হাফেজের জায়নামাজ অযোগ্যদের দখলে

  আমিনুল ইসলাম হুসাইনী ২৪ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

তারাবির অধিকাংশ হাফেজে কোরআনই তালিবুল ইলম। হাদিয়ার নাম করে আমরা যা দিই, তাতে তো তাদের পড়াশোনার খরচও হয় না। অথচ দেখুন, স্বার্থপরের মতো আমরা তাদের এসব নিয়ে তো ভাবিই না, উপরন্তু ফতোয়া দিয়ে বসে থাকি, ‘তারাবি পড়িয়ে হাদিয়া নেয়া না-জায়েজ’। যারা এ ফতোয়া দিচ্ছেন, তারা কি ভেবে দেখেছেন, ঠিক কোন কারণে না-জায়েজ বলছেন? একই কোরআন পড়িয়ে আপনি যদি ইমামতির হাদিয়া নিতে পারেন, তবে কেন হাফেজে কোরআনদের বেলায় না-জায়েজ হবে?

হাফেজে কোরআনরা তো শুধু কোরআনই শোনাচ্ছেন না, তারা তো বিশ রাকাত তারাবির ইমামতিও করছেন।

ভাবতেও লজ্জা হয় আমরা এমনই কোরআন প্রেমিক, কোথাও কেউ কোরআনকে অবমাননা করলে আমরা প্রতিবাদে জ্বলে উঠি। এ জ্বলে ওঠা যদি কোরআনের প্রেমেই হতো, তাহলে যারা কোরআনকে বুকে ধারণ করছেন, সংরক্ষণ করছেন, তাদের কেন হেয় করছি। তারাই তো কোরআনের প্রহরী, ঈমানের সীমান্ত রক্ষক। অথচ আমরা তাদের এ পৃষ্ঠপোষকতার বদলে তুচ্ছজ্ঞান করছি। মনে রাখবেন, আপনাদের দেয়া আঘাতে যদি তাদের বুকে সামান্য ব্যথারও উদ্রেক হয় তবে তা হবে লাওহে মাহফুজের সঙ্গে বেয়াদবির শামিল। কেন না কোরআন সে স্থানেই থাকে, যে স্থান লাওহে মাহফুজের মতো পবিত্র।

হ্যাঁ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন, ‘সামান্য অর্থের বিনিময়ে তোমরা কোরআনকে বিক্রি কর না’। কিন্তু এ বিক্রি শব্দে কী বুঝিয়েছেন সেটাই আমরা বুঝতে পারছি না। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ওই বিক্রির কথাই বলেছেন যেই বিক্রিতে কোরআনের হুকুমকে অমান্য করা হয়। এই যেমন আমাদের অনেক মৌলভীদের দেখা যায়, সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে তারা তালাক দেয়া স্বামী-স্ত্রীকে হিল্লা ছাড়াই মিলিয়ে দেন। আবার কেউ কেউ সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে অপরাধীর পক্ষ হয়ে মিথ্যা সাক্ষ্য দেন। এই যে সামান্য অর্থের লোভে কোরআনের বিধানকে অমান্য করা হল- এটাই কোরআন বিক্রি করা। নতুবা তিলাওয়াতের হাদিয়া যদি কোরআন বিক্রি করা হতো, তাহলে ইমাম সাহেবদের মাসিক ভাতা, মাদরাসার শিক্ষকদের বেতন, ওয়ায়েজেনদের সম্মানীসহ সবই কোরআন বিক্রির কাতারে পড়বে।

যে সব স্বঘোষিত মুফতিরা তারাবির হাদিয়াকে না-জায়েজ বলে থাকেন, তাদের জানা উচিত আল্লামা আশরাফ আলী থানবী (রহ.), আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.), আল্লামা গহরপুরী (রহ.)সহ প্রসিদ্ধ আলেমরা তারাবির হাদিয়াকে জায়েজ বলে গেছেন। আল্লামা থানবী (রহ.) বলেছেন, ‘মানুষ যদি কোরআনের মহব্বতে হাফেজে কোরআনের সম্মানার্থে হাদিয়া-তোহফা হিসেবে কিছু দেয়, তাহলে সেটা কেবল বৈধই না, বরং এমন হাদিয়াদাতারা আল্লাহর কাছে অনেক বেশি প্রতিদান পাবেন’।

