হজে যাও দুনিয়াবিমুখ হয়ে

প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মঈন চিশতী

‘চলরে কা’বা জিয়ারতে চল নবীজির দেশ চল নবীজির দেশ/ দুনিয়াদারির লেবাস ছেড়ে পররে হাজীর বেশ- চল নবীজির দেশ’।

আমাদের জাতীয় কবি, দরবেশ কবি, সুফি কবি কাজী নজরুল ইসলাম দুনিয়ার মায়া মোহ ত্যাগ করে হাজীর বেশ ধরে নবীর স্ব-দেশে রওনা হতে বলেছেন। আসলে সে দেশটি কী কোনো ভৌগোলিক সীমারেখার আওতাভুক্ত? নাকি বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের চির আকাঙ্ক্ষার স্বর্গোদ্যান। সোনারগাঁ পরগণার হাদি ও মুবাল্লিগে ইসলাম মাওলানা লালপুরী শাহ’র ভাষায় ‘দেশ না ছাড়িলে দেশ মিলে না’।

আল্লামা ইকবালের ভাষায় ‘উসিকু ইজ্জত মিলি জু আপনা ওয়াতন ছোড়া/ওহ্ ফুল ডালি পে চড়হা জাতা হায় জু আপনা চমন ছোড়া (তারই সম্মান বেড়েছে যে নিজের বাসস্থানের মায়া ত্যাগ করতে পেরেছে, সে ফুলই তো রাজাবাদশাহদের ফুলদানিতে সাজানো হয় যে নিজ বাগানের মায়া ছেড়ে মালির হাতের পছন্দকে বেছে নিয়েছে।

মানুষও খোদার দুনিয়ার সাজানো বাগানের ফুল। সে যদি এ বাগানের মালিকের হাতে নিজেকে সঁপে দিতে পারে তাহলে তার মর্যাদা হাজারগুণ বেড়ে ইনসানে কামেলে পরিণত হতে পারে। মানুষকে ইনসানে কামেল বা সিদ্ধপুরুষে রূপান্তরিত করার জন্য স্রষ্টা যে কতগুলো পথ দিয়েছেন হজ তাদের অন্যতম।

আল কোরআনে ‘ওয়াজ্জিন ফিন্নাসি বিলহাজ্জি’ আল্লাহ বলেন, হে ইবরাহিম মানুষকে হজের জন্য আহ্বান কর। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিররা বলেন, ‘হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর এ ডাক রুহানিভাবে যার হৃদয়ে প্রবেশ করেছে তারাই একসময় কা’বা চত্বরে হাজিরা দিয়ে বলেন- ‘লাব্বাইক হাজির আমি, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক প্রভু হে হাজির আমি, লাব্বাইকা তোমার দুয়ারে আমি হাজির, লা শারিকা লাক তোমার সমকক্ষ আর কেউ নেই, ইন্নাল হামদা লাকা ওয়াল মুলক্, সব প্রসংশা আর রাজত্ব একমাত্র তোমারই, লা শারিকা লাক, তোমার কোনো সমকক্ষ নেই।

আল্লাহ বলেন, ‘ওয়া মাইঁইয়াদউ মাআল্লাহা ইলাহান গাইরা লা বুরহানা লাহু, যারা আল্লাহর সমকক্ষ মনে করে গায়রুল্লাহকে ডাকে তাদের কোনো ভিত্তি নেই। ইহলৌকিক ও পারলৌকি ক্ষেত্রে আল্লাহর যে কোনো সমকক্ষ নেই তার প্রমাণ হিসেবে জনৈক হাজীর লাব্বাইক ধ্বনির জবাবে একটি গায়েবি আওয়াজ তার পাশে তাওয়াফরত ১০-১২ বছরের এক বালক শুনল যখনই তিনি তালবিয়া ধ্বনি দেন তখনই গায়েবি আওয়াজ আসে ‘লা লাব্বাইকা লা লাব্বাইকা, কাজ্জাবতা কাজ্জাবতা, তুমি মিথ্যুক তুমি মিথ্যুক তোমার হাজিরা সার্থক হয়নি (যেহেতু এখনও দুনিয়ার মোহমায়া ছাড়তে পারনি। মানুষ তোমাকে হাজী সাহেব বলবে এই লোভে এখানে এসেছ) এ আওয়াজ শুনে বালকটি বলল, ‘চাচাজান যখনই আপনি লাব্বাইক ধ্বনি দেন তখনই লা লাব্বাইকা লা লাব্বাইক কাজ্জাবতা কাজ্জাবতা এ গায়েবি আওয়াজ আসে। এই তাওয়াফ সায়ি করে লাভ কী’? যার কোনো কবুলিয়তের লক্ষণ নেই।

মুরব্বি চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলে বাবা বাইশ বছর ধরে একই ধ্বনি শুনছি কিন্তু কী করব? তাঁর দুয়ার ছাড়া তো কোনো দুয়ার নেই, যে দুয়ারে ধরনা দিয়ে দরজা খটখটাব’। সঙ্গে সঙ্গে আওয়াজ আসে ‘সাদাক্বতা সাদাক্বতা ইয়া আবদি’ হে আমার বান্দা, তুমি সত্যই বলেছ যাও তোমার বাইশ বছরের হজের হাজিরাকে কবুল করে নিলাম। কারণ তুমি আমার রহমত বড়ত্ব একত্ববাদ হতে নিরাশ হওনি। এ জন্যই হজ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।

কালামে পাকে হজ প্রসঙ্গে আদেশসূচক বাক্যে আল্লাহ বলেন, ‘আতিম্মুল হাজ্জা ওয়াল উমরাতা লিল্লাহ। তোমরা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ এবং উমরাহ পালন কর, কিংবা ওয়া লিল্লাহি আলান্নাসি হিজ্জুল বাইতি মানিস্তাতাআ ইলাইহি সাবিলা’ মানুষের মধ্যে যাদের সামর্থ্য আছে তাদের কর্তব্য হল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করা।

হাদিস শরিফে হজ এসেছে এভাবে ‘আল উমরাতু ইলাল উমরাহ কাফফারাতুন লিমা বাইনা হুমা। এক উমরাহ থেকে আরেক উমরাহর মাঝামাঝি সময়ে পাপগুলোর কাফফারা হিসেবে, ওয়াল হাজ্জুল মাবরুর লাইছা লাহু জাজাউন ইল্লাল জান্নাহ। আর হজে মাবরুরের বিনিময় জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়’। হজে মাবরুর এমন হজকে বলা হয় ‘ফা লাম ইয়ারফাস’ যেখানে যৌনতা স্পর্শ করে না ‘ওয়া লাম ইয়াফসুক্ব’ আর পাপ স্পর্শ করে না। সাইয়েদুদ্তায়েফা হাসান বসরী বলেন, ‘হজে মাবরুরের লক্ষণ হল হজ শেষে দুনিয়ার চেয়ে আখেরাত মুখিতাকে বেশি প্রাধান্য দেবে বান্দা, অর্থাৎ দুনিয়াবিমুখ হয়ে হজে যাবে আর আখেরাতমুখী হয়ে ফিরে আসবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক

email:[email protected]