মানবতার বিজয় এসেছিল বদর প্রান্তরে

  মীম মিজান ২৪ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মানবতার প্রধান বিজয়টি এসেছিল বদর প্রান্তরে। আসুন জেনে নেই সেই বদর যুদ্ধের প্রেক্ষাপট পরবর্তিকালে এর প্রভাব। জেনে নেব মানবতার কল্যাণে এই যুদ্ধের ভূমিকা।

নবী করিম (সা.) চল্লিশ বছর বয়সে মক্কায় চালিয়েছিলেন দাওয়াতি কাজ গোপনে। তারপর প্রকাশ্যে এ সময় কাফের মুশরিকদের অত্যাচারও বাড়তে থাকল।

নবী করিম (সা.) মদিনা রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হলেন। গোত্রে গোত্রে বিভেদ ভুলিয়ে দিলেন।

বদর যুদ্ধের প্রেক্ষাপট অনুসন্ধানে জানা যায়, মদিনার শান্তিকামী মুমিনরা রাসূল (সা.)-এর আগমণ ও সাম্যবাদি বারতায় আনন্দিত হল। খাজরাজ বংশের পৌত্তলিক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবায় ইবনে সলুলের জন্য নবনির্মিত স্বর্ণমুকুটটি শান্তির এই দূতের কাছে অর্পণ করা হল। মানবতার ধারক সবার প্রাণপ্রিয় নেতা রাসূল (সা.) সে মুকুট ব্যবহার না করে বিক্রি করে দুস্থদের সেবায় বিলিয়ে দেন। আর সেই স্বর্ণমুকুট হারানোর ব্যথায় প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবায়। মক্কার কাফিরদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করে ষড়যন্ত্র পাকাল। আর বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সংবিধান ও চুক্তি অনুযায়ী পরিচালিত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ফুঁসিয়ে তুলল কাফেরদের।

মক্কার বেদুইন মুশরিকগোষ্ঠী ও মদিনার চক্রান্তকারী ছদ্মবেশী মুনাফিকরা চক্রান্ত করে নবী করিম (সা.) ও ইসলামকে দুনিয়া থেকে চিরতরে উৎখাত করে দেয়ার জন্য রণপ্রস্তুতি নিল। ঠিক সে সময়ে কুরাইশদের একটি ব্যবসায়ী দল কাফের নেতা আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে যুদ্ধাস্ত্র কিনে মদিনা হয়ে সিরিয়া থেকে মক্কা যাচ্ছিল। মদিনায় তাদের রসদ লুট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় মক্কায় গোপন বিপদসংকেত পাঠাল। এই সংবাদ পেয়ে হঠকারী কাফির সরদার আবু জেহেল এক সহস্র অশ্বারোহী সশস্ত্র যোদ্ধাসহ মদিনা এল। গোপন সূত্রে এ সংবাদ পেয়ে মহানবী মুহাম্মদ (সা.) জীবনের প্রথম রোজাদার সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শে বসলেন। সাহাবায়ে আজমাইনের সুদৃঢ় ঈমানী চেতনা ও মনোবলে হজরতে আকরাম (সা.) অত্যন্ত প্রীত হলেন।

মুশরিক নেতা আবু জেহেলের যুদ্ধ যাত্রার খবর শুনে দ্বিতীয় হিজরির রমজান মাসের ১২ তারিখে গোটা জাহানের ত্রাণকর্তা সেনাপতি রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর নিরেট মুমিন শাহাদাতের অমীয় সুধা পানে প্রস্তুত ৬০ জন মুহাজির ও ২৫৩ জন মাক্কি আনসারসহ মোট ৩১৩ জন সাহাবি সঙ্গে নিয়ে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য মদিনা থেকে যাত্রা শুরু করে ৮০ মাইল দূরে বদর প্রান্তরে উপস্থিত হন।

