হজযাত্রীদের জন্য জরুরি পরামর্শ

  মুহাম্মদ ছফিউল্লাহ হাশেমী ১২ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মক্কায় যাতায়াত ও হজের কাজ সম্পাদন করার মতো আর্থিক ও দৈহিক সামর্থ্য আছে যাদের তাদের জন্য জীবনে একবার হজ পালন করা ফরজ। মক্কা যাওয়ার পথে যতক্ষণ জেগে থাকবেন শুধু তালবিয়া পাঠ করুন (লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক...)।

মক্কায় পৌঁছে

পবিত্র মক্কা দেখামাত্রই এ দোয়া পড়বেন, হে আল্লাহ! আমাকে এ পবিত্র শহরে ইমান, নিরাপত্তা ও মঙ্গলসহ পৌঁছে দিন। নিরাপদে থাকার তাওফিক দিন এবং এ নগরীর সম্মান ও আদব রক্ষার তাওফিক দিন।

* মক্কায় পৌঁছে বিশ্রামের প্রয়োজন হলে বিশ্রাম নিন। আর নামাজের ওয়াক্ত হলে নামাজ আদায় করুন। বিশ্রাম শেষে দলবদ্ধভাবে ওমরার নিয়ত করে থাকলে ওমরা পালন করুন।

* একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, মসজিদুল হারামে অনেক প্রবেশপথ আছে; সব ক’টি দেখতে একই রকম। কিন্তু প্রতিটি প্রবেশপথে আরবি ও ইংরেজিতে ১, ২, ৩ নম্বর ও প্রবেশপথের নাম আছে; যেমন, ‘বাদশা আবদুল আজিজ প্রবেশপথ’। আপনি আগে থেকে ঠিক করবেন, কোন প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকবেন বা বের হবেন। আপনার সফরসঙ্গীকেও স্থান চিনিয়ে দিন। তিনি যদি হারিয়ে যান তাহলে নির্দিষ্ট গেটের সামনে থাকবেন। এতে হারিয়ে গেলেও নির্দিষ্ট স্থানে এসে সঙ্গীকে খুঁজে পাবেন।

* মক্কায় পৌঁছে হারাম শরিফের সীমানায় পৌঁছেই মনে করুন, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের শাহি দরবারে আপনি হাজির হয়েছেন। তাই আদবের সঙ্গে গুনাহ মাফের জন্য দোয়া করুন।

* মসজিদুল হারামে প্রবেশ করার সময় বিসমিল্লাহ ও দরুদ শরিফ পড়ার পর ‘আল্লাহুম্মাফ তাহলি আবওয়াবা রাহমাতিকা’ পড়–ন।

* কোনো দরজার সামনে নামাজ পড়া ঠিক নয়, এতে পথচারীর কষ্ট হয়।

* ‘হাজরে আসওয়াদে’ চুমু দেয়া সুন্নত। তবে ভিড়ের কারণে না পারলে দূর থেকে চুমুর ইশারা করলেই চলবে। ভিড় করে অন্যকে কষ্ট দেয়া যাবে না।

* কাবা শরিফ প্রথম দেখামাত্র দোয়া কবুল হয়, তাই বিগলিত হৃদয়ে যত দোয়া আপনি করতে পারেন করুন।

মদিনা শরিফ জিয়ারত

মসজিদে নববি সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার এ মসজিদে এক রাকাত নামাজ পড়বে, সে পঞ্চাশ হাজার রাকাত নামাজের

সওয়াব পাবে।’

* হজ করতে গেলে হজের আগে বা পরে মদিনা শরিফে মহানবী (সা.)-এর রওজা শরিফ এবং মসজিদে নববির জিয়ারত করে এলে তাতে সওয়াব আছে।

* মনে রাখতে হবে, পরনিন্দা ও পরচর্চা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। নিজের কারণে কারও সঙ্গে ঝগড়া বা তর্ক হলে আগেই মাফ চেয়ে নিতে হবে।

