এভাবেই বিয়ের বয়স পার হয়ে গেল

  জাবীন হামিদ ১৯ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পরিবারের কেউ কখনও বিয়ের প্রস্তাব আনেনি আমার জন্য। এটা অস্বাভাবিক মনে হতে পারে, কিন্তু সত্যি। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই মা অসুস্থ। আমার বিয়ের জন্য মা কাউকে কখনও বলেন না। একদিন শুধু বলেছিলেন, তুই আমার এত আদরের মেয়ে। শ্বশুরবাড়িতে তোকে কষ্ট দিলে আমি সহ্য করব কীভাবে? বড় ভাই-ভাবিও কখনই আমার বিয়ের জন্য চেষ্টা করেন না। খালা-মামারা মাঝে মাঝে বিয়ের কথা তুললেও মার কথা ভেবেই পিছিয়ে আসেন। আমি শ্বশুরবাড়ি চলে গেলে তাদের এই অসুস্থ বোনের সেবা-যত্ন কে করবে?

বড় ভাই-ভাবির মনেও এই একই আতঙ্ক। আমার বিয়ে হয়ে গেলে অসুস্থ মায়ের সব দায়িত্ব তাদের নিতে হবে। তাই নিজে থেকে চেষ্টা করা তো দূরের কথা, সহকর্মী বা পাড়া-প্রতিবেশী কেউ কোনো প্রস্তাব আনলে নানা অজুহাতে ফিরিয়ে দেবেন। ছেলের ঢাকায় বাড়ি নেই, ছেলের বাবা-মার শিক্ষাগত যোগ্যতা কম, ওদের দেশের বাড়িতে পাকা বাড়ি নেই, আমাদের একটা মান-সম্মান আছে না? এখানে বিয়ে সম্ভব না। এভাবে বেশ কিছু প্রস্তাব ভাই-ভাবি ফিরিয়ে দিয়েছেন।

কখনও আমার কাছে প্রস্তাব আসতেই পারে না। তার আগেই ভাই-ভাবি নাকচ করে দেন। দু-একটা প্রস্তাব ভাবি গোপনে তার নিজের বোনদের জন্য বাপের বাড়িতে পাঠিয়েছেন এভাবেই। আমার বিয়ের বয়স পার হয়ে গেল। হয়তো চেষ্টা করলে বাচ্চাসহ বিপত্নীক ডিভোর্স পাত্র পাওয়া যেত। কিন্তু মা, ভাই, ভাবি কেউ না বললে আমি নিজে থেকে কীভাবে বলি এই কথা? ঘর জামাই পাত্র দেখার কথাও কেউ বলল না।

মা চলে গেলেন এক সময়। ভাবি চাকরিতে ঢুকে গেছেন। ভাবির মেয়েকে আমি দেখে রাখি। আমার মতো বিশ্বাসী বিনা পয়সার একটা কাজের বুয়া থাকলে চাকরি করতে অনেক সুবিধা। কাজের লোককে বেতন কম দিলে বা বকাঝকা দিলে তারা অন্য বাসায় চলে যায়। আমাকে বেতন দিতে হয় না, আর ধমক দিলেও আমার কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। অফিস থেকে ফেরার পর বাচ্চার জন্য ভাবির ভালোবাসা একদম উথলে পড়ে আর আমি হই অপরাধী। কেন ভাবির নির্দেশ মতো সব কাজ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে পারিনি, সেগুলো আমার মহাঅপরাধ হয়ে যায়।

আমি বিনা বেতনে ভাবির বাচ্চাকে সারা দিন দেখে রাখি বলেই তো ভাবি চাকরি করতে পারছেন। কিন্তু সেটা ভাবি স্বীকার করেন না। তিনি ভাবেন, আমাকে তাদের সঙ্গে রেখেছেন, এটাই অনেক দয়া দেখানো হচ্ছে। মা-বাবা দু’জনেই মারা যাওয়ার পর আমি ভেবেছিলাম, হয়তো বা ওয়ারিশান সূত্রে কিছু টাকা হাতে পাব। তাহলে ইচ্ছামতো একটু খরচ করতে পারব, নিজের জন্য আর চেনা-পরিচিত গরিবদের জন্য। কিন্তু হাত খরচের সামান্য টাকা ছাড়া ভাইয়া কখনওই আমাকে টাকা দেন না। এই টাকা দেয়ার সময় ভাবি এমন মুখ বানান, যেন আমি জোর করে তার স্বামীর রোজগারে ভাগ বসাই। অথচ এগুলো তো আমার প্রাপ্য টাকা। আমার মা-বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে এগুলো পাচ্ছি। ভাইয়ের মেয়েটা খুব সুন্দর। ওর জন্য বিয়ের প্রস্তাব আসা শুরু হয়েছে। কিন্তু ও চায় না, ওর মা-বাবাও চান না এখন বিয়ে। আগে পড়াশোনা, চাকরি, তারপর সব দিকে যোগ্য ছেলে পাওয়া গেলে তখন বিয়ের কথা ভাবা যাবে।

