বাংলা ভাষার চর্চা ইবাদত বলে গণ্য হবে

  মাওলানা আবদুর রাজ্জাক ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলা ভাষার চর্চা ইবাদত বলে গণ্য হবে

পরস্পর ভাব আদান-প্রদানের জন্য প্রচলিত পদ্ধতিতে যে শব্দমালা ব্যবহার করে তাই-ই ভাষা। বস্তুত মানুষের এ ভাষা আল্লাহর দেয়া এক অফুরন্ত নেয়ামত। আল্লাহর মহিমার এক উজ্জ্বল নিদর্শন। আল্লাহর ভাষায় ‘আসমান ও জমিনের সৃষ্টি, ভাষা ও রঙের ভিন্নতা তার নিদর্শনাবলীর মধ্যে অন্যতম। জ্ঞানীদের জন্য রয়েছে এর জন্য বহু নিদর্শন।(সূরা আর রুম-২২)

কীভাবে ভাষার উদ্ভব হয়েছে, এর উৎপত্তিস্থল কী? তা নিয়ে ভাষাবিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও বস্তুত স্বয়ং স্রষ্টাই ভাষার উদ্ভাবক। ইবনে ফারিছ আল লুবাবির মতে আল্লাহ স্বয়ং ভাষা শিখিয়েছেন। তিনি সর্বপ্রথম আদম (আ.) কে ভাষা শিক্ষা দেন। তা থেকে তার সন্তানরা ভাষা শিক্ষা লাভ করেছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, তিনি আদমকে সব বস্তুর নাম শিক্ষা দিয়েছিলেন। (বাকারাহ- ৩২)

অসংখ্য ভাষাবিজ্ঞানীর সঙ্গে গ্রিক-দার্শনিক প্লেটো এ মতই পোষণ করেছেন। ইসলামে ভাষা মানুষের জন্মগত মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। ভাষা লালন, চর্চা ও সমৃদ্ধি সাধন করা মুসলিমদের ধর্মীয় দায়িত্ব। আরবিতে কোরআন নাজিলের পূর্ব পর্যন্ত আরবি ছিল কথ্যভাষা। কতক সভাবকবি ও পদাবলী রচয়িতার কিছু অবদান ছাড়া কোনো সাহিত্য আরবিতে ছিল না। কোরআনকে ধারণ করার পর আরবি তদানীন্তন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সমৃদ্ধশালী ভাষায় পরিণত হল। শুধু প্রচলিত বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞান তার মধ্যে স্থান পেল তাই নয় বরং অনেক নতুন নতুন বিষয়ের জন্ম হল। এভাবে আরবির মাধ্যমে সূচিত হল এক নব উদ্দীপনা। আল কোরআনের কারণে আরবি কেবল আরব ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ না থেকে সমগ্র বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাষায় পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে সমাদৃত হয়। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ আরবিকে মুসলিমদের কওমি জবান বলেছেন। ভাষার প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে আরবি কালজয়ী হয়েছে এবং সভ্যতা ও সংস্কৃতির বাহন হয়েছে। যেখানেই ইসলাম বিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেখানেই স্থানীয় ভাষা মুসলিমদের হাতে বিকশিত হয়ে সমৃদ্ধিশালী হয়েছে। এ কথা মানতেই হবে, আরবির প্রতি ভালোবাসা প্রত্যেক ঈমানদারের ঈমানি দায়িত্ব। তবে কোরআন সুন্নাহ থেকে আরবির মাধ্যমে যে জ্ঞান-বিজ্ঞান, সভ্যতা সংস্কৃতি, নির্দেশাবলী অর্জন করা হবে, তা মাতৃভাষায় স্বজাতির কাছে উপস্থাপন করাও অপরিহার্য। কালামে পাকে মাতৃভাষা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘স্বজাতির ভাষা ছাড়া আমি কোনো রাসূল প্রেরণ করিনি যাতে সে তাদের কাছে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করতে পারে’ (সূরা ইবরাহিম-৪) ‘রাসূল প্রেরণ না করে আমি কোনো জনগোষ্ঠীকে শাস্তি দেই না।’ (সূরা আল ইমরান)

মানুষের মাঝে আল্লার বাণী পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব রাসূলদের। তারা তাদের লোকদের কাছে তাদের বোধগম্য ভাষায় আল্লাহর বাণী পৌঁছিয়েছেন। কেউ শুনেছে ও সেভাবে আমল করেছে, আবার অনেকে অমান্য করেছে অবাধ্য হয়েছে। কিন্তু নবী-রাসূলরা তাদের কাছে ভাষা নির্দেশ পৌঁছানো পর্যন্ত তারা মুক্ত। তাই ভাষা শুধু অর্থজ্ঞাপক কতিপয় বাক্যসমষ্টিই নয়; বরং উপলব্ধি, বক্তব্য, আদেশ, নিষেধ ইত্যাদি প্রকাশের মাধ্যম ও বাহন। রিসালাতের দায়িত্ব পালনের জন্য আল্লাহ মাতৃভাষাকে অপরিহার্য করেছেন। মৌলিকভাবে আল্লাহর বাণী সর্বকালের, সব স্থানের ও সব মানুষের জন্য এক ও অভিন্ন। তার কালাম পবিত্র ও স্থায়ী।

