গাছতলা থেকে দশতলার ঈদ

  আল ফাতাহ মামুন ৩১ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গাছতলা থেকে দশতলার ঈদ

কাঠফাটা রোদে একদল শিশু খেলছে। মাত্রই কাজ থেকে ফিরেছেন ইউসুফ আলী। তিনি একজন রিকশাচালক। বললাম, ভাই! একটু সময় হবে, দু’চার মিনিটি কথা বলব। মুখে হাসি ছড়িয়ে বলল, অবশ্যই! বলেন স্যার।

কেমন আছেন? গরিবের আর থাকা।

এ সময়ই দৌড়ে এল দুটি শিশু। কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে গলায় ধরে জানতে চাইল, ‘আব্বু! আমাদের নতুন জামা এনেছ?’ মুখের ছাড়ানো হাসি এবার উবে গেল রিকশাওয়ালার। অপরাধী মুখে বললেন, ‘আম্মু! খেলতে যাও। আমি এই আঙ্কেলের সঙ্গে একটু কথা বলি।’

রিকশাচালক ইউসুফ আলী বললেন, ‘রোজার শুরু থেকেই ছেলে-মেয়ে নতুন জামার জন্য বায়না ধরেছে। মাথায় কিস্তির বোঝা। তারপরও বলেছি, কিনে দেব। সে থেকেই কাজে যাওয়ার সময় আর কাজ থেকে ফিরলে ওদের প্রশ্ন- ‘নতুন জামা আনছো আব্বু।’

জানতে চাইলাম ঈদ কীভাবে উৎযাপন করেন। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ইউসুফ আলী বললেন, প্রতি বছরই চানরাতে ছেলে-মেয়ের জন্য জামাকাপড় কিনি। স্ত্রীর জন্য কোনো বছর কিনি, কোনো বছর কিনতে পারি না। ঈদের দিন ধোয়া কাপড় পরি। আতর লাগিয়ে টুপি মাথায় নামাজ পড়তে যাই। নামাজ শেষে সবার সঙ্গে কোলাকুলি করে বাসায় ফিরি। বাসায় ঈদের সেমাই রান্না হয়। মনভরে ছেলেমেয়ের আনন্দ দেখি। এটাই আমাদের ঈদ।

রিকশাচালক ইউসুফ আলীকে ভেবেই হয়তো নজরুল লিখেছিলেন-

‘সাজিমাটি দিয়ে ধুয়েছে ছিন্ন-বস্ত্র মা রাত জেগে,/ ভিজেছে পিরান কাতর চোখের অশ্রু-আতর লেগে।

ছেলেরা হাসিছে, আনন্দ ফোটে ছিন্ন জামার ফাঁকে/চোখ মুছে বাবা ঈদগাহে যেতে দাঁড়ায়ে পথের বাঁকে।’

গেণ্ডারিয়া বস্তির ঈদের গল্প বললাম। ঈদ আসে বস্তিতেও। রিকশা চালকের মনে ঈদের চাঁদ হাসে। ঈদ আসে এ দেশের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতেও। জীবনের নির্মমতা যারা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করে তাদেরও ঈদ আসে। সমাজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে মাস শেষে ধার-দেনা করা মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর কষ্ট কেউ দেখে, কেউ দেখে না।

‘পরিবারের ঈদ কেনাকাটা, এই বখশিশ সেই বখশিশ আরও কত কী- এসব দেখে একটা প্রশ্নই মনে জাগে, কেন ঈদের চাঁদ ওঠে। খেয়ে না খেয়ে দিনগুলো তো কেটেই যাচ্ছিল। ঈদ এসে বাড়তি খরচের ঝামেলায় কেন ফেলে মধ্যবিত্তকে’- বলছিলেন জুরাইন খন্দকার রোড ভাই ভাই ফার্মেসির মালিক মোমিন আলী বেপারী। অনেকটা সংকোচের সঙ্গেই বললেন, ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো যাচ্ছে না। কাঁধে বিশাল ঋণের বোঝা। গত বছরও পরিবারের কেউ ঈদের কেনাকাটা করেনি। এবারও করতে পারব বলে মনে হয় না। এসব কথা বলা যায় না। ঈদের দিন ভালো কাপড় পরে নামাজে যাই। ভালো-মন্দ খাওয়ার আয়োজন করি। আত্মীয়-স্বজনরা আসে। অল্প সময়ের জন্য হলেও সব ভুলে আনন্দে হারিয়ে যাই।

এবার শুনুন ভিন্ন গল্প। ‘ঈদের কেনাকাটা রোজার আগেই সেরে ফেলি। রোজায় খুব ব্যস্ত থাকতে হয়। মেয়ে তেমন কোনো বায়না করে না। তবে ছেলেটা নতুন নতুন খেলনার জন্য বায়না ধরে। সুযোগ হলেই দেশের বাইরে ঘুরে আসি।’ ঈদ প্রস্তুতির কথা বলছিলেন পপুলার মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক শাহীন লিপিকা কাইউম। স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই দেশসেরা চিকিৎসক। বললেন, ‘আমরা চেষ্টা করি, ঈদের আনন্দ সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে। পরিচিত-অপরিচিত যারাই আসে, আমার ঘরের মতো তাদের ঘরেও ঈদের খুশি ছড়িয়ে পড়ুক সে চেষ্টা করি। দেশের সব বিত্তবান যদি এগিয়ে আসত, তবে ধনী-গরিব যেমন একসঙ্গে রোজা রেখেছে, ক্ষুধার কষ্ট অনুভব করেছে, তেমনি ঈদের খুশিও সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ত।’

কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘রোজার শেষে তোমরা সবাই এক আল্লাহর মহিমা ঘোষণা কর। আর শোকরগোজার বান্দা হও।’ (সূরা বাকারা, আয়াত : ১৮৫।) খোদার হুকুমে সবাই রোজা রেখেছে, তাহলে কেন সবার ঘরে ঈদ আসে না। খোদার মহিমা কেন এক সুরে এক কণ্ঠে সব বনি আদম গাইতে পারে না। কেন একশ্রেণী মনে করে, ঈদ না এলেই ভালো হতো। পরের করুণার দিকে চেয়ে থাকে আরেক শ্রেণী। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে ঈদের অভিনয় করে তারা। ঈদের কবিতায় নজরুল বড় সুন্দর করে বলেছেন, ‘আলো ও বৃষ্টি তাহার দান/সব ঘরে ঝরে এক সমান।’ ঈদও তো খোদারই দান, তাহলে কেন সবার ঘরে সবার মনে সমান ঈদের খুশির বৃষ্টি ঝরে না। নবীজি (সা.)-এর সময় সবার ঘরেই খুশির বৃষ্টি ঝরত। রোজা শেষে সবাই একসঙ্গে ঈদ করত। হায়! কবে আমরা উদযাপন করব সেরকম ঈদ।

‘ছিনিয়ে আনিবে আসমান থেকে ঈদের চাঁদের হাসি/ ফুরাবে না কভু যে হাসি জীবনে, কখনো হবে না বাসি।

সমাধির মাঝে গণিতেছি দিন, আসিবেন তিনি কবে?/ রোজা এফতার করিব সকলে, সেই দিন ঈদ হবে।’

-কাজী নজরুল ইসলাম।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Email : [email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×