খোদার হুকুমে মানুষের কল্যাণ করছে কীটপতঙ্গ

  আমিনুল ইসলাম হুসাইনী ২১ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আল্লাহ

বৈচিত্র্যময় এ সৃষ্টি জগতের ক্ষুদ্র প্রাণী হিসেবে কীটপতঙ্গকেই বোঝানো হয়। যদিও আকারে এরা ক্ষুদ্র, কিন্তু মানুষের উপকারে এদের অবদান অনেক। এ কীটপতঙ্গরাই দিনরাত মানুষের সেবা করে যাচ্ছে রাব্বুল আলামিনের হুকুমের দাস হয়ে। হোক তা ক্ষুদ্র পিঁপড়া, মশা, মাছি, মৌমাছি বা অন্য কোনো পোকামাকড়। তাদের প্রত্যেকেরই রয়েছে অসামান্য অবদান।

তাই তো রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে বিশাল সাগর, পাহাড়ের বর্ণনা যেমন দিয়েছেন, তেমনি ক্ষুদ্র পিঁপড়া বা মশা-মাছিরও। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয় আল্লাহপাক মাছি কিংবা তার চেয়েও ছোট কোনো কিছুর উপমা দিতে লজ্জা করেন না।’ (সূরা বাকারা : ২৬)

এবার আসুন আমাদের পরিচিত কিছু কীটপতঙ্গের উপকারিতা সম্পর্কে জেনে নিই।

পিঁপড়া : ফর্মিসিডি গোত্রের সামাজিক একটি কীট বা পতঙ্গের নাম পিঁপড়া। ছয় পায়ে ভর করে হাঁটা পরিশ্রমী এ প্রাণীটি সাধারণত দুই থেকে পাঁচ মিলিগ্রাম ওজনের হয়ে থাকে। এ হিসেবে একটি পিঁপড়া একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের চেয়ে সোয়া এক কোটি গুণ ছোট। যদি এ কারণেই পিঁপড়াকে আপনি খুবই তুচ্ছ একটি প্রাণী ভাবেন, তাহলে তা হবে আপনার জন্য চরম বোকামি। কেন না এ ক্ষুদ্র প্রাণীটি তার শরীরের ওজনের চেয়েও বিশ গুণ বেশি ওজন বহন করতে পারে।

পিঁপড়ারা আকৃতিতে ক্ষুদ্র হলেও বয়সের বিচারে কিন্তু পৃথিবীর প্রাচীন। আর সংখ্যার বিচারে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কীট। পিঁপড়া গবেষকরা বলেন, পৃথিবীতে মানুষের তুলনায় পিঁপড়ার সংখ্যা দশ লাখ গুণ বেশি। শুধুই কি তাই? পৃথিবীতে যত পিঁপড়া আছে, তাদের জৈববস্তু (বায়োমাস) পৃথিবীতে বসবাসকারী সাতশ’ কোটি মানুষের সমান। বিস্মিত হলেও এটাই সত্য, ক্ষুদ্র এ প্রাণীটিও মানুষের মতোই সংঘবদ্ধ হয়ে বসবাস করে।

মানুষের মতো কথাও বলে। পিঁপড়ার কথা বলার প্রমাণে পবিত্র কোরআনেও বলা হয়েছে, ‘যখন সুলাইমান (আ.) এবং তার বাহিনী পিঁপড়ার উপত্যকায় পৌঁছল তখন একটি নারী পিঁপড়া বলল, হে পিঁপড়ারা! তোমাদের গর্তে প্রবেশ কর। এমন যেন না হয়, সুলাইমান এবং তার সৈন্যরা তোমাদের পিষে ফেলবে তোমরা তা টেরও পাবে না। সুলাইমান তার কথায় মৃদু হাসলেন।’ (সূরা নামল : ১৮)

