জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে

নারী মুসল্লিদের সুখ-দুঃখ

  শাহীন আরা ইয়াসমিন ১৪ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম। বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয় এখানে। এ মসজিদের ভেতরের সমস্যাগুলো জানা ছিল না। যদিও মাঝে মধ্যে মহিলাদের ওখানে নামাজ পড়তে যেতাম। নামাজ শেষ হলে চলে আসতাম।

গত বছর থেকে সেখানে খতম তারাবি পড়া শুরু করি। রোজার শেষ পর্যন্ত খতম তারাবি পড়ি এবং পাশাপাশি কিয়ামুল লাইল নামাজ পড়ারও সৌভাগ্য হয়। গত বছরের নামাজ মনকে স্পর্শ করার কারণে এ বছর রোজার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত খতম তারাবি ও কিয়ামুল লাইল নামাজ পড়েছি। মাসভর এ নামাজ পড়ার কারণে সেখানকার সুবিধা-অসুবিধাগুলো চোখে পড়ে। সমস্যাগুলো সমাধানের তাগিদ থেকেই এ লেখা।

গত বছরের বেশ কিছু সমস্যা এ বছর ধর্ম প্রতিমন্ত্রী সমাধানের উদ্যোগ নেন, যা প্রশংসার দাবিদার। তবে প্রশংসার প্রায় ৮০ ভাগ ভাগিদার হবেন আমাদের ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর স্ত্রী। তিনি এ বছর পুরো রোজাই বায়তুল মোকাররম মসজিদে কাটিয়েছেন। (শেষের দিকে ওমরাহ করতে যাওয়ার কারণে আসতে পারেননি) তার চোখে যে সমস্যাগুলো ধরা পড়ে তা মন্ত্রীর মাধ্যমে দ্রুত সমাধান করেছেন। আমি প্রতিমন্ত্রী ও তার স্ত্রীর দীর্ঘায়ু কামনা করি, যাতে ভবিষ্যতেও নারী মুসল্লিদের সেবা করার সুযোগ পান।

নারী মুসল্লিরা খুশি হয়েছেন মহিলাদের রুমে প্রয়োজনের তুলনায় কম এসি থাকায় প্রতিমন্ত্রীর স্ত্রী পর্যাপ্ত এসির ব্যবস্থা করেছেন। ইতেকাফের মহিলা মুসল্লিদের জন্য আরেকটি রুমের ব্যবস্থা করেছেন। অনেক মহিলা মুসল্লি দশ দিনের জন্য ইতেকাফে বসেছিলেন। তাদের গোসলের কোনো ব্যবস্থা গত বছর ছিল না। মহিলাদের এ কষ্ট দেখে দুঃখ পেয়েছিলাম। কিন্তু ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর স্ত্রী এ বছর গোসলের ব্যবস্থা করে দেয়ায় সাধুবাদ জানাই। তিনি নতুন যে কাজটি মুসল্লিদের জন্য করেছেন যা আমরা আশা করিনি, সেটা হচ্ছে তারাবির পরে ও সেহরিতে মুসল্লিদের খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। খাবারের মান ভালো ছিল। এতে করে ইতেকাফে থাকা মুসল্লিরা বাড়ি থেকে খাবার আনার ঝামেলামুক্ত হন। অনেকে হয়তো এ ঝামেলার জন্য ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ইতেকাফে বসতে পারতেন না। খাবার ও গোসলের সুবিধার জন্য অনেকের পক্ষেই এবার ইতেকাফে বসা সম্ভব হয়েছে।

গত বছর দেখেছি নারী মুসল্লিরা মসজিদের ভেতরে অর্থাৎ নামাজের রুমে বসে খেতেন। এ বছর ভেতরে খেতে নিষেধ করা হয়েছে। মসজিদের ভেতর নোংরা হয়। পরে কিয়ামুল লাইল ও ফজর নামাজ পড়ার পরিবেশ থাকে না। কিন্তু বাইরে খেতে গিয়ে যত্রতত্র যাতায়াতের পথে ও বারান্দায় বসে খেতে হয়েছে গাদাগাদি করে। বারান্দা অপরিষ্কার ও পর্যাপ্ত আলো ছিল না। যেহেতু আল্লাহ আমাদের নামাজের সময় পবিত্র কাপড় পরে নামাজ পড়ার বিধান দিয়েছেন তাই অপরিষ্কার জায়গায় বসে খেলে সেই কাপড়ে নামাজ পড়তে মন সায় দেয় না।