* হজের পর নেক আমলের প্রতি যত্নবান হওয়া একান্ত কর্তব্য। কেননা হজের পর নেক আমলের আগ্রহ হওয়া হজ কবুলের অন্যতম আলামত।

* মক্কা শরিফে ও মদিনা মুনাওয়ারায় সর্বদা অজুর সঙ্গে থাকুন।

* মক্কা শরিফে মসজিদুল হারামে এবং মদিনা শরিফে মসজিদে নববিতে বেশি সময় কাটান আর ভাবুন, এখানে আসার এমন সৌভাগ্য আর নসিব হবে কি?

* বেশি বেশি আল্লাহর জিকির, তাওবা-ইস্তিগফার, তাসবিহ তাহলিল এবং কোরআন তিলাওয়াত করুন।

আরাফায় সাবধানতা

* আরাফার ময়দানে অনেক প্রতিষ্ঠান বিনামূল্যে খাবার, জুস, ফুল ইত্যাদি বিলায়। সেসব আনতে গিয়ে ধাক্কাধাক্কি হয়, তাই সাবধান।

* মুজদালিফায় রাতে থাকার জন্য প্লাস্টিকের পাটি পাওয়া যায়। মক্কায়ও কিনতে পাওয়া যায়।

* আরাফার ময়দান থেকে যদি হেঁটে মুজদালিফায় আসেন, পথে বাথরুম সেরে নেবেন। কেননা মুজদালিফার বাথরুমে অনেক ভিড় থাকে।

* হজ মন্ত্রণালয় মিনার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে (যেখানে হজযাত্রীদের সহজে চোখে পড়ে) ইলেকট্রনিক বিলবোর্ডে বিশ্বের প্রায় ১৮টি ভাষায় বিভিন্ন জরুরি দিকনির্দেশনা ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রচার করে। যেখানে বাংলা ভাষাও রয়েছে।

* বেশিরভাগ সময় হাজীদের মিনায় তাঁবুতে থাকতে হয়। তাই মিনাকে এক হিসেবে তাঁবুর শহর বলা যায়। চারদিকে তাঁবু আর তাঁবু। সব তাঁবু দেখতে একই রকম। মোয়াল্লেম নম্বর বা তাঁবু নম্বর জানা না থাকলে যে কেউই হারিয়ে যেতে পারেন। বিশেষ করে বাংলাদেশি হজযাত্রীদের বড় অংশ বৃদ্ধ বয়সে হজ করতে আসেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে রাখেন না। অনেকে হারিয়ে ফেলেন গন্তব্য। বাংলাদেশের পতাকা অথবা ভাষা শুনে প্রবাসী বাংলাদেশি হজকর্মীরা তাদের গন্তব্যে

পৌঁছে দেন।

এ সমস্যা এড়ানোর জন্য আপনি যে তাঁবুতে অবস্থান করবেন, সে তাঁবু চিহ্নিত করে নিন।

* মোয়াল্লিম অফিস থেকে তাঁবুর নম্বরসহ কার্ড দেয়া হয়; তা যত্নে রাখুন। বাইরে বের হওয়ার সময় সঙ্গে রাখুন।

* হজযাত্রী সচেতন থাকলে হারিয়ে যাওয়ার কোনো ভয় নেই। অনেক বাংলাদেশি হারিয়ে যাওয়ার কারণে হজের আহকাম বা নিয়মকানুন ঠিকমতো পালন করতে পারেন না।

মক্কা-মদিনায় প্রচুর বাংলাদেশি হোটেল আছে

* মক্কার হোটেলগুলোর নাম ঢাকা, এশিয়া, চট্টগ্রাম, জমজম ইত্যাদি। এসব হোটেলে ভাত, মাছ, গোশত, সবজি, ডাল ইত্যাদি সবই পাওয়া যায়। হোটেল থেকে পার্সেলে বাড়িতে খাবার নিয়ে দু’জন অনায়াসে খেতে পারেন।

