কাবার ছায়ায় খোদার মায়ায়

  মঈন চিশতী ২৪ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সারা দুনিয়ার মুসলিম উম্মাহ সুযোগ পেলেই কাবায় ছুটে আসেন। এবারের সফরসঙ্গী আমার আম্মাজান লালপুরী শাহর জীবনসঙ্গিনী, ছোট ভাই এবং মামা খালারা। অনেক দিনের স্বপ্ন আল্লাহ এবার পূরণ করছেন। এই সফর প্রস্তুতিকালে লালপুরী শাহর রুহানি আওলাদ হাফেজ আহমাদ উল্লাহ ভাই ওয়াদা করান হেরেম থেকে যেন অন্তত দুটি লেখা যুগান্তরের পাঠকদের জন্য পাঠাই।

লালপুরী দরবারের ছোট হুজুর হঠাৎ তার এক সফরসঙ্গী আলেমকে বলল, চলেন হজ মৌসুম শুরু হওয়ার আগে বড় হুজুরকে সঙ্গে করে মক্কা-মদিনা সফর করে আসি। তিনি হজের ওপর কিতাব লিখেছেন। দোয়া কবুলের স্থান মানাজিলুল কোরআন সাহাবিদের স্মৃতির জায়গাগুলো তিনি জানেন যা কর্তৃপক্ষ সাধারণত হজ উমরাকারীদের দেখান না। এবার কাবা এবং মদিনা সফর হবে নিরিবিলি পরিবেশে। কারণ প্রেমের মঞ্জিলে একা যেতে হয়। তখন প্রেমে মজা আসে। কাবা তো প্রেমের উৎস মানবজাতির প্রথম ঘর। ইন্না আউয়্যালা বাইতিয়া বিবাক্কাতান- নিশ্চয়ই মানবজাতির প্রথম ঘর যা মক্কায় অবস্থিত। মানুষ তো প্রেমের উৎস। কারণ মানুষের সৃষ্টি প্রেমের কারণে। মানুষ হল দুনিয়ায় আল্লাহর প্রতিভূ ‘জিল্লুল্লাহি ফিল আরদ্ব’। মানুষ না হলে আল্লাহর পরিচয় কোথায়? মানুষও বানাইল আল্লাহ প্রেমের কারণে /প্রেমের ডুরি বান্দরে মানুষের সনে। এই কারণেই মানবতার খেদমতে আল্লাহ মিলে যায়। কথায় বলে খেদমতে খোদা মিলে। হাদিসে আছে ইরহামু মান ফিল আরদ্বে, দুনিয়ায় যারা আছেন তাদের উপর দয়া কর ইয়ারহামুকুল মান ফিসসামাঈ। তাহলে আকাশে যিনি আছেন, তিনি তোমাদের ওপর দয়া করবেন। কেউ স্বীকার করুক আর না করুক বিশ্ব পরিচালিত হচ্ছে কাবাকে কেন্দ্র করে। কাবা চত্বরে গেলে দেখা যায় সাদা-কালো নানা কিসিম নানা ভাষার লোক এক অজানা আকর্ষণে বসে আছে। সেই আকর্ষণটি হল দ্বীনে কায়্যিম, পরিশুদ্ধ ভারসাম্যপূর্ণ ধর্ম, শরীয়ত বা জীবন ব্যবস্থা। কালামে পাকের ভাষায় আল্লাহ বলেন, তাবদিলা লি খালকিল্লাহি, আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন নেই, জালিকা দ্বীনিল কাইয়্যিম, এটাই একটি ভারসাম্যপূর্ণ ধর্ম। কিন্তু আমরা দ্বীনকে টুকরা টুকরা করে দুনিয়ার দোকান বানিয়ে নিয়েছি। দ্বীনকে নিজ গোষ্ঠী বা কোটারি স্বার্থে ব্যবহারের ফলে নামাজি বেড়েছে, হাজী বেড়েছে, কিন্তু ঈমান ও বিশুদ্ধ জবান হারিয়ে গেছে। কালামে পাকে আছে ইয়া আইয়্যুহাল্লাজিনা আমানু, হে ঈমানদারেরা ইত্তাক্কুল্লাহা, তোমরা পরহেজগারি অবলম্বন কর, আর তা অর্জনের জন্য ক্বুলু ক্বাওলান সাদিদা ইয়ুসলিহ লাকুম আ’মালাকু, পরিশুদ্ধ কথা বল, কিন্তু আমরা জবান ঠিক করতে পারি না বলে আমলও ঠিক হচ্ছে না। পরীক্ষার খাতায় এলোমেলো লিখে যেমন পাসের আশা করা যায় না, তেমনি ইচ্ছাধীন আমল করে দুনিয়ার কল্যাণ আর আখেরাতের নেয়ামতের আশা করা যায় না।

আমাদের এবাদতগাহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যে দিকেই নজর বুলান, দেখবেন আমরা নিজেদের খেয়াল মতো সব সাজিয়ে নিয়েছি। মুনাফাখোর আর মজুতদারদের টাকায় মসজিদগুলো সাজুগুজু করছি। ফলে নিরাপত্তার কারণে জামাতের আধা ঘণ্টার মধ্যেই মসজিদ তালাবন্ধ করতে হয়। ফলে মদিনার খেজুর পাতার ছাউনি মসজিদে যে ঈমান আমলওয়ালা লোক তৈরি হতো, এখন আর সেই লোক তৈরি হয় না। আমাদের মসজিদগুলোর নির্মাণ সাজসজ্জায় রিয়া বা লৌকিকতা এবং হালাল মালের সঙ্গে হারাম মাল মিশে যাচ্ছে। ফলে ইবাদতের স্বাদ এবং রূহানিয়ত থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। কবি নজরুলের ভাষায় নামাজি তোর নামাজ হল যে ভুল/ মসজিদে তুই রাখলি সেজদা ছাড়ি ঈমানের মূল। ঈমান শুধু মৌখিক স্বীকৃতির নাম নয়। স্বীকৃতির সঙ্গে সঙ্গে কর্মে পরিণত করা মানবসেবা করাও ঈমানের দাবি। ঈমানের ৭০টি শাখা-প্রশাখার মধ্যে ইমাতাতুল আজা আনিত্তারিক, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানোও ঈমানের অংশ বলে নবীজি (সা.) বলেছেন।

আমরা সেই মানবতার কাজ ছেড়ে হালাল-হারামের বিচার না করে মসজিদ খানকা ইত্যাদি সজ্জিতকরণের প্রতিযোগিতায় নেমেছি। আমরা যে আইয়্যামে জাহেলিয়াতের যুগের কোরাইশদের চেয়ে নিচু হয়ে গেছি তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

মক্কার কোরাইশ নেতারা হালাল অর্থের অভাবে খানায়ে কাবার ইব্রাহিমী ভিত্তির কিছু অংশ ছেড়ে দিয়েই কাবা পুনঃনির্মাণ করেন। সে কারণেই কাবায় বারবার মানুষ ফিরে ফিরে আসে কাবার আকর্ষণে, রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মানুষ তাওয়াফে ব্যস্ত থাকে, মাতাফ সংলগ্ন মসজিদে ইতিকাফ তেলাওয়াতে জিকিরে রত থাকে। আর আমাদের মসজিদ থেকে নামাজ শেষে মুসল্লি দ্রুত মসজিদ ছেড়ে চলে গিয়ে যেন বাঁচে। (কাবা চত্বর থেকে লেখা)

লেখক : ধর্মচিন্তক সুফি ও গবেষক

Email : [email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×