মুসলমানের প্রেরণা হাফেজ ড. মুরসি

  সাইফুল ইসলাম-আল-আযহারি ১২ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে ‘আর যারা আল্লাহর জন্য নিহত হয়, তাদেরকে তুমি কখনও মৃত মনে করো না। বরং তারা নিজেদের পালনকর্তার কাছে জীবিত ও জীবিকাপ্রাপ্ত’। (সূরা আল ইমরান-১৬৯)। যুগে যুগে ইসলামের বীর সেনানীগণ আল্লাহর দ্বীনের জন্য নিজেদের উৎসর্গ করে ইসলামের ঝাণ্ডাকে উঁচু রেখেছেন। সেই ধারাবাহিকতার একজন প্রেসিডেন্ট ড. মোহাম্মদ মুরসি। কারাকক্ষে তিনি বিজয়ী হিসেবে জুলুমের প্রতিবাদ করে শাহাদাতকে বরণ করেছেন।

মিসর ইতিহাস-ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক সম্পদ, সুয়েজ খাল ও স্বৈরশাসকদের ভূমি হিসেবে পরিচিত। বলা যায়, দশক দশক ধরে মিসরে চলছে সেনাবাহিনীর স্বৈরশাসন। ২০১১ সালে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পতন ঘটে তিন দশকের স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের। হজরত মূসা (আ.), হারুন (আ.) ও ইউসুফ (আ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত হলেও মিসরের জনগণ কখনও একজন উদার-ন্যায়পরায়ণ শাসক পায়নি। সবশেষে পেয়েছিল স্বচ্ছভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট কোরআনে হাফেজ ড. মোহাম্মদ মুরসিকে।

তার এক বছরের শাসনকর্মে ফুটে উঠেছিল প্রকৃত মুসলিম উম্মাহর রাষ্ট্রনেতার চরিত্র, মিসরি জীবনব্যবস্থায় দেখা গিয়েছিল সাহাবিদের কর্ম-আদর্শ। প্রেসিডেন্ট হয়েও তিনি মসজিদে আজান দিতেন। কর্মকর্তা, মন্ত্রী, নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত স্টাফদের নিয়ে নামাজের ইমাম হতেন। প্রতিটি নামাজ মসজিদে গিয়ে পড়তেন। বেতনের বাইরে রাষ্ট্র থেকে কিছু নিতেন না। বলতেন, যেভাবে সাধারণ ভাড়া বাড়ি থেকে প্রেসিডেন্ট হাউসে এসে উঠেছি ফিরে যাওয়ার দিন যদি বাড়তি কোনো সম্পদের সন্ধান পাও কিংবা ব্যাংকে বা পকেটে জমা টাকা পাও, তাহলে ধরে নেবে আমি জনগণের সঙ্গে খিয়ানত করেছি। তিনি আখেরাতের চিরন্তন জীবনে কল্যাণপ্রাপ্তির আশায় দেশ ও জাতির জন্য শ্রম দিয়েছেন।

মুসলিম বিশ্বের কোনো দেশে এমন দৃশ্য কি দেখা যাবে যে, রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের আপন ভাই কৃষি কাজ করে জীবিকা অর্জন করেন। প্রেসিডেন্ট মুরসির আপন বোন চিকিৎসাধীন অবস্থায় জাগাজিগ জেলায় সরকারি হাসপাতালে মারা যান। তিনি ছিলেন প্রথম মিসরীয় প্রেসিডেন্ট যিনি রাষ্ট্রীয় খরচে তার আপনজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠাননি! অথচ স্বৈরশাসক হোসনি মোবারক ক্ষমতায় থাকাকালে তার নাতিকে রাষ্ট্রীয় বিমানে করে চিকিৎসার জন্য ফ্রান্সে পাঠিয়ে ছিলেন এবং রাষ্ট্রীয় ভাণ্ডার থেকে চিকিৎসার জন্য ব্যয় করেছেন। এ তথ্যটি আমি আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা একই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. জামাল আবদুস সাত্তার থেকে জেনেছি।

