মানবতার কল্যাণে পরিকল্পিত জাকাত

  ড. মোহাম্মদ হায়দার আলী মিয়া ১৭ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইসলামী সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি অনন্য উপকরণ। জাকাত দরিদ্র, অভাবী ও অক্ষম জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তার গ্যারান্টি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির হাতিয়ার।

জাকাতের অর্থ হচ্ছে পবিত্রতা। পারিভাষিক অর্থে জাকাত বলতে ধনীদের ধন-মাল থেকে আল্লাহর নির্ধারিত হারে অবশ্য দেয় অংশকে বুঝায়। সম্পদশালীদের সম্পদ থেকে জাকাত সংগ্রহ করে নির্ধারিত আটটি খাতে বণ্টন করা ইসলামী রাষ্ট্রের নীতি।

জাকাতদাতার মন ও আত্মাকে পবিত্র এবং পরিশুদ্ধ করে জাকাত। তার ধন-সম্পদকেও পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র করে। জাকাত দরিদ্রদের অভাব পূরণে সহায়তা করে। ইমাম ইবনে তাইমিয়া লিখেছেন, সাদাকাহ প্রদানকারীর মন ও আত্মা পবিত্র হয়, তার ধন-মাল বৃদ্ধি পায়।

-সূরা হাশর : ৭ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, সম্পদ যেন কেবল তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।

আমার রহমত সবকিছু পরিব্যাপ্ত করে নিয়েছে। আমি তা লিখে দেব সেই লোকদের জন্য যারা তাকওয়া অবলম্বন করে ও জাকাত দেয় এবং যারা আমার আয়াতসমূহের প্রতি ঈমান রাখে। সূরা আ’রাফ : ১৫৬

কেউ যদি আল্লাহর পুরস্কারের আশায় জাকাত দেয় তাহলে তাকে পুরস্কৃত করা হবে। কিন্তু যে জাকাত দিতে অস্বীকার করবে তার কাছ থেকে শক্তি প্রয়োগ করে জাকাত আদায় করতে হবে এবং আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী তার অর্ধেক সম্পত্তিও নিয়ে নেয়া হবে। -আহমদ, নাসাঈ ও বায়হাকী

যে তার সম্পত্তির উপর জাকাত দিল সে যেন তার সব পাপ ধুয়ে ফেলল। -তাবারানী, ইবনে সুসাইমাহ ও হাকীম আল্লাহ যাকে ধন দিয়েছেন, সে যদি জাকাত আদায় না করে তাহলে কিয়ামতের দিন তা একটি বিষধর অজগরের রূপ ধারণ করবে যার দু’চোখের উপর দু’টি কালো চিহ্ন থাকবে। বলবে, আমিই তোমার ধন-মাল, আমিই তোমার সঞ্চয়। -বুখারী

জাকাত হচ্ছে আল্লাহর হুকুম এবং অন্যতম মৌলিক ফরজ। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে তৃতীয় স্তম্ভ হচ্ছে জাকাত। ঈমানের পর নামাজ এবং তারপরই জাকাতের স্থান। কোরআন মজিদের বত্রিশ স্থানে জাকাতের কথা বলা হয়েছে। তার মধ্যে আটাশ স্থানে নামাজ ও জাকাতের উল্লেখ একসঙ্গে করা হয়েছে।

নামাজ এবং জাকাতে পার্থক্য করার কোনো অবকাশ নেই। ইবনে জায়েদ বলেছেন, ‘নামাজ ও জাকাত একসঙ্গে ফরজ করা হয়েছে, এ দুটির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।’ হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেছেন, ‘তোমাদের একসঙ্গে আদেশ করা হয়েছে নামাজ কায়েম করা ও জাকাত দেয়ার জন্য।’ তাই কেউ জাকাত না দিলে তার নামাজও হবে না। হজরত খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) বলেছেন, ‘নামাজ এবং জাকাত একটি অপরটির সম্পূরক, একটি ছাড়া অন্যটি কবুল হয় না।’ এ কারণে ইসলাম জাকাত আদায়ের জন্য কঠোর ব্যবস্থা করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কেউ যদি আল্লাহর পুরস্কারের আশায় জাকাত দেয় তাহলে তাকে পুরস্কৃত করা হবে। কিন্তু যে জাকাত দিতে অস্বীকার করবে তার কাছ থেকে শক্তি প্রয়োগ করে জাকাত আদায় করতে হবে এবং আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী তার অর্ধেক সম্পত্তিও নিয়ে নেয়া হবে।’ (আহমদ, নাসাঈ ও বায়হাকী)। ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবুবকর সিদ্দিক (রা.) জাকাত না দেয়ায় তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন।

