চাঁদ দেখা বিতর্ক যুগে যুগে

  মঈন চিশতী ১৪ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘ওয়াল ক্বামারি ইজা তালাহহা’ আল্লাহ বলেন, ‘শপথ চাঁদের যখন তা সূর্যের পশ্চাতে আসে’ সূর্য অস্তমিত হওয়ার পরে যে চাঁদ আসে, তা দামি বলেই আল্লাহ এর শপথ নিয়েছেন। সেই দামি চাঁদকে নিয়ে যুগযুগ ধরে বিতর্ক তৈরি করে রেখেছি। বিশেষ করে আমাদের ধর্মীয় উৎসব পর্বাদি সামনে এলে। এবার এই বিতর্ক আমাদের বিশ্বাসের জায়গাকে একেবারে খেলো করে দিয়েছে। এই বিতর্ক শুরু হয়েছিল শবেবরাতের পর্ব থেকেই। আমরা চাঁদ দেখার ব্যাপারে আরবের অনুসরণ না করলেও অনু অনুসরণ করি অর্থাৎ যেখানে যেদিন চাঁদ উদিত হয় তার একদিন পর আমরা উদয়ের হিসাব করি। কিন্তু এবার শাবানের চাঁদের গণনা দুই দিন পর থেকে হিসাব করে ২১ এপ্রিল দিবাগত রাতে শবেবরাত পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিবাদ হলে সরকার একটি রিভিউ কমিটি করে একজন আলেমের নেতৃত্বে। কিন্তু যারা শাবানের চাঁদ একদিন আগে দেখেছে বলে দাবি করেছে তাদের সাক্ষী আমলে না নিয়ে আগের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। শবেবরাত একটি নফল এবাদত এ নিয়ে জনগণ আর মাথা ঘামায়নি। কিন্তু ঈদের হুকুম ভিন্ন। ঈদের দিন রোজা রাখা হারাম। তাই সন্ধ্যা রাতের ঘোষণায় প্রবল প্রতিবাদ হল, সোশ্যাল মিডিয়ায়। শিশু-কিশোরদের ঈদ আনন্দে উন্মুখ হওয়া আমাদের ঈদ উৎসবের কাছাকাছি নিয়ে আসে। বর্তমান গ্লোবালাইজেশনের যুগে হাজার মাইল দূরও অতি কাছে। সবার হাতে স্মার্টফোন অনেকের পিতা-মাতা বা নিকটাত্মীয় উমরার সফরে মক্কা মদিনায় ছিলেন। তারা গ্রিনিচ টাইমে তিন ঘণ্টা পিছিয়ে থাকায় চাঁদ আমরা না দেখলেও তারা দেখে। ফলে তারা চাঁদ সংশ্লিষ্ট আমলগুলো আগে করে। কিন্তু সূর্য সংশ্লিষ্ট আমলগুলো আমরা আগে করি। সঙ্গত কারণেই তারা ঈদ আগে করে। বাড়িতে সন্তানাদি এবং নিকটাত্মীয়কে ঈদের শুভেচ্ছা জানায়।

এবার চাঁদ দেখা বিতর্ক নিয়ে উমরা সফররত বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব এবং রেডিও টিভির জনপ্রিয় ইসলামী উপস্থাপক খালিদ সাইফুল্লাহ বকশীর ভাবনা- ‘বঙ্গদেশের পূর্ব দিকে চায়না ও পশ্চিমে পাকিস্তান চাঁদ দেখে আগের দিন। আর বাংলাদেশ দেখে পরের দিন। ব্যাপারটা তাহলে কী হল? একটা উদাহরণ দিলে ক্লিয়ার হবে।

ধরি একটা সোনালি রঙের বাস ফার্মগেট থেকে রওনা করল গুলিস্তান যাবে। ফার্মগেটের লোকজন সোনালি রঙের বাসটিকে দেখল। কারওয়ানবাজারের লোকও দেখল। শাহবাগ এলাকার লোকেরাও দেখল। শুধু বাংলামোটর এলাকার লোক দেখতে পেল না। তার অর্থ কি এই যে বাসটি বাংলামোটর এলাকার ওপর দিয়েই যায়নি। বাসটি সোজা পথেই চলেছিল। দোষ কার বাসটির নাকি এলাকার লোকের? আমার জানামতে চাঁদ দেখা কমিটির বেশিরভাগ লোকই চশমা ছাড়া পেপার পড়তে পারেন না। তাদের সারা দেশের কমিটির অবস্থাও তাই।

আরে ভাই চাঁদ থাকে মেঘের আড়ালে। মেঘের ওপর উঠা কোনো কঠিন কাজ নয়। একটা হেলিকপ্টার নিলেই তো হয়। তা নেবে না কারণ নবীজির আমলে তো আবার হেলিকপ্টার ছিল না।

জ্বর হলে প্যারাসিটামল ঠিকই খায়। যদিও ওই আমলে প্যারাসিটামল ছিল না। আর সেগুলোর কিসের দরকার? পৃথিবীর কোন অঞ্চলের কোন জায়গায় চাঁদ ও সূর্য কতটা মিনিট কত সেকেন্ডে অবস্থান করে তা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। অবাক হতে হয় যখন দেখি কিছু চোখওয়ালা মানুষ কিছু বিজ্ঞানবিমুখ মান্ধাতা আমলের সেকেলে চিন্তাধারার বনি আদমের অন্ধ অন্সুরণ করছে।

