শরিয়তে এবং তরিকতে সিয়াম পর্যালোচনা

  সৈয়্যেদ নূরে আখতার হোসাইন ১৭ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সুফিবাদ এমন একটি জ্ঞানের শাখা যা সমগ্র জগতের প্রভু প্রেমময় আল্লাহতায়ালার নৈকট্য লাভের শিক্ষা দেয়। মদিনায় মসজিদে নববিতে অবস্থানকারী রাসূল (সা.)-এর অনুসারীদের আহলুল সুফফা বা সুফি বলা হতো। তারা রাসূল (সা.)-এর সার্বক্ষণিক সান্নিধ্য লাভের মাধ্যমে আত্মিক পরিশুদ্ধি লাভ করেছিলেন। তার আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও প্রেম-ভালোবাসার মাধ্যমেই সুফিত্বের প্রকাশ ও পরিস্ফুটন হয়।

সুফিবাদের মূল লক্ষ্য- হারাম, মিথ্যা, রেয়া বা লোক দেখানো ইবাদত-বন্দেগি, ঈর্ষা, কেনা বা দুইজনের মধ্যে দ্বন্দ্ব লাগানোর চেষ্টা, আদাওয়াত বা অন্যের প্রতি শত্রুতা, সাহাওয়াত বা কাম দমন করা, গিবত, তাকাব্বরী বা অহংকার না করা ইত্যাদি পাপকর্ম না করা আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা।

আল্লাহপ্রেমিক সুফিদের জীবনযাত্রায় চিরন্তন সিয়াম পালনের ধারা লক্ষ করা যায়। সুফিরা সিয়ামের হাকিকত উপলব্ধি করতে পারেন এবং সে অনুযায়ী আমল করে থাকেন। সিয়ামের মাধ্যমে তারা নফসে আম্মারাকে ধ্বংস করে থাকেন। দৈহিক ভোগ বিলাসের যে তীব্র আকাক্সক্ষা মানবহৃদয়ে জাগ্রত হয় তাই নফসে আম্মারা বা ভোগাত্মা। এর কাজ মানবাত্মাকে বিভ্রান্ত করা এবং আত্মিক বা আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে অন্তরায় সৃষ্টি করা। অথচ জাগতিক লোভ-লালসা, কামনা-বাসনা থেকে মোহমুক্ত না হতে পারলে মহাপ্রভুর সান্নিধ্য লাভ করা সম্ভব নয়। আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে বলেছেন, নিশ্চয়ই নফসে আম্মারা মানুষকে বিপথগামী করে। তাই মাওলানা রুমি বলেছেন, নফসে আম্মারা ফেরাউনের চেয়েও কম শক্তিশালী নয়। এ অর্থেই রাসূল (সা.) বলেছেন, প্রতিটি মানবসন্তানের সঙ্গেই একটি একটি করে শয়তান রয়েছে।

সিয়ামের হকিকত হচ্ছে নফসের কামনাকে সংযত রাখা। মানুষের দশ ইন্দ্রিয় যেমন সৎকাজে তেমনি পাপ কাজের জন্য সমান উপযোগী। এসব ইন্দ্রিয় দিয়েই মানুষ আল্লাহর ফরমাবরদারি করে, আবার নাফরমানিও করে। তাই সব ইন্দ্রিয়কে বশে রাখার জন্য সিয়াম সবচেয়ে মোক্ষম হাতিয়ার। এরকম সিয়ামের প্রকৃষ্ট নিদর্শন পাওয়া যায় মহান সুফি সাধক ও আল্লাহর অলিদের জীবনে। হজরত বড়পীর মহিউদ্দিন আবদুল কাদির জিলানী (রহ.) বলেছেন, পানাহার এবং যা কিছু করলে সিয়াম ভঙ্গ হয় তা করা থেকে বিরত থাকা শরিয়তের বিধান মতে সিয়াম। অপর পক্ষে হারাম, কুপ্রবৃত্তি, লোভ-লালসা ও নিষেধ হওয়া সব কাজ থেকে বিরত থাকাই তরিকতের সিয়াম। নিষেধ হওয়া কাজে তরিকতের সিয়াম নষ্ট হয়ে যায়। শরিয়তের সিয়াম নির্দিষ্ট সময়ের জন্য; কিন্তু তরিকতের সিয়াম আজীবন সর্বক্ষণ।

হজরত ইমাম গাজ্জালী (রহ.) মর্যাদা হিসেবে সিয়ামকে তিন শ্রেণীতে ভাগ করেছেন। এক. নিু শ্রেণীর সিয়াম- শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকা। নানাবিধ গোনাহের কাজ থেকে বিরত থাকার চিন্তা থাকে না। দুই. মধ্যম শ্রেণীর সিয়াম- পানাহার ইত্যাদি থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি সব পাপ থেকে আত্মরক্ষা করা; যেমন- মুখ ও জিহ্বাকে সংযত রাখা, অনর্থক কথা বলা, মিথ্যা, গিবত ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা, চক্ষুকে হারাম দর্শন থেকে সংযত রাখা। এরকম সিয়াম শতগুণে প্রশংসনীয়। তিন. উচ্চ শ্রেণীর সিয়াম- এ শ্রেণীর সিয়ামে পানাহার ইত্যাদি থেকে বিরত থাকার সঙ্গে সঙ্গে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে পাপ কাজ থেকে বিরত রাখা হয়, অপরদিকে মনকেও কুপ্রভাব, কুচিন্তা থেকে পবিত্র রাখা হয় এবং আল্লাহর ধ্যান ও ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে সিয়ামকে সমৃদ্ধ করা হয়। এটিই সিয়ামের প্রকৃত হাকিকত।

উপমহাদেশের প্রখ্যাত অলিয়ে কামেল শামসুল উলামা আল্লামা হজরত শাহ সুফি সৈয়্যেদ আহমদ আলী ওরফে হজরত জানশরিফ শাহ সুরেশ্বরী (রহ.) বলেছেন, রমজানের ত্রিশটি রোজায় ত্রিশটি বুরাই দূর হয়ে ত্রিশটি নূর হাসিল হয়। এই রোজায় ঈমান বিমল হয়, নেক কাজে মন যায় ও নানাবিধ পীড়া থেকে মুক্তি ঘটে।

প্রত্যেক মুমিন-মুসলিমের উচিত হবে বেশি বেশি ইবাদত-বন্দেগি ও দান-খয়রাত করা এবং আন্তরিকভাবে সিয়ামের হাকিকত অর্জনে সচেষ্ট থাকা। সিয়ামের মাধ্যমে মোত্তাকি হওয়ার শিক্ষা মন-মগজে চিরন্তনরূপে স্থাপন করতে হবে। সবার উচিত হবে সুফিবাদের আলোকে সিয়ামের শিক্ষা আত্মস্থ করে আল্লাহর প্রেমের পথে অগ্রসর হওয়া।

লেখক : ইসলামী চিন্তাবিদ ও গদিনশীন পীর, দরবারে আউলিয়া সুরেশ্বর দ্বায়রা শরিফ

Email : [email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×