আল্লাহতায়ালা দাউদ (আ.) কে জাবুর কিতাব দিয়েছিলেন। যেহেতু তার লোকেরা ইউনানি ভাষায় কথা বলত তাই তার প্রতি নাজিলকৃত কিতাব ইউনানি ভাষায় ছিল। মূসা (আ.) কে ইসরাইলদের ভাষায় হিব্রুতে তাওরাত দেয়া হয়েছিল।

ঈসা (আ.) কে সুরিয়ানি ভাষায় ইঞ্জিল দেয়া হয়েছিল। আরবি ভাষাভাষীদের মধ্যে প্রেরিত হন মুহাম্মদ (সা.)। তাই তাকে আল কোরআন আরবি ভাষায় দেয়া হয়। যদিও তিনি সর্বকালের ও সর্বস্তরের জন্য, তবুও তার মাতৃভাষায় আল্লাহর কালাম এ জন্য নাজিল করা হয় যাতে তিনি তার সমকালীন লোকদের তাদের বোধগম্য ভাষায় আল্লাহর বাণী পৌঁছে দিতে পারেন।

আরবি ভাষাভাষীদের কাছে মহাগ্রন্থ কোরআনকে রাসূল (সা.) অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ ও প্রচার করেন। যখন অনারবদের কাছে সাহাবায়ে কেরাম কোরআন নিয়ে উপস্থিত হন তখন তারা স্থানীয় লোকদের ভাষায় কোরআনের মর্ম পেশ করেন। কেননা কোরআন অনুসরণের জন্য যদি কেউ না বোঝে, তার পক্ষে অনুসরণ সম্ভব নয়। অতএব, যারা বর্তমানের কোরআন সুন্নাহর প্রকাশ ও প্রচার কাজে নিয়োজিত, ইলমে দ্বীনের খিদমতে যারা আত্মসমর্পিত তাদের সঠিকভাবে বিষয়টি বুঝতে হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ ছাত্র সমাজ, তরুণ, যুবক ও সাধারণ জনগোষ্ঠীর কাছে যদি কালামে এলাহির জ্ঞান পৌঁছানোর প্রয়োজনিয়তা থাকে তা হলে তা কোন ভাষায়? সর্বস্তরের ছাত্র জনতা তো উর্দু, ফার্সি, আরবি সাহিত্য বোঝে না। তাদের কাছে ইসলামের সাহিত্যকে, কোরআনের সাহিত্যকে তাদের বোঝার ভাষায় প্রচার করতে হবে। এ জন্য দ্বীনের বাহকদের মাতৃভাষায় প্রথমে নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। তারপর কোরআনের জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সভ্যতা স্বজাতির সম্মুখে তুলে ধরতে হবে। বাংলা চর্চার মাধ্যমে গোটা সমাজকে আল কোরআনের আলোকে উদ্ভাসিত করা জরুরি। যে জাতির তরুণ-যুবকরা নানারকম প্রেম কাহিনী, যৌন উদ্দীপক বিভিন্ন ম্যাগাজিনে সাহিত্য খুঁজে বেড়াচ্ছে, সে জাতির সামনে যদি ইসলামী সাহিত্যকে বাংলা সাহিত্যের মাধ্যমে পেশ করতে ব্যর্থ হয় তবে আমাদের গৌরবগাথা ঐতিহ্য, সভ্যতা-সংস্কৃতির ধ্বংস অনিবার্য।

কেউ যদি এজন্য বাংলাভাষা চর্চা করে যে, আমি বাংলাভাষায় বিশুদ্ধতা অর্জন করে, কবিতা রচনা করে, আর্টিক্যাল রচনা করে ইসলামী সাহিত্য সৃষ্টি করে এ দেশের মানুষকে ধর্মীয় ভাবধারা সম্পন্ন করব, তখন বাংলাভাষা চর্চা করা তার জন্য অবশ্যই ইবাদতে গণ্য হবে। আল্লাহর নবী (সা.) নিজের মাতৃভাষাকে বিশুদ্ধ ভাষায় জানতেন আমিও মায়ের ভাষাকে বিশুদ্ধ জানব। এই হোক আজকের আলেম সমাজের প্রত্যাশা।

লেখক : প্রাবন্ধিক

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter