দুই খতিবের সময়োচিত বয়ান

প্রকাশ : ১৭ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  তোফায়েল গাজালি

রমজান এলে বাড়ে হাফেজদের কদর। ১২ মাস কোরআনের এ মানুষটি কই থাকেন! কীভাবে চলে তার জীবন সংসার! সে খবর আমরা রাখি ক’জন? হাফেজদের সুবিধা-অসুবিধা, মর্যাদা ও তাদের মূল্যায়ন নিয়ে কথা বলেছিলাম উত্তরা গাউসুল আজম জামে মসজিদের খতিব, দেশবরেণ্য মুফাসসিরে কোরআন আল্লামা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ূবী ও গুলশান সোসাইটি জামে মসজিদের খতিব, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন হাফেজ, মারকাজু ফয়জিল কোরআন আল ইসলামী ঢাকা-এর প্রিন্সিপাল মুফতি মুরতাজা হাসান ফয়েজী মাসুমের সঙ্গে। মাওলানা আইয়ূবীর কাছে জানতে চেয়েছি কোরআনের সত্য ও সুন্দর বাণী পৌঁছে দিতে খতিবদের ভূমিকা কী? তিনি বলেন, রমজানের বড় একটি বৈশিষ্ট্য হল, মানুষ এ মাসে ইসলামের শিক্ষাকে যত সহজে গ্রহণ করে অন্য কোনো মাসে এরকম করে না। একজন খতিব রমজানের ৪টি বা ৫টি জুমায় ও তারাবিহের পরের বয়ানে গৎবাঁধা স্টাইলের বাহিরে এসে, যদি পরিকল্পিতভাবে জীবন ও সমাজের উপযোগী ওয়াজ নসিহত করতে পারেন তাহলে আমি মনে করি একজন মুসলমানের বাকি ১১টি মাস সত্য ও সুন্দর পথের নির্দেশনা রাখবে। তিনি বলেন, খতিবদের মৌলিক দায়িত্ব হল মুসলমানদের মধ্যে ইসলামী জাগরণ সৃষ্টি করা। এ ক্ষেত্রে কিছু কিছু খতিবদের ভূমিকা প্রশংসনীয় বটে তবে সব খতিবই যে তাদের এ দায়িত্ব পালন করছেন তা আমি বলব না। খতিবদের দায়িত্ব পালনে প্রধান অন্তরায় হচ্ছে রাজনৈতিক প্রভাব, পাশাপাশি আমাদের মসজিদগুলো কমিটি শাসিত হওয়ায় অনেক খতিব দ্বীনের অনেক কথা এড়িয়ে যেতে বাধ্য হন। আমি খতিবদের বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করাকে যেমন অনুচিত মনে করি তেমনি হেকমত ও কৌশলের সঙ্গে মানুষের কাছে বাস্তবতা তুলে ধরতে অনুরোধ করি। সামাজিক অনাচার রোধে শুধুই ওয়াজ নসিহতের মধ্যেই খতিবদের কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন করলে মাওলানা বলেন, সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া সামাজিক অবক্ষয় রোধ সম্ভব নয়। সময়ের চাহিদা অনুযায়ী বাস্তবতার আলোকে জুমার খুতবা, ওয়াজ মাহফিল, সভা-সেমিনারের পাশাপাশি জনসচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন খতিবদের নেতৃত্বে হলে ফলাফল আরও ভালো হবে। জানতে চেয়েছিলাম খতিব বা বক্তা হওয়ার মাপকাঠি কি? মাওলানা আইয়ূবী বলেন, কোরআন-সুন্নাহের সরল ব্যাখ্যা সম্পর্কে তার গভীর জ্ঞান থাকতে হবে। বক্তা সময়ের চাহিদা উপলব্ধি করতে পারেন এমন দূরদর্শী হতে হবে। সরকার কিছু খতিবের একটি তালিকা তৈরি করে তাদেরকে বিশেষ নজরদারিতে নিয়ে এসেছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, এর অনেকগুলো কারণ আছে, আজকাল অনেকে ওয়াজের নামে যেসব কমেডি করছেন তা বন্ধ হওয়া দরকার। ইসলামের আলো নিভিয়ে দিতে কেউ যদি খতিবদের কণ্ঠরোধ করতে চায় তাহলে এটা কখনোই সম্ভব নয়। আল্লাহ তার আলোকে চিরদিন জ্বালিয়ে রাখবেনই।

মুফতি মুরতাজা হাসান ফয়েজীর কাছে কোরআনের হাফেজদের সম্মান ও মর্যাদা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হাফেজে কোরআনদের ব্যাপারে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূল (সা.) বলেছেন, কেয়ামতের দিন হাফেজে কোরআনকে বলা হবে, কোরআন পাঠ করতে করতে উপরে উঠতে থাক। তুমি দুনিয়াতে যেভাবে ধীরস্থিরে পাঠ করতে সেভাবে পাঠ কর। কেননা তোমার তেলাওয়াতের শেষ আয়াতেই (জান্নাতের উচ্চস্থানে) তোমার বাসস্থান হবে। (আবুদাউদ, তিরমিজি) হজরত সাহল ইবনু মুয়ায জুহানি তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোরআন পাঠ করে এবং সেভাবে আমল করে, কেয়ামতের দিন তার পিতা-মাতাকে এমন মুকুট পরানো হবে যার আলো সূর্যের আলোর চেয়েও উজ্জ্বল হবে। (মুসনাদে আহমাদ) এ মহা সম্মানের অধিকারী হাফেজে কোরআনদের আমরা কি যথাযথ কদর করছি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা হাফেজে কোরআনদের মর্যাদাকে এতটাই দিয়েছেন যে, কোনো মানুষের পক্ষেই হাফেজে কোরআনের যথাযথ মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। সব সময় তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, তাদের খোঁজ-খবর নেয়া, সুখে-দুঃখে তাদের পাশে দাঁড়ানো মানুষের কর্তব্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও আমাদের দেশের বাস্তবতা এই যে, এক রমজান বিদায় নিয়ে পরবর্তী শবেবরাত পর্যন্ত আমরা হাফেজদের আর কোনো খোঁজ-খবর নেই না। মুফতি মাসুম বললেন, পৃথিবীর বহু দেশে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাগুলোতে আমাদের দেশের হাফেজরা বিজয়ী হয়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করলেও আমাদের দেশে তাদের তেমন কোনো মূল্যায়ন করা হয় না। জাতি হিসেবে এটা আমাদের জন্য লজ্জার।

লেখক : পরিচালক, ফিদায়ে মিল্লাত ইন্সটিটিউট

[email protected]