* মক্কা-মদিনায় প্রচুর ফল ও ফলের রস পাওয়া যায়। এগুলো কিনে খেতে পারেন।

* মক্কা-মদিনায় অনেক বাংলাদেশি কাজ করেন। তাই ভাষাগত কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কেনাকাটার সময় দরদাম করে কিনবেন।

* হজের সময় প্রচুর হাঁটাচলা করতে হয়, পকেটে টাকা থাকলেও যানবাহন পাওয়া যায় না।

* মিনায় চুল কাটার লোক পাওয়া যায়। নিজেরা নিজেদের চুল কাটবেন না, এতে মাথা কেটে যেতে পারে।

* মিনায় কোনো সমস্যা হলে হজযাত্রীদের সেবা দেয়ার জন্য বাংলাদেশ হজ মিশনের তাঁবুতে যোগাযোগ করবেন।

* মক্কা-মদিনা থেকে বাংলাদেশে কম খরচে ফোন করা যায় (কোনো বাংলাদেশিকে বললে দেখিয়ে দেবেন)। সৌদি আরবে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে চাইলে সঙ্গে সেট নিয়ে যাবেন, ওখানে (হজ প্যাকেজ) মোবাইল সিম কিনতে পাওয়া যায়।

* মক্কায় কাবা শরিফ ছাড়াও জাবাল-ই-রহমত (আরাফার ময়দানে অবস্থিত), জাবাল-ই-নূর, মিনায় আল-খায়েফ মসজিদ, নামিরা মসজিদ, আরাফার ময়দান, মুজদালিফা, জাবাল-ই-সাওর প্রভৃতি ঐতিহাসিক স্থানে ঘুরে দেখা যায়।

হজযাত্রীদের স্বাস্থ্য রক্ষার

কিছু টিপস

সৌদি আরব বেশ গরমের দেশ। দিনে তাপমাত্রা ৩০-৩৫ ডিগ্রির বেশি, আর্দ্রতাও থাকে বেশি। আবার রাতে তাপমাত্রা বেশ কমে যায়। তাপমাত্রা বেশি বলে ডায়রিয়া, হিটস্ট্রোক ও ইনফ্লুয়েঞ্জার সমস্যা দেখা দেয় খুব। একটু সচেতন হলে এ সমস্যা থেকে সহজেই মুক্তি পাওয়া যায়। নিচের বিষয়গুলো লক্ষ করুন-

* যাত্রার আগেই চিকিৎসকের মাধ্যমে পুরোপুরি চেকআপ করিয়ে নিন।

হজের নিয়ত করে হাঁটার অভ্যাস করুন

* হজে তাওয়াফ ও সাফা-মারওয়া পর্বতে সায়ি ছাড়াও আরও অনেক আনুষ্ঠানিকতা পালন করতে হয় হেঁটে। এ ক্ষেত্রে হজে যাওয়ার আগে থেকেই হাঁটার অভ্যাস করতে হবে।

* অনেকক্ষণ ধরে বিমানে বসে থাকার ফলে হার্ট, ফুসফুস, ক্যান্সার রোগীসহ অন্যদের পায়ে পানি জমে যেতে পারে বা পা ফুলে যেতে পারে। এ সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য বিমানে ভ্রমণের সময় রাবারের তৈরি এমন কিছু পরতে পারেন, যা পায়ের ওপর কিছুটা চাপ সৃষ্টি করবে। ঢিলেঢালা জামা পরুন ও বিমানে প্রচুর পানি পান করুন। প্রতি ঘণ্টায় কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়ান ও হাত-পা নাড়াচাড়া করুন। পায়ের ওপর পা তুলে বসবেন না।

* খেজুর এমন একটি ফল, যা যে কোনো রোগী প্রচুর পরিমাণে খেলেও কোনো সমস্যা হয় না। প্রচুর পরিমাণে খেজুর খেতে পারেন ডায়াবেটিক রোগীরাও।

