালেহীনরা এ রাতটিকে অত্যন্ত সম্মান করতেন এবং এ রাতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন।

অনেক বুজুর্গানে দ্বীন সুফি মতাদর্শের ধারক ও বাহক এবং আল্লাহর অলিরা শবেবরাতে নফল ইবাদত করেছেন এবং স্বরচিত গ্রন্থে এর মর্যাদা বর্ণনা করেছেন।

হজরত বড়পীর মহিউদ্দিন আবদুল কাদির জিলানি (রহ.) লিখেছেন, এ হল আল্লাহ পাকের দান এবং তাঁর নেয়ামত বা অনুগ্রহ। আল্লাহতায়ালা তাঁর সব তোহফার দুয়ার শাবানের ১৫ তারিখে খুলে দেন। অলিয়ে কামেল শামসুল উলামা আল্লামা হজরত শাহ সুফি সৈয়্যেদ আহমদ আলী ওরফে হজরত জানশরীফ শাহ সুরেশ্বরী (রহ.) নূরে হক গঞ্জেনূর গ্রন্থে লিখেছেন, শাবানের চৌদ্দ তারিখ শবেবরাতের রাতে বছরের ফলাফল লেখা হয়। তাই তিনি এক রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে আল্লাহর শত ধন লাভের প্রতি তাগিদ দিয়েছেন।

হাদিস শরিফ, তাফসির গ্রন্থ ও অলি আউলিয়াদের অসংখ্য বর্ণনায় শবেবরাতের সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। তা সত্ত্বেও অনেকেই শবেবরাত পালনের ক্ষেত্রে বিরুদ্ধাচরণ করছেন, যা মোটেও কাম্য নয়। কেননা, নেক নিয়তে নফল ইবাদতের প্রচলন করা ও আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করতে বাধা নেই। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অনুসারী আল্লাহর অলি, সুফি, দরবেশরা যারা আল্লাহর রহস্য সম্পর্কে জানতে পেরেছেন এবং বাংলাদেশসহ বিশ্বময় ইসলাম প্রতিষ্ঠার পথিকৃত হিসেবে কাজ করেছেন তারা শবেবরাত পালন করেছেন এবং সবাইকে পালনের নির্দেশ দিয়েছেন।

তবে শবেবরাতের ইবাদত নির্দিষ্ট রাতের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় তা যথা তারিখে পালন করতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ করা যাবে না। নির্দিষ্ট তারিখে শবেবরাত পেতে হলে সঠিকভাবে চান্দ্রমাসের হিসাব গণনা করতে হবে।

লেখক : ইসলামী চিন্তাবিদ ও প্রধান গদিনশীন পীর, দরবারে আউলিয়া সুরেশ্বর দ্বায়রা শরিফ

Email : [email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×