মানুষের ধারণা পিঁপড়া শুধু ক্ষতিই করে থাকে। কিন্তু তারা এটা জানে না, পরিশ্রমী এ পতঙ্গটি মানুষের উপকারী বন্ধুও বটে। চীনের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, বায়ু ও জলপ্রবাহ এবং জৈব পদার্থ বাড়ানোর মাধ্যমে মাটির উপকারিতা বাড়ায় পিঁপড়া। একই সঙ্গে মাটিতে বাসা বাঁধার সময় পতঙ্গটি আশপাশে যে স্তূপ বা ঢিবি বানায়, মাটির পানি ধরে রাখার ক্ষেত্রেও তা সহায়ক ভূমিকা রাখে। (সায়েন্স ডেইলি)

প্রজ্ঞাময় আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষের কল্যাণার্থেই পিঁপড়া সৃষ্টি করেছেন। যদিও বাহ্যিক দৃষ্টিতে একে অপকারী মনে হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ প্রাণীটিও মানুষের পরমহিতৈষী। ক্ষুদ্র এ পিঁপড়া থেকেও আমরা জ্ঞান অর্জন করতে পারি কীভাবে পরিশ্রমী হওয়া যায়। সামাজিক হওয়া যায়। তাই অহেতুক এ সৃষ্টির প্রতি আমরা যেন কখনই অবিচার না করি। অপ্রয়োজনে তার বিনাশ না করি।

হাদিসে আছে, একবার একটি গাছের নিচে একজন নবীকে পিঁপড়া কামড় দিলে তিনি গর্তসহ পিঁপড়ার দল পুড়িয়ে ফেলেন। তখন আল্লাহ তাকে ওহির মাধ্যমে জানালেন, ‘তোমাকে একটি পিঁপড়া কামড় দিল, তুমি এমন একটি জাতিকে পুড়িয়ে মারলে, যে (আমার) তসবিহ পাঠ করত? তুমি মারবেই যদি একটিই মারলে না কেন? যে তোমাকে কামড় দিয়েছিল।’ (মুসলিম : ২২৪১)

মৌমাছি : মৌমাছি বা মধুমক্ষিকা নামের এ ক্ষুদ্র প্রাণীটি পিঁপড়ারই ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। এরা মধু ও মোম উৎপাদনীয় উপাকারী পতঙ্গ। পৃথিবীতে প্রায় বিশ হাজার প্রজাতির মৌমাছি লাখ লাখ বছর ধরে টিকে রয়েছে। এরা উদ্ভিদের পরাগায়ণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মৌমাছির রয়েছে ১৭০টি ঘ্রাণ সংবেদী ইন্দ্রিয়; যা দিয়ে এরা অনেক দূর থেকেও নির্দিষ্ট ফুলের ঘ্রাণ পায়। মৌমাছি কঠোর পরিশ্রমী একটি প্রাণী। একটি বড় চাকের মধু সংগ্রহ করতে গড় হিসাবে সব মৌমাছি প্রায় নব্বই হাজার মাইল পথ পাড়ি দেয়। এ নব্বই হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে তারা মানুষের জন্য মধু সংগ্রহ করে। মধুকে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘ফিহি শিফাউল লিন্নাস’ তথা মানবজাতির মহৌষধ।

‘হজরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত একটি লোক রাসূলুল্লাহর (সা.) কাছে এসে বলল, ‘আমার ভাইয়ের খুব পায়খানা হচ্ছে।’ তিনি বললেন, ‘তাকে মধু পান করিয়ে দাও। সে গেল এবং তাকে মধু পান করাল। আবার সে এলো এবং বলল (এভাবে দু’বার) পুনরায় এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল (সা.)! তার পায়খানা তো আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বললেন, আল্লাহ সত্যবাদী এবং তোমার ভাইয়ের পেট মিথ্যাবাদী। সে গেল এবং তাকে মধু পান করাল। এবার সে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করল।’ (বুখারি : ৫/২৯১, মুসলিম, তিরমিজি : ৬০৭/ ২০২৩)।