মুরসির এক ছেলে বিদেশে ডাক্তারি পেশায় চাকরি করতেন এবং অপর ছেলে মিসরে একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরির জন্য প্রার্থী হয়েছিলেন। অথচ প্রেসিডেন্ট পিতা চাইলে তার সন্তানদের যে কোনো বৈদেশিক মিশনে ডিপ্লোম্যাট হিসেবে কিংবা তেল কোম্পানিগুলোতে নিয়োগ দিতে পারতেন। তিনি অতীতের কোনো প্রেসিডেন্টের মতো বিলিয়ন্স ডলারের রাষ্ট্রীয় ভাণ্ডার নিজের সন্তানদের জন্য উন্মুক্ত করে দেননি। মুরসি ছিলেন প্রথম প্রেসিডেন্ট, যার স্ত্রী কখনও ‘ফার্স্ট লেডি’ উপাধি ধারণ করেননি।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেয়া ভাষণে বলেন, ‘আমি মিসরের প্রতিটি নাগরিকের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করব।’ একমাত্র জাতীয় ঐক্যই পারে দেশকে চলমান সংকট থেকে মুক্তি দিতে। শান্ত ও ধীর কণ্ঠে বলেন, আপনাদের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। যতক্ষণ আমি নিরপেক্ষ ও আল্লাহকে মেনে চলব ততক্ষণ হে আমার জনগণ, আমাকে সাহায্য করবেন, যদি আমি আমার দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করি বা আল্লাহকে মেনে না চলি তাহলে আমাকে অনুসরণ করবেন না।

প্রথম প্রেসিডেন্ট তিনি, যার সময় কোনো সরকারবিরোধী নেতাকর্মী ও সাংবাদিক গ্রেফতার হননি। তার সময়ে সরকারবিরোধী মিডিয়াগুলো রাত-দিন পরিকল্পিতভাবে ক্ষমতাসীন মুসলিম ব্রাদারহুডের মিথ্যা সমালোচনা করেছে।

মিসরের ইতিহাসে প্রথম রাষ্ট্রপতি যিনি পবিত্র কোরআনের হাফেজ ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন প্রকৌশলী ও ম্যাটারিয়ালস সাইন্সের ওপরে ডক্টরেট ডিগ্রিধারী। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত আমেরিকার বিখ্যাত ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। এরও আগে তিনি মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘ঘঅঝঅ’-য় বিজ্ঞানী হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। ১৯৮৫ তে আমেরিকার চাকরি ছেড়ে মিসরে চলে আসেন, স্থানীয় জাগাজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা শুরু করেন।

প্রেসিডেন্ট রীতি অনুযায়ী প্রশাসনিক দফতরে তার ছবি ঝুলাতে নিষেধ করে দেন। তিনি বিশ্বাস করতেন সব ক্ষমতার মালিক আল্লাহ। তিনি নেহায়েত আল্লাহর একজন সাধারণ প্রতিনিধি।

আল্লাহর কালাম বলছে, ‘মুমিনদের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর সঙ্গে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছেন। তাদের কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেছেন এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষা করছেন। তারা তাদের সংকল্প মোটেই পরিবর্তন করেননি।’ (সূরা আল আহ্যাব-২৩)। ড. মুরসি সত্য প্রচারের জন্য লড়ে গেছেন, কখনও পিছু হটেননি। আত্মসমর্পণ ছাড়াই তিনি সত্যে অবিচল ছিলেন। তার ইন্তেকাল মুসলিম উম্মাহ্র হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে। ইসলামপ্রিয় জনতা মর্মাহত হয়েছে, মরে গিয়ে তিনি এখন বিশ্বের ইসলাম এবং কোরআনপ্রেমিক মানুষের অনুপ্রেরণা হয়েছেন।

লেখক : কাতার অ্যাম্বাসির কর্মকর্তা

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×