বিজ্ঞানময় কোরআন সম্মত চাঁদ দেখা

প্রকাশ : ২১ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মঈন চিশতী

(পূর্ব প্রকাশের পর)

আমাদের জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির যুক্তি, রাসূলুল্লাহ (সা.) চাঁদ দেখে রোজা রাখা এবং রোজা ভাঙার কথা বলেছেন। এ প্রসঙ্গে যত হাদিস আছে, তাতে একই রকম মতামত পাওয়া যায়।

সব দিক পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশে আমরা অন্যান্য দেশের এক দিন পর নতুন চাঁদ দেখতে পাই। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আরববিশ্বে বাংলাদেশের ৩ ঘণ্টা পর সূর্যাস্ত হয়। সে জন্য ৩ ঘণ্টা পর আরববিশ্ব নতুন চাঁদ দেখতে পেলেও সময়ের ব্যবধানের কারণে বাংলাদেশে তা দেখতে পাওয়া যায় না। এ যুক্তি যদি ধরে নেওয়া হয়, তাহলে আমাদের এক ঘণ্টা আগে ইন্দোনেশিয়া এবং দুই ঘণ্টা আগে মালয়েশিয়ায় সূর্যাস্ত হওয়ায় তারাও নতুন চাঁদ দেখার কথা নয়। কিন্তু তারা একই গোলার্ধে হওয়ার কারণে আরববিশ্বকে অসুসরণ করে।

বাংলাদেশে সময়ের ব্যবধানে নতুন চাঁদ দেখা না গেলে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে কীভাবে দেখতে পারে? বাস্তবতা হচ্ছে, প্রতি বছরই দেখা যায় আরববিশ্বে যেদিন নতুন হিজরি মাস শুরু করে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া সেই পঞ্জিকা অনুসরণ করে। তারা আরববিশ্বের সঙ্গে একাত্ম হয়ে লাইলাতুল বারাত রোজা রাখে ঈদ এবং লাইলাতুল কদর উদযাপন করে। এ দুটি মুসলিম দেশ আরববিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হিজরি মাস কেন শুরু এবং শেষ করে, তার নিশ্চয়ই গ্রহণযোগ্য যুক্তি আছে। বাংলাদেশের ইসলামী স্কলাররা এ দুই দেশের যুক্তিগুলো পরীক্ষা ও পর্যালোচনা করে দেখতে পারেন।

নতুন চাঁদ দেখা নিয়ে বিশ্বব্যাপী যে বিতর্ক চলছে তা নিয়ে ‘অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশনের (ওআইসি)’ উদ্যোগে ধর্মীয় পণ্ডিত ও নামকরা আলেমরা পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, একটি মুসলিম দেশে চাঁদ দেখা গেলে অন্যান্য দেশেও তা মানা হবে।

২০১৬ সালের মে মাসে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত ‘ইন্টারন্যাশনাল হিজরি ক্যালেন্ডার ইউনিয়ন কংগ্রেস’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলিমদের মধ্যে যে বিভক্তি রয়েছে তা নিরসনের উদ্যোগ নেয়া হয়। সম্মেলনে সবাই একমত না হলেও বেশিরভাগ প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞ একটি হিজরি বর্ষপঞ্জির পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) শুধু আরব দেশের জন্য প্রেরিত নবী নন। তার ভাষ্য মতে ইন্নি রাসূলুল্লাহি ইলাইকুম জামিয়া’ আল্লাহ তাকে সারা বিশ্বের জন্য নবী হিসেবে প্রেরণ করেছেন। প্রায় দেড় হাজার বছর আগের বিশ্ব আজকের মতো তৎক্ষণিক ও ব্যাপক যোগাযোগের আওতায় ছিল না। তাই বিশ্বের কোনো দেশে চাঁদ দেখা গেলে তা বিশ্বের অন্য দেশের জনগণের জানার সুযোগ ছিল না।

জ্যোতির্বিজ্ঞান, ডিজিটাল প্রযুক্তিসহ বিজ্ঞান আজ অনেক উন্নত ও বিকশিত। চাঁদ দেখা নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিতর্কের অবসানকল্পে বিজ্ঞানের সাহায্য নেয়া যেতে পারে। আল কোরআনে ৭৫০টি আয়াতে বিজ্ঞান বিষয়ে দিকনির্দেশনা আছে। সূরা ইয়াসিনের ২ নম্বর আয়াত ‘ইয়াসীন ওয়াল কোরআনিল হাকীম’-এর বাংলা তরজমা কেউ লিখেছেন, ‘হেকমতপূর্ণ কোরআনের শপথ’, কেউ লিখেছেন, ‘শপথ এই বিজ্ঞানময় কোরআনের’। সূরা আলে ইমরানের ১৯০ নম্বর আয়াত ‘ইন্না ফী খালক্বিস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বি লা আয়াতিললি উলিল আলবাব, নিশ্চয়ই আসমান ও জমিনের সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনে বুদ্ধিমানদের জন্য নিদর্শন আছে।’ ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে, এক সময় কোরআনের আলোকে মুসলমানরা বৈজ্ঞানিক গবেষণা শুরু করে এর যাত্রা শুরু করেছিলেন। মুসলিম শাসক আল মামুনের রাজত্বকালে আকাশতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। প্রখ্যাত বিজ্ঞানী আবুল হাসান নবম শতাব্দীতে দূরবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কার করে জ্যোতির্বিজ্ঞানের পথ উন্মুক্ত করেন। দশম শতাব্দীতে বিজ্ঞানী আল বাত্তানী সৌরমণ্ডলের গতি, চান্দ্রমাসের সঠিক গণনা, চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণের তথ্যাদি নির্ণয় করে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেন।

বর্তমানে বিজ্ঞানের স্বর্ণযুগে ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিস্ময়কর অগ্রগতির যুগে যখন মানুষ চাঁদে যাচ্ছে, মঙ্গলগ্রহে বসবাসের স্বপ্ন দেখছে, ব্ল্যাকহোলের ছবি মানুষের চোখের সামনে তুলে ধরছে এবং বাংলাদেশের ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ মহাকাশে অবস্থান করছে, সে সময়ে নতুন চাঁদ দেখা নিয়ে যে বিতর্ক এর অবসান কি অসম্ভব? সামনে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি রমজানসহ সব চাঁদ দেখার বিষয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেবেন। ১৯৯৮ সালে তিরিশ তারাবি ২৯ রোজা শেষে ঈদ আবার ২০১৯ সালে তিরিশ তারাবি ২৯ রোজা শেষে ঈদ এই ভুল যেন আর না হয়। ইসলামের সব দলিলের আলোকে ওআইসিসহ বিশ্বের বিভিন্ন ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেমের মতামতকে বিবেচনায় নিয়ে আমরা একই গোলার্ধের মানুষ কাবাকেন্দ্রিক চান্দ্র মাসের হিসাবে যেন নিবিষ্ট হতে পারি সেই তৌফিক আল্লাহর কাছে কামনা করছি। আল্লাহ যেন আমাদের পৃথিবীর মানুষের কাছে খেলো হিসেবে আর উপস্থিত না করেন। আসুন স্লোগান উঠাই ‘বিজ্ঞানময় কোরআনসম্মত চাঁদ দেখার মাধ্যমে হোক বিতর্কের অবসান’। আমিন।

লেখক : ধর্মচিন্তক সুফি ও গবেষক

Email : [email protected]