একদিন মাদ্রাসা পড়ুয়ারা বাংলা সাহিত্যের নেতৃত্ব দেবেন

প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আসিফ আসলাম

‘বাংলা ভাষাকে অন্তরের মমতা দিয়ে গ্রহণ করুন এবং মেধা ও প্রতিভা দিয়ে বাংলা সাহিত্য চর্চা করুন। কে বলেছে এটা অস্পৃশ্য ভাষা? কে বলেছে এটা হিন্দুদের ভাষা?

বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চায় পুণ্য নেই, পুণ্য শুধু আরবিতে, উর্দুতে কোথায় পেয়েছেন এ ফতোয়া? এ ভ্রান্ত ও আত্মঘাতী ধারণা বর্জন করুন, এটা অজ্ঞতা, এটা মূর্খতা এবং আগামী দিনের জন্য এর পরিণতি ভয়াবহ।

সাহিত্যের অঙ্গনে আপনাদের শ্রেষ্ঠত্বের আসন গ্রহণ করতে হবে। আপনাদের হতে হবে আলোড়ন সৃষ্টিকারী লেখক-সাহিত্যিক ও বাগ্মী বক্তা, বাংলাভাষা ও সাহিত্যের প্রতি উদাসীনতা প্রদর্শন কিংবা বিমাতাসুলভ আচরণ এ দেশের আলেম সমাজের জন্য জাতীয় আত্মহত্যারই নামান্তর।

১৯৮৪ সালের ১৪ মার্চ কিশোরগঞ্জের জামিয়া ইমদাদিয়া প্রাঙ্গণে বিশিষ্ট আলেম, ইসলামী বৃদ্ধিজীবী ছাত্র-শিক্ষক সম্মেলনে এই দরদমাখা কথাগুলো বলেছিলেন আকাবিরে উম্মাহর সর্বজনস্বীকৃত মুখপাত্র সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.। একজন ভীনদেশি উর্দু সাহিত্যিক হয়েও উম্মাহর দরদে তাকে এ কথা বলতে হয়েছিল।

কারণ তিনি শুরু থেকেই মাতৃভাষা চর্চার ব্যাপারে আলেমদের অনাদর ও আনাসক্তি লক্ষ্য করেছিলেন। মাদ্রাসা পড়ুয়া অধিকাংশ আলেম ওলামার মাতৃভাষা চর্চার প্রতি অবহেলা এখনও তেমনটাই রয়ে গেছে।

এখনও অনেকে মনে করেন, বাংলা ভাষা হিন্দুদের ভাষা, বাংলা ভাষা নাস্তিকদের ভাষা। বাংলা চর্চায় ক্ষতি ছাড়া কোনো উপকার নেই।

এই ভ্রান্ত ধারণা বর্জন করে মাওলানা আবু তাহের মেসবাহ, মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ, মাওলানা যাইনুল আবিদিনের মতো হাতেগোনা ক’জন কওমি ওলামা ছাড়া অন্য কোনো আলেমই বাংলাসাহিত্যের অঙ্গনে ভূমিকা রাখতে পারেননি।

মাদ্রাসায় বাংলাসাহিত্য চর্চা বিষয়ে বেশ ক’জন ছাত্র-শিক্ষকের সঙ্গে কথা হয়। কিছুটা ইতিবাচক তথ্য জানা যায়।

ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি প্রতিষ্ঠান জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার শিক্ষার্থী মুহাম্মদ তাওহীদুল ইসলাম জানান, বাংলাসাহিত্য চর্চায় এতকাল পিছিয়ে থাকলেও গত দশকে রাজধানীর কওমি মাদ্রাসাগুলোতে সাহিত্য চর্চা বড়েছে।

বেশকিছু মাদ্রাসা থেকে দেয়াল পত্রিকা ও সাহিত্য কাগজ বের হচ্ছে। তবে রাজধানীর কিছু মাদ্রাসা ও মফস্বলের মাদ্রাসা এবং আলিয়া মাদ্রাসাগুলো এ বিষয়ে গুরুত্ব না দেয়ায় এখনও দেয়াল পত্রিকাও কাগজশূন্য রয়েছে।

প্রতিটি মাদ্রাসাতেই কিছু কিছু প্রতিভাবান শিক্ষার্থী রয়েছে, যারা কর্তৃপক্ষের সহায়তা পেলে অনেকদূর এগুতে পারবে।

ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থী সাজিদ আনাম (ছমনাম) বলেন, ‘মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সাহিত্য চর্চার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় সাহিত্যপ্রেমীরা নিজ উদ্যোগেই সাহিত্যচর্চা করেন।

তবে এদের অধিকাংশই একপেশে চিন্তা ভঙ্গি ও ধর্মীয় একগুঁয়েমির কারণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মানিক বন্দ্যোপ্যাধ্যায়সহ অন্য কোনো শক্তিমান সাহিত্যিকের লেখা পড়ে না। যার ফলে মাদ্রাসাগুলো থেকে যে দেয়ালপত্রিকা ও সাহিত্য কাগজ বের হয় তার অধিকাংশেরই সাহিত্যমান খুব শোচনীয়’।

তামিরুর মিল্লাত ক্যাডেট মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা আমিরুল ইসলাম (ছমনাম) বলেন, ‘প্রতিটি মাদ্রাসার দায়িত্বশীলরা এ বিষয়টিতে গুরুত্ব দিলে হয়তো আমরা সামনে এমন দিন দেখতে পাব যেদিন মাদ্রাসাপড়ুয়ারা বাংলাসাহিত্যের অঙ্গনে নেতৃত্ব দিবে।’

রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য মাদ্রাসাতেও মাতৃভাষা চর্চা শুরু হোক, তাদের গ্রন্থাগারগুলো শক্তিমান সাহিত্যিকদের লিখিত বইয়ের মাধ্যমে সমৃদ্ধ হোক। যেন মাদ্রাসাপড়ুয়া প্রতিটি

ওলামা লেখনীর ময়দানে ক্ষুরধার লেখক ও বক্তৃতার ময়দানে আলোড়ন সৃষ্টিকারী বাগ্মী বক্তা হয়ে উঠতে পারেন। ভাষা কোনো ধর্মের না, কোনো দলের ও মতবাদের না, হিন্দু-মুসলমানের না, অস্তিক বা নাস্তিকের না, ভাষা মাটির গড়া মানুষের। ভাষা আল্লাহর দান। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, তিনি (আল্লাহ) মানুষকে ভাষাজ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন। সূরা আর রহমান

আমি প্রতিটি রাসূলকে তার কওমের ভাষাজ্ঞান দিয়ে প্রেরণ করেছি যাতে তিনি তাদের উদ্দেশে বয়ান করতে পারেন। অনন্তর তিনি যাকে ইচ্ছা গোমরাহ করেন, যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করেন।

আর তিনিই মহাপ্রতাপশালী, মহাপ্রজ্ঞাময়। সূরা ইবরাহীম। মাতৃভাষা চর্চায় গুরুত্ব দেয়া আলেম সমাজের দায়িত্ব, এ বিষয়টির ব্যাপারে তাদের এগিয়ে আসতে হবে।

তারা জাতির পথপ্রদর্শক নিজেদের গণ্ডির বাইরের জগৎটা নিয়ে তাদের ভাবতে হবে, ভাবতে হবে জাতির কথা, লেখনী ও বক্তৃতার মাধ্যমে জাতির মনের মধ্যে জায়গা করে নিতে হবে। আর এর জন্য বিশুদ্ধ ভাষা ও সাহিত্য চর্চা অপরিহার্য।

লেখক : প্রাবন্ধিক