আমরা মুখে মুখে এ কথাটা প্রায়ই বলে থাকি, ‘ভালো হতে পয়সা লাগে না’। সেটা হচ্ছে সৎ ব্যবহার। খাদেমদের ব্যবহার। মনে হয়েছে যেন কোনো কয়েদিখানায় বন্দি নারী আমরা। কয়েদিখানায় কখনও থাকিনি, তবে নাটক সিনেমায় দেখেছি। জাতীয় মসজিদে নামাজের উসিলায় থাকতে গিয়ে এই অভিজ্ঞতাটা হয়েছে এবার। মসজিদের খাদেমদের আমরা শ্রদ্ধা করি। আল্লাহর ঘরের সেবা করা সম্মানের। কিন্তু সে পেশাটা পালনে তারা যদি সচেতন না হন তবে হিতে বিপরীত হয়। তাদের কড়া শাসনে নারী মুসল্লিরা ভয়ে তটস্থ ছিলেন। তাদের আচরণ উত্তম আখলাকের বরখেলাপ, যা একেবারেই কাম্য নয়।

ইতেকাফে যারা ছিলেন অধিকাংশই বয়স্ক। আমাদের মা-দাদির মতো। বার্ধক্যের কারণে তাদের আচরণে কিছু অসঙ্গতি থাকতে পারে। মুরব্বি হিসেবে সেবা করার মানসিকতা নিয়ে তাদের সঙ্গে আরও ভালো ব্যবহার আশা করেছিলাম।

রোজার ২০ থেকে ২৭ এই সাত দিন ইতেকাফ ছাড়াও রাতের কিয়ামুল লাইল নামাজ পড়ার জন্য খতম তারাবি পড়ে অনেক মুসল্লিই রাত যাপন করেছেন। অনেক মহিলাই অফিস করে সরাসরি মসজিদে এসেছেন। একেবারে ফজর পড়ে মসজিদেই একটু ঘুমিয়ে সকালে অফিস করেছেন। তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতে পারলে ভালো হতো। অনেকেই খাবারের ব্যবস্থা করতে না পেরে খেজুর খেয়েই রোজা রেখেছেন। ভেতরেই মানসম্মত খাবারের ব্যবস্থা করা যেত।

ফজরের পর সকাল সাতটা পর্যন্ত মসজিদের গেট খোলা থাকে। এরপর দশটা পর্যন্ত বন্ধ থাকে। ভোর ৭টায় একা অনেক মহিলাই বের হতে সাহস পান না, এ ছাড়া সারা রাত জেগে নামাজ পড়েন ও ফজর পড়ে ঘুমিয়ে পড়েন তারপর অফিসে যান। স্বভাবতই তিনি তখন ৮টা কিংবা সাড়ে ৮টার দিকে বের হন। কিন্তু মসজিদের গেট বন্ধ থাকার কারণে তাকে ১০টা পর্যন্ত বসে থাকতে হয়েছে। রোজা রেখে সারা রাত জেগে নামাজ পড়ে সকালে অফিস করা কিংবা বাসায় রান্না-বান্না করা মহিলাদের জন্য অনেক কষ্টদায়ক। আল্লাহকে খুশি করার জন্যই তারা কষ্টকে বরণ করে নেন।

একটি অনুরোধ করছি। কিয়ামুল লাইল নামাজগুলো যেহেতু কোরআন খতমের বিষয়টি থাকে ও হুজুররা অত্যন্ত সুরেলা তেলাওয়াত করে থাকেন সেই নামাজগুলো আলো-আঁধারিতে পড়লে হৃদয়কে স্পর্শ করে। যে পরিবেশটা গত রোজায় আমি পেয়েছিলাম ও সেই আকর্ষণে এ বছর পুরো রোজাই নামাজ পড়েছি। কিন্তু এবার আমাদের প্রতিমন্ত্রীর স্ত্রী লাইট জ্বালিয়ে রেখেছেন। অধিকাংশ মুসল্লিই দুঃখ প্রকাশ করেছেন নামাজের পরিবেশটা মনের মতো হয়নি বলে। মন্ত্রীর স্ত্রীর কাছে বিনীত অনুরোধ আগামীতে ধ্যানমগ্ন নামাজ পড়ার পরিবেশ তৈরি করা হোক। হুজুরদের প্রতিও অনুরোধ, তারা যেন তাড়াতাড়ি না করে ধীরস্থিরভাবে নামাজে কোরআন পড়েন যাতে আমাদের তারাবি ও কিয়ামুল লাইল পড়ার উদ্দেশ্য হাসিল হয়।

লেখক : সাংবাদিক

Email : [email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×