আল্লামা গহরপুরী (রহ.) তারাবির হাফিজদের হাদিয়ার ব্যাপারে বলতেন, ‘হাফেজদের মন খুলে দান কর। আল্লাহ খুশি হবেন’। আর আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.) তো নিজেই পয়সা উঠিয়ে তারাবির হাফেজদের দিতেন। মান্যবর প্রায় সব আলেমই ছিলেন তারাবির হাদিয়ার পক্ষে। কারণ তারা হাদিসে পড়েছেন, ‘অবশ্যই আল্লাহর প্রতি সম্মান প্রদর্শন হল কোরআন সম্পর্কে বাড়াবাড়ি করে না এমন হাফেজকে মর্যাদা দান করা...’। (সুনানে আবি দাউদ : ৪৮৪৫)

তারাবির হাফেজদের যা দেয়া হয় তা হাদিয়া নামেই দেয়া হয়, আর হাদিয়া দেয়া-নেয়া নবীজির সুন্নাত। এ সুন্নাতের দলিল হিসেবে রয়েছে অসংখ্য হাদিস। এমনই একটি হাদিস হজরত আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসূল (সা.)-এর খিদমতে কোনো খাবার আনা হলে তিনি জানতে চাইতেন, এটা হাদিয়া, না সাদকা? যদি বলা হতো সাদকা। তা হলে সাহাবিদের তিনি বলতেন, তোমরা খাও। কিন্তু তিনি খেতেন না। আর যদি বলা হতো হাদিয়া। তাহলে তিনিও হাত বাড়াতেন এবং তাদের সঙ্গে খাওয়ায় শরিক হতেন। (বুখারি : ২৪০৬)

জানতে ইচ্ছা হয় যারা তারাবির হাদিয়া না-জায়েজ বলে বেড়াচ্ছেন, হাফেজে কোরআনরা তাদের কোনো বাড়া ভাতে ছাই ছিঁটিয়েছেন? তখন তারা কেন মুখে কুলুপ এঁটে থাকেন, যখন অধিকাংশ মসজিদ কমিটিই হাফেজে কোরআনদের নাম বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা কালেকশন করেন। অতপর সেই টাকার যৎসামান্য হাফেজদের দিয়ে বাকিটা নিজেরা আত্মসাৎ করেন। এ সব কমিটি আর মৌলভীদের কারণেই যোগ্য হাফেজরা উপযুক্ত জায়গায় তারাবি পড়াতে পারেন না। তারা তারাবির ইন্টারভিউয়ের আয়োজন করেন ঠিকই, কিন্তু ইন্টারভিউতে উত্তীর্ণ হাফেজদের নেয়া হয় না। তারা সে সব হাফেজদেরই নিয়ে থাকেন, যারা তাদের আত্মীয় বা উৎকোচ দিয়ে থাকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক হাফেজ জানান ‘প্রতি বছরই কসবা মান্দারপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে হাফেজ ওমর ফারুক তারাবির ইন্টারভিউ নেন। সেই ইন্টারভিউতে গ্রামের অন্যান্য মসজিদের জন্য আরও ১০ জন হাফেজ নিয়ে থাকেন। যাদের নেন তারা প্রত্যেকেই ওমর ফারুককে দুই হাজার করে টাকা দিয়ে থাকেন’। কোথাও কোথাও আবার ইমাম খতিবদের পাঞ্জাবি লুঙ্গি দেয়ার নজিরও রয়েছে। স্বজনপ্রীতির অভিযোগ করেছেন হাফেজ হাসান আল মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘গত দু’বছর এক নামকরা মিল্ক ফ্যাক্টরি জামে মসজিদে নামাজ পড়িয়ে ছিলাম। এবার ওই কোম্পানির এক উচ্চপদস্থ লোকের আত্মীয় তারাবি পড়াবেন বলে আমাকে না করে দিয়েছেন’।

এভাবেই কমিটি আর ইমামদের স্বজনপ্রীতির আড়ালে পড়ে যান ভালো হাফেজরা। অযোগ্যরা দখল করে বসে পবিত্র জায়নামাজ। ফলে তারাবিতে মুসল্লিদের শুনতে হয় অসম্পূর্ণ তিলাওয়াত। অতএব, মসজিদের এ সব দুর্নীতি বন্ধ হওয়া জরুরি।

লেখক : প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×