হিজরি দ্বিতীয় সালের ১৭ রমজান ‘আশহুরে হুরুম’ বা যুদ্ধনিষিদ্ধ মাস চতুষ্ঠয়ের অন্যতম রমজানেই মদিনা আক্রমণ করে বসে কাফেররা। আর তার বিপরীতে মুসলিমগণ গ্রহণ করেছিল আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধের কৌশল। সত্য-অসত্যের চূড়ান্ত ফয়সালাকারী ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ হল এভাবেই।

আল্লাহর ওপর পূর্ণ বিশ্বাসী মুসলমানদের অস্ত্র ছিল মাত্র তিনটি ঘোড়া, ৭০টি উট, ছয়টি বর্ম ও আটটি তলোয়ার। রসদ কম মনে হলেও বিজয়লাভের তাদের প্রধান উপকরণ ছিল ঈমানী শক্তি। রাসূলে আকরাম (সা.) তার সাহাবাদের জিহাদ সম্বন্ধে নসিহত ও উদ্দীপনামূলক ভাষণ প্রদান করলেন। এ মহাপরীক্ষায় সৃষ্টিকর্তার ওপর অবিচল বিশ্বাস রেখে ধৈর্য অবলম্বন করা এবং অবিচল থাকাই জয়লাভের একমাত্র ও প্রধান উপায়- এ বাণীই তিনি সাহাবিদের দিলেন।

যুদ্ধ শুরুর সময় নবী করিম (সা.) আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করেছিলেন, তার দোয়া কবুল করে মাবুদ ফেরেশতা পাঠিয়ে মুজাহিদদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সাহায্য করেছিলেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যখন তুমি মুমিনদের বলছিলে, এটা কি তোমাদের জন্য যথেষ্ট নয় যে, তোমাদের প্রতিপালক প্রেরিত তিন সহস্র ফেরেশতা দিয়ে তোমাদের সহায়তা করবেন?’ হ্যাঁ, নিশ্চয়ই যদি তোমরা ধৈর্যধারণ কর এবং সাবধান হয়ে চল, তবে তারা দ্রুতগতিতে তোমাদের ওপর আক্রমণ করলে আল্লাহ পাঁচ সহস্র ফেরেশতা দিয়ে তোমাদের সাহায্য করবেন।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত : ১২৪-১২৫)

প্রথমে মল্লযুদ্ধে মুসলিম বীরযোদ্ধাদের হাতে কাফের বাহিনী পরাজিত হয়। এরপর হক ও বাতিলের, আলো ও আঁধারের, বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীর উভয় বাহিনী পরস্পর যুদ্ধবাঁধে। দুই পক্ষের তুমুল যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী বীরবিক্রমে লড়াই করে ইসলামের বিজয় কেতন ছিনিয়ে আনেন। যুদ্ধ শুরুর সময় রাসূলে আকরাম (সা.) ইরশাদ করেছিলেন, ‘আজ যে ব্যক্তি কাফিরদের বিরুদ্ধে ধৈর্যের সঙ্গে সওয়াবের প্রত্যাশায় যুদ্ধ করবে, শহীদ হবে, আল্লাহ তাকে জান্নাত দান করবেন।’ (বায়হাকি)

হক ও বাতিলের লড়াইয়ে স্বল্পসংখ্যক মুসলমান জানবাজি রেখে কাফেরদের মোকাবিলায় জয়লাভ করেছিলেন। বদর যুদ্ধে ৭০ জন মুশরিক নিহত ও ৭০ জন বন্দি হয়। অন্যদিকে মাত্র ১৪ জন মুমিন বীর সেনানী শাহাদাতের অমীয় সুধা পানে অমর হন।

যেহেতু সেদিন কাফের-বেঈমানদের সঙ্গে ইসলামের পার্থক্য সূচিত হয়েছিল তাই এ দিবসকে ইয়াওমুল ফুরকানা বা সত্য-মিথ্যার পার্থক্যের দিন বলা হয়। আসুন আমরা পবিত্র রমজানের এই মহান বদর যুদ্ধের বিজয় শিক্ষা সর্বত্রই ছড়িয়ে দেই।

লেখক : এমফিল গবেষক, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×