বুকভরা জ্বালা নীরবে বয় হাফেজে কোরআন

  আল ফাতাহ মামুন ১৭ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রমজানের অন্যতম আকর্ষণ তারাবি পড়া। মসজিদ কমিটি থেকে শুরু করে ইমাম-মুয়াজ্জিন এমনকি খতিবের মাধ্যমেও নানা হয়রানির শিকার হন হাফেজ। দীর্ঘ ২০ বছর তারাবি পড়ানোর অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে দেশসেরা হাফেজ আল মামুন সরকার (ছদ্মনাম) বলেন, মানুষের দোয়া আল্লাহর দয়ায় রেডিও-টেলিভিশনে সেরা তেলাওয়াতকারী স্বীকৃতি পেয়েছি। ইউটিউবে আমার তেলাওয়াতের ভিউ লক্ষ ছাড়িয়ে যায়। অন্যান্য হাফেজরা আমাকে বলেন, ভাই, আপনার তেলাওয়াতের স্টাইল রপ্ত করে যেখানে ইন্টারভিউ দিচ্ছি সেখানেই এলাউ হচ্ছি। সেই আমিও এ বছর রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশলাইন মসজিদে ইন্টারভিউর নামে হয়রানির স্বীকার হয়েছি। হয়রানির নেপথ্য মসজিদের খতিবের কারসাজি প্রমাণিত হয়েছে।

তিনি বলেন, স্বজনপ্রীতি এমনকি আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমেও হাফেজ নিয়োগের ঘটনা ঘটছে যারা ইন্টারভিউ নেন, তারা বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করে অযোগ্য হাফেজদের নির্বাচন করেন। অধিকাংশ ইন্টারভিউই লোক দেখান। ‘ধর্মদালাল’দের নিপুণতায় (!) হাফেজ সিলেক্ট হয়ে যায় ইন্টারভিউর আগেই। হাফেজ নিয়োগে সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হল, সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে পাস করার পরও বয়স কম কিংবা দাড়ি ওঠেনি এ অজুহাতে যোগ্য হাফেজকে বাদ দিয়ে অযোগ্য হাফেজ নিয়োগ দেয়া হয়। অথচ শরিয়তে বয়স কিংবা দাড়ি ওঠা তারাবির জন্য শর্ত নয়।

আরেকজন হাফেজ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হাফেজদের সঙ্গে সবচেয়ে ন্যক্কারজনক যে ঘটনাটি ঘটে তা হল, আমি কোনো মসজিদে ৮-১০ বছর ধরে তারাবি পড়াচ্ছি। এতদিনে কমিটি কিংবা খতিবের ছেলে, ভাতিজা, শ্যালক হাফেজ হয়ে বেরিয়েছেন। এখন আমাকে বাদ দেয়ার জন্য উদ্ভট সব কারণ দেখানো হয়। কারওয়ান বাজার আম্বরশাহ শাহী মসজিদে দীর্ঘ আট বছর তারাবি পড়ানোর পড় মসজিদের খতিবের নাতি হাফেজ হলে আমাকে ছাড়ানোর অজুহাত দিয়ে বলা হয়, এই হাফেজের পেছনে নামাজ পড়া মাকরূহ; তিনি গানের সুরে কোরআন পড়েন!

সবচেয়ে নির্লজ্জ ঘটনা ঘটে ‘হাফেজ সাহেবের’ হাদিয়া নিয়ে। টাকা ওঠানো হয় হাফেজের নামে। কিন্তু ওই টাকা ভাগ হওয়ার পর খুব সামান্য অংশই হাফেজদের পকেটে আসে। ইমাম-মুয়াজ্জি-খতিব-খাদেম, মসজিদের ঋণ, কারেন্ট বিল আরও কত খাতে যে হাফেজের টাকা ভাগ হয়- তা কেবল মসজিদ কমিটিই ভালো বলতে পারেন।

দারিদ্র্যপ্রবণ বাংলাদেশে অনেক হাফেজ তারাবির হাদিয়ায় পুরো বছরের পড়াশোনা এবং সংসারের খরচ চালান। কেউ আবার তারাবির হাদিয়ায় ভর্তি হবেন, নতুন জামাতের কিতাব কিনবেন এরকম পরিকল্পনাও করে থাকেন। মানুষও খুশি হয়ে হাফেজের জন্য সাধ্যমতো হাদিয়ার ব্যবস্থা করেন। কষ্টের সঙ্গে বলতে হয়, দশ ভাগের পর যে যৎসামান্য হাদিয়া হাফেজের ভাগ্যে জুটে, তার ওপরও একশ্রেণীর আলেম নামধারী ধর্মব্যবসায়ী ফতোয়া জারি করেন। তারাবির নামাজ পড়িয়ে টাকা নেয়া হারাম। এ আলেমদের জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়, আপনারা যে হাফেজের নামে তোলা টাকা নিজের পকেটে ভরেন তা বুঝি খুব জায়েজ?

তারাবি পড়িয়ে হাদিয়া নেয়া জায়েজ-না জায়েজ এ বিষয়ে হাফেজ মাওলানা আল মামুন সরকার বলেন, দীর্ঘ বিশ বছরের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, যে সব মসজিদের খতিব হাফেজ, তারা তারাবির হাদিয়াকে জায়েজ বলেন। কারণ, মাস শেষে পুরো হাদিয়া তো তার পকেটেই আসবে। আর যে সব মসজিদের খতিব হাফেজ নন, তারা তারাবির হাদিয়াকে না জায়েজ, হারাম বলে ফতোয়া দেন।

রমজানজুড়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে তারাবি পড়ানো হাফেজ যে কত শত জুলুম-নির্যাতন, মানসিক নিপীড়ন, অমানবিক আচরণ সহ্য করে হাসিমুখে তারাবি পড়িয়ে যাচ্ছেন, এর পেছনে একটিই কারণ- মুসল্লিরা যেন খতম তারাবির সওয়াব থেকে বঞ্চিত না হন। মুসল্লিদের জন্য যার মনে এত দরদ! এত ব্যথা! সে হাফেজের অধিকার প্রতিষ্ঠায় মুসল্লিরা কি পারেন না তাদের পাশে দাঁড়াতে! কোরআনে হাফেজদের সুখ সংরক্ষণের ব্যবস্থা মুসল্লিদের করা উচিত।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Emai : [email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×