এসব বিষয় নিয়ে ২০১৮ সালের প্রথম রমজানে যমুনা টিভির লাইভ (রোজার দিনে) অনুষ্ঠানে আমরা বহুমুখী তথ্য তুলে ধরেছি। আমার উপস্থাপনায় ড. শমশের আলী ও ঢাবি শিক্ষক ড. যুবায়ের মোহাম্মদ এহসানুল হক বিষয়গুলো ক্লিয়ার করেছেন। আমি এ মুহূর্তে মক্কায়। আমার দেশ থেকে মাত্র ৩ ঘণ্টা আগে। আমি ঈদের নামাজ পড়েছি ১২ ঘণ্টা আগে। আমার বাচ্চারা ঈদের হাসি হাসবে আরও ৩৬ ঘণ্টা পর। কী বলব? ভাষা নেই।

মক্কা থেকে খালিদ সাইফুল্লাহ বকসী : চাঁদ দেখা কমিটির লোকেরা আমলানির্ভর হয়ে থাকে। তাদের নিজস্ব কোনো সোর্স থাকে না। থানার দারোগা পুলিশের সোর্স আছে, তাদের বাজেট আছে কিন্তু চাঁদ দেখা কমিটির লোকেরা আসরের পর থেকে সভাকক্ষে হাজির হয়ে শীতল ঘরে বসে থাকেন। নিজেরা চাঁদ দেখতে চেষ্টা করেন না। এমনকি জনগণ মেসেজ পাঠালে বা ফোন দিলে সংশ্লিষ্ট জেলার ডিসির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। তাদের উচিত নিজেদের বিশ্বস্ত সোর্স রাখা। জনগণ কেন গাঁটের পয়সা খরচ করে ফোন দিতে যাবে? ফোনগুলো কি টোল ফ্রি? বহুজাতিক বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পণ্যের মোড়কে পণ্যের অভিযোগ মতামতের জন্য টোল ফ্রি নাম্বার দেয় আর আমাদের চাঁদ দেখা কমিটি তা দিতে পারে না।

ঈদ নিয়ে বিশ্ব ভাবনা : ঈদ উৎসবের দিন হলেও এর সঙ্গে আল্লাহর হুকুম এবং ইবাদত জড়িত। ঈদের দিন রোজা রাখা হারাম এবং ঈদের নামাজের আগে যে কোনো নফল নামাজ নিষিদ্ধ। সুতরাং এ বিষয়টি আমলে নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারি মক্কার আকাশে চাঁদ দেখা গেলে বিশ্বের এক গোলার্ধের মানুষ ঈদ করবে, যেখানে দিনের প্রভাব বেশি থাকে তারা ঈদ করবে সাক্ষ্য সাপেক্ষে। কারণ মক্কার জমিন পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত এবং বাইতুল্লাহ দুনিয়ার প্রথম ঘর যা বরকতময় এবং সমগ্র আলমের হেদায়েতের জন্য আল্লাহ তৈরি করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘ইন্না আউয়ালা বাইতিন। নিশ্চয়ই সর্বপ্রথম ঘর, উদ্বিয়া লিন্নাসি, যা মানুষের জন্য নির্ধারিত হয়েছে, লাল্লাজি বিবাক্কাতা মোবারাকান। সেটা হচ্ছে এই বরকতময় ঘর যা মক্কায় অবস্থিত। ওয়া হুদাল্লিল আলামিন। আর তা সমগ্র জগতের হেদায়েত স্বরূপ’।

বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য চাঁদ দেখার বিষয়টি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন চাঁদ দেখা এবং সে মোতাবেক হিজরি মাস গণনা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির ওপর দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। কমিটি প্রতি বছর রমজানের চাঁদ আরব বিশ্বসহ প্রায় সব দেশের এক দিন পরে দেখতে পায়। কিন্তু এবারে চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক শাবানের চাঁদ দেখা গেছে দুই দিন পর। সে হিসেবে বাংলাদেশের মুসলমানরা আরব বিশ্বসহ অন্যান্য দেশের মুসলমানের চেয়ে দুই দিন পর শবেবরাত উদযাপন করেছে। শাবানের হিসাবে আরব বিশ্বসহ অন্যান্য দেশের দুই দিন পর বাংলাদেশে রোজার মাস শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক বাংলাদেশে অন্যান্য দেশের এক দিন পর রমজানের চাঁদ দেখার ঘোষণা আসে। যা এই দেশের গতানুগতিক ঐতিহ্য বলে ধরে নেয়া যায়। কিন্তু তার পরও প্রশ্ন থাকে, আরব বিশ্বসহ প্রায় সব মুসলিম রাষ্ট্রে এক দিনে চাঁদ দেখলে বাংলাদেশ কেন পরদিন দেখবে? পৃথিবী একটি, চাঁদও একটি। [চলবে]

লেখক : ধর্মচিন্তক সুফি ও গবেষক

Email : [email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×