মৌমাছির আবাসস্থলকে বলা হয় মৌচাক। এটি তৈরি হয় মোম জাতীয় পদার্থ দিয়ে। এ চাকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ষড়ভুজ প্রকোষ্ঠ থাকে। মৌমাছিরা এসব প্রকোষ্ঠে মধু সঞ্চয় করে। আর ফাঁকা প্রকোষ্ঠে ডিম পাড়ে। লার্ভা ও পিউপা সংরক্ষণ করে। মৌমাছির এ দারুণ শৈল্পিক বাসা বা চাক আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের এক কুদরতেরই প্রকাশ। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আপনার রব মৌমাছিদের জ্ঞান দান করেছেন, গৃহ নির্মাণ কর পাহাড়ে, বৃক্ষে ও মানুষ যে গৃহ নির্মাণ করে তাতে।’ ( সূরা নাহল : ৬৮)

মাছি : মাছি! ডিপ্টেরা বর্গভুক্ত একটি পতঙ্গের নাম। প্রাণী জগতের সবচেয়ে দ্রুত এ পতঙ্গের মূল রহস্য তার এক জোড়া পাখা। যার একটিতে রয়েছে মানবদেহের রোগ প্রতিষেধক। হজরত আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কারও পানীয় বস্তুর মধ্যে মাছি পড়ে, তখন সে যেন তাকে (মাছিকে) তার মধ্যে ডুবিয়ে দেয়। তারপর তাকে বাইরে ফেলে দেয়। কেন না ওর এক ডানায় রোগ আর অন্য ডানায় আরোগ্য রয়েছে।’ (বুখারি : ৩৩২০, ৫৭৮২)।

কিং আবদুল আজীজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডক্টর ‘ওয়াজিহ বায়েশরী’ এ হাদিসের আলোকে মাছিকে নিয়ে কয়েকটি পরীক্ষা চালান। জীবাণুমুক্ত কিছু পাত্রের মাধ্যমে মাছির বাজার থেকে কয়েকটি মাছি ধরে নিয়ে জীবাণুমুক্ত টেস্ট টিউবে রাখেন। তারপর নলটি একটি পানির গ্লাসে উপুড় করেন। মাছিগুলো পানিতে পড়লে কয়েক ফোঁটা পানি নিয়ে পরীক্ষা করে দেখেন পানিতে অসংখ্য জীবাণু রয়েছে। তারপর জীবাণুমুক্ত একটি সুচ দিয়ে মাছিকে ওই পানিতেই ডুবিয়ে দেন। তারপর কয়েক ফোঁটা পানি নিয়ে পরীক্ষা করে দেখেন, সেই পানিতে আগের মতো আর জীবাণু নেই, বরং কম। তারপর আবার ডুবিয়ে দেন। তারপর কয়েক ফোঁটা পানি নিয়ে আবার পরীক্ষা করেন।

এমনিভাবে কয়েকবার পরীক্ষা করে দেখেন যতবার মাছিকে ডুবিয়ে পরীক্ষা চালিয়েছেন ততবারই জীবাণু কমেছে অর্থাৎ ডক্টর ওয়াজীহ প্রমাণ দিখিয়েছেন, মাছির একটি ডানায় রোগ জীবাণু রয়েছে এবং অন্যটিতে রোগনাশক ওষুধ রয়েছে।

পৃথিবীর প্রায় ১০ হাজার প্রজাতির পোকামাকড় আছে যারা মানুষের উপকারী বন্ধুর ভূমিকা পালন করে।

এসব পোকামাকড় মানুষ ও মানুষের চাষাবাদের ফসলের ক্ষতির চেয়ে উপকারই বেশি করে। এরা শুধু মানুষের বাহ্যিক উপকারই করে না, বরং সর্বক্ষণ মানুষের কল্যাণও কামনা করে থাকে। হাদিসে এসেছে, ‘নিশ্চয়ই যারা মানুষকে সুন্দর কথা জানায় তাদের জন্য আল্লাহ, ফেরেশতাকুল, নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের অধিবাসীরা, এমনকি গর্তের পিঁপড়া ও সমুদ্রের মাছ পর্যন্ত রহমতের দোয়া করতে থাকে।’ (তিরমিজি : ২৬৮৫)।

লেখক : প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×