* মক্কা ও মদিনায় অজু করার স্থানে অজু করার পাত্রে জমজমের পানি অনেকেই পান করেন। এতে বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ হতে পারে। পানি পানের জন্য ওয়ান টাইম ইউজ পাত্র আছে সেগুলোতে পানি পান করুন।

* খেয়াল রাখুন মাথা মুণ্ডনের সময় নাপিত আপনার জন্য আলাদা ব্লেড ব্যবহার করছে কি না। সবার জন্য আলাদা নতুন ব্লেড ব্যবহার করতে হবে।

* হজের সময় যে সমস্যা বেশি দেখা দেয় তা হল শ্বাসতন্ত্রের ইনফেকশন। এ ক্ষেত্রে জ্বর, কাশি, গলায় খুসখুস, গলায় ক্ষত, নাক দিয়ে পানি ঝরা, শরীর ব্যথা, শ্বাসকষ্ট হয়ে থাকে। এ সমস্যা সমাধানে প্রচুর পানি পান করুন। জ্বর ও ব্যথার জন্য প্যারাসিটামল, গলায় ক্ষতের জন্য লবণ দিয়ে গরম পানি গড়গড়া ও গরম পানি পান করুন। হাঁচি-কাশির সময় নাক-মুখ ঢেকে রাখুন। বাইরে থেকে এসেই হাত-মুখ ধুয়ে ফেলুন।

* ডায়াবেটিস রোগীরা হজে যাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। আপনার ওষুধ বা ইনসুলিন নিলে তার ডোজ পরিবর্তন করতে হবে কিনা জেনে নিন। হজে থাকার সময়ও নিয়ম করে ওষুধ খান বা ইনসুলিন নিন। সব সময় মধু বা মিষ্টিজাতীয় খাবার সঙ্গে রাখুন। যদি আপনার অতিরিক্ত দুর্বলতা, অতিরিক্ত ঘাম, প্যালপিটিশন বা অতিরিক্ত হৃদস্পন্দন হয় তাহলে দ্রুত মিষ্টিজাতীয় খাবার খান। উচ্চরক্তচাপের জন্য ওষুধ খাওয়া বাদ

দেবেন না।

* হজের সময় হাজীরা হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হন বেশি এবং এ কারণে তাদের মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। হিটস্ট্রোক থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য একটানা শারীরিক পরিশ্রম করবেন না বা লম্বা সময়ের জন্য হাঁটবেন না। হজের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার মাঝে সময় পেলেই ঠাণ্ডা জায়গায় বসে কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম করুন। হিটস্ট্রোকের উপসর্গ দেখা দিলে ভিড় থেকে সরে যান। সুতি কাপড় পড়তে হবে।

* কিছু কিছু ওষুধ সঙ্গে নিন। এগুলো হতে পারে কাশির ওষুধ, অ্যালার্জির ওষুধ যেমন- লোরাটিডিন, হিস্টাসিন। ডায়রিয়ার ওষুধ যেমন- খাবার স্যালাইন, অ্যান্টিবায়োটিক জাতীয় ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিক ওয়েন্টমেন্ট, কাটাছেঁড়ার জন্য পভিডন আয়োডিন, স্যাভলন, ব্যান্ডেজ, কটন, প্যারাসিটামল ও কিছু ব্যথানাশক ওষুধ যেমন- ডাইকোফেনাক, কিটোরোলাক, গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ ওমিপ্রাজল। আপনি যেসব ওষুধ নিয়মিত খান সেগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে সঙ্গে নিন। আপনার চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র সঙ্গে রাখুন। কোনো সমস্যা হলে হজ এজেন্ট ও সৌদি মেডিকেল সেন্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

হজের সফরে সবসময় আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ওপর ভরসা রাখুন। সারাক্ষণই দোয়া চালিয়ে যান। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের প্রত্যেকের হজকে হজে মাবরুর হিসেবে কবুল করুন।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, মাইলস্টোন কলেজ, উত্তরা, ঢাকা

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×