জাকাত কারা দেবেন

জাকাত কেবল স্বাধীন, পূর্ণ বয়স্ক মুসলিম নর অথবা নারী যার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ আছে তার উপর ফরজ। জাকাতের শর্তগুলো হচ্ছে-

সম্পদের উপর পূর্ণাঙ্গ মালিকানা : সম্পদের উপর জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য সম্পদের মালিকানা সুনির্দিষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ হওয়া জরুরি।

সম্পদ উৎপাদনক্ষম হওয়া : জাকাতের জন্য সম্পদকে অবশ্যই উৎপাদনক্ষম, বর্ধনশীল বা প্রবৃদ্ধমান হতে হবে।

নিসাব : জাকাত ধার্য হওয়ার তৃতীয় শর্ত হচ্ছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা। নিসাব বলা হয় শরীয়ত নির্ধারিত নিম্নতম সীমা বা পরিমাণকে। সাধারণভাবে ৫২.৫০ তোলা রূপা বা ৭.৫০ তোলা সোনা বা এর সমমূল্যের সম্পদকে নিসাব বলা হয়। কারও কাছে ৭.৫০ তোলা সোনা বা ৫২.৫০ তোলা রূপা থাকলে বা উভয়টি মিলে ৫২.৫০ তোলা রূপার মূল্যের সমান অথবা সব সম্পদ মিলে ৫২.৫০ তোলা রূপার সমমূল্যের সম্পদ থাকলে সে সম্পদের জাকাত দিতে হবে।

জাকাত কাদের জন্য

কালামে পাকে আট শ্রেণীর লোক জাকাত পাওয়ার যোগ্য। সূরা তওবা : ৬০

ফকির : ফকিরকে বাংলায় গরিব বলা হয়।

মিসকিন : যাদের আর্থিক অবস্থা গরিবদের চেয়েও খারাপ তারাই মিসকিন।

আমেলুন : আমলার বহু বচন আমেলুন। ‘আমেলুনা আলাইহা’ বলতে জাকাতের কাজে নিযুক্ত লোকদের বুঝানো হয়েছে।

মন জয় করার জন্য : ইসলামের বিরোধিতা বন্ধ করা বা ইসলামের সহায়তার জন্য কারও মন জয় করার প্রয়োজন হলে এবং নও-মুসলিমদের সমস্যা দূর করার জন্য জাকাত তহবিল থেকে অর্থ ব্যয় করা হবে।

গলদেশ মুক্ত করা : গলদেশ মুক্ত করা বলতে দাসত্ব শৃংখলে আবদ্ধ লোক এবং বান্দাদের মুক্ত করাকে বুঝানো হয়েছে।

ঋণগ্রস্তদের ঋণ পরিশোধ : ঋণভারে জর্জরিত লোকেরা মানসিকভাবে সর্বদাই ক্লিষ্ট থাকে এবং কখনও কখনও জীবন সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়ে। তাদের জীবনীশক্তির ক্ষয়সাধিত হয়। অনেক সময়ে তারা অন্যায় ও অসামাজিক কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে। সুতরাং যথার্থ প্রয়োজনে ঋণগ্রস্ত লোকদের ঋণের বোঝা থেকে মুক্ত করা ইসলামী সমাজের দায়িত্ব। এ জন্য আল্লাহ জাকাতের অর্থ ব্যয় করার নির্দেশ দিয়েছেন যাতে সমাজকে সুস্থ রাখা যায়।

পরিকল্পিতভাবে জাকাত সংগ্রহ ও ব্যয় বণ্টনের ব্যবস্থা করতে পারলে যে কোনো দেশের দারিদ্র্য দূর করে দুস্থ মানবতার কল্যাণে ভূমিকা রাখা যাবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের ঠিকভাবে সব সময় জাকাত দেয়ার তৌফিক দিন।

লেখক : ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও, এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ লিমিটেড

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×