হাফেজদের কষ্টের কথা

  হাফেজ শাহ শরীফ ৩১ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শেষ হচ্ছে খতমে তারাবি। ২৭ রমজান তারাবির নামাজে কোরআন খতম করা হয়। পুরো মাস হাফেজরা কোরআনের ঐশী বাণী তেলাওয়াত করে মুসল্লিদের হৃদয় ভরিয়েছেন। কোরআন খতমের দিনটি সব মুসল্লির জন্য আনন্দের। হাফেজদের অনুভূতি থাকে ভিন্ন রকম। থাকে কোরআন খতমের পর বাড়ি ফেরার অপেক্ষা। শুরু হয় আরেকটি বছরের দিনগোনা। আবার কবে আসবে রমজান। তারাবি পড়াব কবে? হাফেজরা ২৭ দিন মসজিদে থেকেছেন হয়েছে মহল্লার মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক। বেড়েছে মসজিদের প্রতি মায়া। ভাবনায় থাকে আগামী রমজানে আবার দেখা হবে কি? কেউ কেউ আসবেন একই মসজিদে, কেউ যাবেন অন্য কোনো মসজিদে তারাবির খোঁজে। তারাবি শেষে হাফেজদের বিদায় বেলায় চোখের জলে বুক ভাসে। এই অনুভূতি শুধু হাফেজরাই বুঝতে পারেন। মুসল্লিরা কত সহজে তাদের বিদায় দেয়। যারা মাসজুড়ে পরিশ্রম করে কোরআনকে শুনিয়েছেন, বাড়িঘর ছেড়ে মুসাফির এসে অনেক কষ্টে তারাবি পড়িয়েছেন। আমরা তাদের এক বছরের জন্য একদম ভুলে যাই। রমজান এলেই তাদের খোঁজাখুঁজি করি। কোরআনের আরবি লেখাকে আমরা যতটা সম্মান করি এটাকে যারা হৃদয়ে ধারণ করেছেন তাদের ততটা সম্মান করতে পারি না। সাধারণ মানুষ মনে করেন এক খতম কোরআন শোনানোর বিনিময়ে ১০/১৫ হাজার টাকা দিলেই হল। এক শ্রেণীর আলেম বলেন, খতমে তারাবি পড়িয়ে বিনিময় নেয়া জায়েজ নেই। আধুনিক এই সময়ে এসব বলা কি যুক্তিযুক্ত! হাফেজরা মাদ্রাসা-মক্তবের চাকরি করে ৬-৭ হাজার টাকা মাসিক মাইনে পেয়ে কীভাবে জীবন বাঁচায় তাকি আমরা কখনও ভেবে দেখেছি? আল্লাহ যাদের কোরআন সংরক্ষণের দায়িত্ব দিয়েছেন তারা আজ অবহেলিত জীবনযাপন করছেন সমাজে। তাদের জন্য মুসল্লি এবং সরকার কী ভাবতে পারে না! দু’জন হাফেজের দুঃখের কথা তুলে ধরা হল আজকের লেখায়- হাফেজ শরীফ বিন আয়াতুল্লাহ। ফরিদাবাদ মাদ্রাসার মেশকাত জামাতের ছাত্র। চার বছর ধরে তারাবি পড়াচ্ছেন বারিধারা বাইতুল আতিক কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে। জানতে চেয়েছিলাম তারাবির হাদিয়া নিয়ে। তিনি বলেন, কোরআনের বিনিময় দেয়া বা নেয়া কারও পক্ষে সম্ভব নয়। এর বিনিময় একমাত্র আল্লাহই দিতে পারবেন। তারাবির হাদিয়া যা দেয়া হয় তা আমরা কোরআনের বিনিময় হিসেবে গ্রহণ করি না। যদি কোরআনের বিনিময় মনে করতাম তাহলে চুক্তি করে তারাবি পড়াতাম। গুলশান, বারিধারা, বনানী এমন আভিজাত্য এলাকায় হাফেজরা যদি বলেন, তারাবির বিনিময়ে ১০ লাখ টাকা দিতে হবে। এমন সামর্থ্য এলাকার মুসল্লিদের রয়েছে। যেহেতু চুক্তিবদ্ধ হয়ে কোনো হাফেজ তারাবি পড়ান না। তাই মানুষ খুশি হয়ে যতটুকু হাদিয়া দেন তা নিয়েই একজন হাফেজ খুশি থাকেন। এতেই তার পড়ালেখার খরচ বহন হয় বছরের। মুসল্লিদের উচিত সারা বছর হাফেজদের খোঁজ-খবর রাখা। একজন হাফেজ যেন সারা বছর ভালো থাকেন সেই ব্যবস্থা করে দেয়া। তাহলেই হাফেজদের যথাযথ খেদমত করা হবে।

হাফেজ রিফাত হোসাইন। তারাবি পড়াচ্ছেন গাজীপুর কাপাসিয়া থানার একডালা জামে মসজিদে। জানতে চেয়েছিলাম পরিবারের খরচ কীভাবে চালান? তিনি বলেন, আমাদের চার ভাই-বোনের মাঝে আমি মেঝো। বাবা সেনাবাহিনীর চাকরি করতেন। ২০০৭ সালে মারা যান। বাবার পেনশনের কিছু টাকা রেখে গেছেন। তার থেকে মা আমাদের পড়ালেখা ও পরিবারের খরচ চালান। তারাবির হাদিয়া দিয়ে কি করেন জানতে চাইলে মুচকি হেসে বলেন, গত বছর তারাবি থেকে নয় হাজার টাকা পেয়েছিলাম। মাদ্রাসায় ভর্তি এবং কিতাব কেনার পেছনে সব টাকা খরচ হয়েছে। সারা বছর পড়ালেখার খরচ চালাতে খুব কষ্ট হচ্ছে। তিনি দুঃখ করে বলেন, মানুষ কোরআনকে ভালোবাসে কিন্তু কোরআনের হাফেজদের খবর রাখে না। নাচ-গানের জন্য হাজার হাজার টাকা খরচ করে কিন্তু কোরআনের হাফেজদের হাদিয়া দিতে চায় না। রমজানে হাফেজরা যদি তারাবি থেকে বেশি হাদিয়া পেতেন তাহলে তাদের সারা বছরের পড়ালেখার খরচ চলে যেত। আফসোসের বিষয় হচ্ছে, তারাবির হাদিয়ার নামে মুসল্লিদের থেকে হাফেজদের নামে লাখ টাকা নিয়ে দশ ভাগ হয়ে যায়। মসজিদের বিভিন্ন খাতে ব্যয় হয়। হাফেজরা হাদিয়ার সামান্যই পায়। এ অবস্থায় কিভাবে ফতুয়া দিচ্ছি তারাবির হাদিয়া নেয়া হারাম? কোরআনের মহব্বতে হাফেজদের দেয়া হাদিয়া না-জায়েজ বলা কোনোভাবেই ঠিক নয়। আজকের সমাজে টাকার বিনিময়ে কোরআনে বর্ণিত কেসাসের হুকুম পাল্টে যাচ্ছে। তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী হিল্লার মাধ্যমে বৈধ হয়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো মৌলভি চুক্তি করে ১ ঘণ্টা বয়ান করে পঞ্চাশ হাজার টাকা পকেটে ভরছেন। তাহলে হাফেজদের বেলায় সব দোষ নন্দঘোষ কেন? তারা তো কারও কোনো ক্ষতি করছেন না।

লেখক : প্রাবন্ধিক

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×