মাস্টার্স করার পর আমার ভাতিজি বায়না ধরল সে পিএইচডি করতে বিদেশে যাবে। আমি একবার বলেই ফেললাম, বিয়ে করে বরের সঙ্গে একসঙ্গে গেলে হতো না? কিন্তু সময় কম, সেমিস্টার শুরু হয়ে যাচ্ছে। ছেলে দেখার সময় নেই, ভাতিজি চলে গেল। কিছুদিন পর খবর পেলাম ওর পিঠে খুব ব্যথা হয়, হাঁটতে কষ্ট হয়। ওষুধ খেয়ে ও ব্যথা কমায়। ওর জন্য অনেক প্রস্তাব আসে কিন্তু ও তো দেশে থাকে এমন ছেলে বিয়ে করবে না। ওর জন্য প্রবাসী খুঁজতে খুঁজতে আরও দিন পার হয়ে গেল। ভালো ছেলে পাওয়া যায় কিন্তু ও যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে সেখানে নয়। অন্য জায়গায় গিয়ে ছেলে দেখার সময় নেই ভাতিজির, প্রবাসী ছেলেরাও ব্যস্ত। তাও সময় করতে পারত কিন্তু আমার ভাতিজির আসলে এত তাড়াতাড়ি বিয়ের ইচ্ছা নেই। কেউ মেসেজ দিলে বা কল করলে ও ফোন ধরে না, মেসেজের জবাব দেয় না। এভাবে দুই বছর পার হয়ে গেল। ওর বয়স এখন তিরিশ ছুঁই ছুঁই। ভাইয়া ভাবি এখন চিন্তা করছেন মেয়ের বিয়ের কথা। কিন্তু ২৯+ বললে মানুষ ধরে নেয় বয়স ৩০ পার হয়ে গেছে। মেয়ের জন্য মানানসই প্রস্তাব আর তেমন আসছে না। মানানসই পাত্র পেলে দেখা যায় সে ডিভোর্সড। শুনে ভাতিজি শিউরে ওঠে, ভাইয়া-ভাবি বিরক্ত হন। তাদের মেয়ের জন্য এমন অপমানজনক প্রস্তাব যে নিয়ে আসে, তাকে নানা কথা শুনিয়ে দেন ভাবি।

এ সময় ধরা পড়ল আমার ভাতিজির মেরুদণ্ডের হাড়ে যক্ষ্মা হয়েছে। এমন অসুখের কথা আমি আগে কখনও শুনিনি। ও শয্যাশায়ী হয়ে পড়ল, পিএইচডি শেষ করতে পারল না। অনেক দিন অসুখে ভুগল ও। চোখের সামনে দেখছি ওর বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে ভাবি আমার কোনো বদ দোয়া লেগে গেল না তো?

আল্লাহ সাক্ষী, আমার ভাতিজির জন্য কখনও এমন কিছু আমি চিন্তা করিনি। ভাইয়া-ভাবির প্রতি আমার অভিমান আছে, ওদের আচরণে আমি অনেক কষ্ট পেয়েছি। আমার স্বামী নেই, সংসার নেই, বাচ্চা নেই, কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স নেই- এসব কিছুর জন্য ভাইয়া-ভাবি দায়ী। মা অসুস্থ, অসহায় ছিলেন কিন্তু ভাই-ভাবি কেন আমাকে একাকী জীবনে রাখলেন? ভাবি তার বাপের বাড়ি থেকে সম্পত্তি পেয়েছেন কিন্তু ননদকে সম্পত্তির অংশ দিতে কখনও স্বামীকে বলেন না। কোনো বাবা অথবা ভাই কি লেখাটা পড়ছেন? দেখুন তো আপনার পরিবারে এমন কেউ আছেন কিনা? একাকী নিঃসঙ্গ জীবন তার। আপনি তার বিয়ে নিয়ে কোনো চিন্তা করছেন না, অথচ তিনি হয়তো এখনও মনের সঙ্গোপনে ভাবেন : যদি একটা সংসার হতো। আপনার প্রতি আপনার বোন বা মেয়ের কোনো অভিমান নেই তো? সে নীরবে চোখের পানি ফেলছে না তো? বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা কারও চোখের পানি আর দীর্ঘশ্বাস আপনার জীবনে অভিশাপ হয়ে যেন ফিরে না আসে। আর কোনো মেয়েকে যেন বলতে না হয়, আমার বিয়ের জন্য কেউ কখনও চেষ্টা করেনি। আমার স্বামী, সংসার, বাচ্চা, ব্যাংক ব্যালেন্স কিছুই নেই।

পবিত্র কোরআনে বিয়ে প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা একা আছে তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করে দাও। তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা বিয়ের যোগ্য, তাদেরও বিয়ের ব্যবস্থা করো। পাত্র-পাত্রী কোনো একজনের গরিবি হালত যেন তোমাদের পিছিয়ে না দেয়। আল্লাহ অনুগ্রহ করে তোমাদের অভাবমুক্ত করে সম্পদশালী করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। (সূরা-নূর, আয়াত-৩২)

(ঘটকালির অভিজ্ঞতা থেকে লেখা)

লেখক : ফ্রিল্যান্স প্রতিবেদক ও এডমিন

Islamic matrimony

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×