জীবনের আগেই মরণ সৃষ্টি করা হয়েছে

  মুহাম্মাদ হযরত আলী ১৯ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মৃত্যু

মাঝপথে আমাদের গাড়িতে বয়স্ক একজন যাত্রী উঠলেন। আমার পাশের সিটের একজন যাত্রীকে লক্ষ্য করে বললেন, মুরব্বি একটু চেপে বসুন। আবার লোকটি গাড়ি থেকে নেমে যাওয়ার সময় বললেন, চাচা আমাকে যেতে দিন।

ঘটনাটি স্বাভাবিক হলেও এর একটি অন্তর্নিহিত কারণ রয়েছে বলে আমার ধারণা। কেননা যাত্রীটি ছিলেন বয়স্ক। সাদা ধবধবে পাকা চুল-দাড়ি, মুখে দাঁত নেই, শরীরের চামড়ায় বার্ধক্যের ঢেউ, স্বাভাবিক গতিতে হাঁটা-চলা করার সামর্থ্যও কম। যাকে মুরব্বি বলে সম্বোধন করলেন তার চেয়ে অনেক বেশি বয়স।

যে লোকটিকে চাচা বলে সম্বোধন করলেন তার চেহারায় তারুণ্যের নিদর্শন না থাকলেও বার্ধক্যের কোনো ছাপ নেই। নিশ্চিত কম বয়সের একজন মানুষকে কেন মুরব্বি এবং চাচা বলে সম্বোধন করবেন? তার সঠিক কারণ হয়তো আমাদের জানা নেই। কিন্তু ধারণা করছি যে, লোকটা নিজের বার্ধক্য সম্পর্কে উদাসীনতার পরিচয় দিচ্ছেন। আর এ উদাসীনতার কারণ হল নিজের বয়স লুকিয়ে রেখে দুনিয়ায় আরও বেশি দিন বেঁচে থাকার বাসনা করছেন তিনি। এটিই আমাদের প্রচলিত ট্রেডিশন বা সমাজের অধিকাংশ মানুষের মনোবৃত্তি এমনই। বয়সে বড় কেউ হতে চায় না, যত কম বয়সী হওয়া যায়, তত বেশি দিন-দুনিয়ায় বেঁচে থাকা যাবে এটাই সাধারণ বিশ্বাস মানুষের।

সৃষ্টি থেকেই মানুষ দুর্বল, আল্লাহতায়ালা সীমিত বা নির্ধারিত হায়াত দিয়ে তাকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। জীবনের একটি ধারাবাহিক পঞ্জিকাও রয়েছে। শৈশব, কৈশোর, যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব ও বার্ধক্য। জীবনের বর্ণিত ধাপগুলোর চলন, বলন ও আচরণের ভিন্ন ভিন্ন রীতিনীতি আছে। যা ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ পরিবর্তন করতে পারবে না। কোনো ব্যক্তি যদি বুড়ো বয়সে যুবকসুলভ আচরণ দেখায় তবে সেটা আল্লাহতায়ালার বিধানে অবজ্ঞার শামিল, সত্য গোপনের চেষ্টা।

জীবন ও মরণ দুটি পৃথক সত্তা হলেও মৃত্যুর বিপরীতই হল জীবন। জীবনের জন্য মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী এবং প্রত্যেক আত্মার জন্যই মৃত্যু অবধারিত। মৃত্যুর জন্যই প্রভু মানুষকে জীবন দান করেছেন।

রোগবালাই থেকে মানুষের কোনো না কোনো উপায়ে মুক্তি পাওয়ার পথ আছে। কিন্তু মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় কারও নেই। মৃত্যু সবারই অবধারিত। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে। পৃথিবীর সবকিছুই ধ্বংসশীল মহিমাময় মহানুভব পালন কর্তার সত্তা ছাড়া (সূরা আররহমান, আয়াত-২৬)। সুতারাং একমাত্র আল্লাহতায়ালার সত্তাই চিরন্তন ও চিরঞ্জীব আর সবই ক্ষণস্থায়ী।

জীবনের প্রতিটি ঘাটের সঙ্গে বয়সের সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্ক আছে। ছোট বড় সবারই উচিত বয়সের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে নিয়মকানুন রীতিনীতি ও আচার-আচরণ প্রকাশ করা, কেননা আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, তোমাদিগকে পরীক্ষা করার জন্য (সূরা মুলক, আয়াত-২)। বর্ণিত আয়াতে, মানুষের জীবনের আগেই মরণ সৃষ্টি করার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। বুঝা যাচ্ছে মৃত্যুর জন্যই জীবনের সৃষ্টি।

মৃত্যুর ভয় সামনে রেখে জীবন পরিচালনার জন্যই আল্লাহতায়ালা আগে মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন। যেহেতু মৃত্যু আগে সৃষ্টি করা হয়েছে তাই জীবনের সবচেয়ে সত্য হচ্ছে মৃত্যু। জীবন তো নশ্বর আর মৃত্যু হল অবিনশ্বর, জীবন নকল মুসাফির আর মৃত্যু সত্য যাত্রী। জীবনকে কেউ পরিবর্তন করার যেমন এখতিয়ার রাখে না তেমনি যার যখন যেভাবে মৃত্যু রয়েছে তা থেকে এক চুলও এদিক সেদিক করতে হবে না।

নির্ধারিত সময়েই (যা একমাত্র আল্লাহতায়ালাই ভালো জানেন) প্রত্যেক মানুষকে দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে বাধ্যতামূলকভাবে মৃত্যুর সঙ্গে আলিঙ্গন করতে হবে। পবিত্র কোরআনের অন্য আয়াতে এসেছে, যখন তাদের সময় আসবে তখন তারা মুহূর্তকাল দেরি করতে পারবে না এবং তাড়াতাড়ি করতে পারবে না (সূরা আরাফ-৩৪)।

অতএব, বয়স কম ভেবে মৃতুচিন্তা না করা বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়। যেহেতু মৃত্যুর জন্যই জীবন তাই হায়াত দরাজের জন্য পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে পারি। আর আমাদের জীবনের সাধনা হওয়া উচিত মরণ যেন শান্তিময় হয়। আল্লাহতায়ালা মুমিন বান্দাদের জন্য এমনই যেন করেন।

লেখক : শিক্ষক

email : [email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×