হাফেজদের ভালোবাসি বারো মাস

  হাফেজ শাহ শরীফ ১৭ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পবিত্র কোরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিলকৃত পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। কোরআন সংরক্ষণের দায়িত্ব আল্লাহ নিজেই গ্রহণ করেছেন। আল্লাহ বলেন, আমিই এ উপদেশ গ্রন্থ অবতারণ করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষক। (সূরা-হিজর, আয়াত-৯) এ কারণেই কোরআন নাজিলের যুগ থেকে আল্লাহর মনোনিত একদল পূতপবিত্র বান্দা কোরআন সংরক্ষণের কাজে নিজেকে ব্রত রেখেছেন। যাদেরকে আমরা হাফেজে কোরআন নামে চিনি। কোরআন সিনায় ধারণ করা মামলি কোনো বিষয় নয়। কোরআনের দায়িত্ব নিতে পাহাড়ও অস্বীকৃতি জানিয়েছে। আল্লাহ বলেন, যদি আমি এই কোরআন পাহাড়ের ওপর অর্পণ করতাম, তবে তুমি দেখতে, পাহাড় বিনীত হয়ে আল্লাহর ভয়ে বিদীর্ণ হয়ে গেছে। আমি এ সব দৃষ্টান্ত মানুষের জন্য বর্ণনা করি, যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে। (হাসর, আয়াত-২১) একমাত্র আল্লাহর প্রিয় বান্দা যারা তারাই কোরআন সংরক্ষণের দায়িত্ব নিতে পেরেছেন। পৃথিবীতে কোরআন ছাড়া আর কোনো গ্রন্থ নেই যা মানুষ মুখস্থ করতে পেরেছে। সারা বিশ্বে লাখ লাখ কোরআনের হাফেজ আছেন। ছয় বছরের বাচ্চা থেকে শুরু করে অনেক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী কোরআন মুখস্থ করার বহু নজির রয়েছে। এটি মূলত কোরআনের অলৌকিকত্ব এবং হাফেজদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ। কিন্তু আফসোসের বিষয় হচ্ছে, হাফেজদের প্রতি সমাজের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ভালো নয়। আমাদের এই সমাজের আশপাশেই তারা অবহেলিত জীবন-যাপন করছেন। তাদের খোঁজ-খবর নেয়ার মতো কোনো মানুষ নেই এ সমাজে। দু’জন হাফেজের একান্ত কিছু কথা তুলে ধরছি আজকের লেখায়। হাফেজ মুহাম্মদ ইসমাঈল হোসাইন। এ বছর তারাবি পড়াচ্ছেন গাজীপুর জেলা, কালিগঞ্জ থানার ভাটিরা গ্রামের বাইতুল নূর জামে মসজিদে। একই গ্রামের ‘ভাটিরা হাফিজিয়া মাদ্রাসার হেফজ বিভাগে চাকরি করছেন। জানতে চেয়েছিলাম তার জীবন-যাপনে আর্থিক অবস্থা কেমন? তিনি বলেন, মাদ্রাসা থেকে বেতন পাই ৭ হাজার ২শ’ টাকা। বর্তমান সময়ে এত কম টাকা দিয়ে পরিবার নিয়ে চলা কষ্টকর। ধারদেনা করে কোনোরকম জীবন পার করছি। পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ কারতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মধ্যবিত্ত একটি পরিবারের যেখানে খরচ হয় মাসিক ২০ হাজার টাকা সেখানে সাত হাজার টাকা দিয়ে এক হাফেজের পরিবার আল্লাহ চালাচ্ছেন। অবস্থা এমন যে নুন আনতে পান্তা ফুরায়, গত রমজানে তারাবি থেকে হাদিয়া পেয়েছি আট হাজার টাকা। সারা বছর এ ছাড়া আর কোনো অতিরিক্ত উপার্জন হয়নি। শুধু রমজান এলে তারাবির জন্য হাফেজদের খোঁজ করা হয়। বাকি এগারো মাস হাফেজদের কেউ কোনো খোঁজ-খবর রাখে না। এ সমাজের হাফেজদের প্রতি এমন অবহেলার কারণে অনেক হাফেজে কোরআন রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি কেউ গাড়ির ড্রাইভার বা গার্মেন্টসে চাকরি করেও জীবন চালাচ্ছেন। যার ফলে তারা কোরআন মুখস্থ করেও সমাজে কোনো মূল্যায়ন পাচ্ছেন না।

হাফেজ মুস্তাকিম বিল্লাহ। এ বছর তারাবি পড়াচ্ছেন সাভার, আমিন বাজার মেলারটেক শাহী জামে মসজিদে। তিনি বলেন, রাষ্ট্র বা সমাজ কেউ হাফেজদের কোনোরকম দায়িত্ব নিচ্ছে না। বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রে হাফেজদের রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে হাফেজদের কোনো মূল্যায়ন করা হয় না। দেশের খেলোয়াড়দের জন্য চার-ছক্কা হাঁকানোর কারণে টাকা বরাদ্দ হয়। সেরা সুন্দরী, সেরা নায়ক, গায়কের পুরস্কার দেয়া হয়। কিন্তু যারা আমাদের একমাত্র জীবন বিধান পবিত্র কোরআনকে সংরক্ষণ করছেন যুগযুগ ধরে তাদের জন্য দু’টাকা বরাদ্দ হয় না। আজকের হাফেজরা ছয়-সাত হাজার টাকা বেতনে বিভিন্ন মাদ্রাসায় চাকরি করছেন। শহরের কিছু মাদ্রাসা বাদে গ্রামের প্রায় মাদ্রাসায় ধান, গম, চাল কালেকশন করে পাঁচ-ছয় মাস পর হাফেজদের বেতন দেয়া হয়।

হাফেজদের এমন কষ্টের কথা এ জাতি জানতে চায়নি কখনও। জাতি শুধু বড়াই করে আমাদের দেশে ঘরে ঘরে হাফেজ।

হাফেজে কোরআনরা আমাদেরই ভাই, বন্ধু বা আত্মীয়-স্বজন। তাদেরকে সম্মান করা মানে কোরআনের সম্মান করা। মুসলমান হিসেবে আমাদের দায়িত্ব সব সময় তাদের খোঁজ-খবর রাখা। তারা যেন সচ্ছলভাবে চলতে পারে সেই ব্যবস্থা করে দেয়া। সরকারের কাছে আবেদন থাকবে যেন হাফেজে কোরআনদের স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। হাফেজদের নির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করে সরকারি সনদ দিয়ে তাদের জন্য মাসিক সম্মানির ব্যবস্থা করা জরুরি। তাহলে সরকারের এই মহান উদ্যোগকে জাতি সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করবে, যিনি এ কাজটি করবেন তিনি হাফেজদের চোখের মণি হয়ে থাকবেন চির জীবন। আল্লাহ তাকে গায়েবি মদদ দেবেন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×