খোদা প্রেমের কোরবানি এবং আমাদের কোরবানি

  মঈন চিশতী ০২ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

খোদাপ্রেম

‘লাইয়্যানালাল্লাহা লুহুমুহা ওয়ালা দিমাউহা ওয়ালাকিন ইয়ানালুহুত তাকওয়া মিনকুম। আল্লাহ বলেন, কোরবানির পশুর রক্ত-মাংস কিছুই আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া বা কোরবানির বিশুদ্ধতা। কোরবানি শব্দের অর্থই হল নিকটবর্তী করে দেয়া।

আসুন দেখি ইবরাহিম (আ.)-এর কোরবানির চেতনা কী ছিল। আর বর্তমানে কোন চেতনায় কোরবানি দিচ্ছি। ইবরাহিমি চেতনা ছিল ‘ইন্না সালাতি, আমার নামাজ ওয়া নুসুকি আমার কোরবানি, ওয়া মাহ্ইয়ায়া, আমার জীবন, ওয়া মামাতি, আমার মৃত্যু, লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন, সব জাহানের প্রতিপালকের জন্য’। কিন্তু এখন আমরা কোন চেতনায় নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত আর কোরবানি করছি? চক্ষু বন্ধ করে ভাবুন এর জবাব পেয়ে যাবেন।

উত্তরবঙ্গের অর্ধেকের বেশি বন্যায় তলিয়ে গেছে। এ অবস্থায় আমাদের আলেম-ওলামা-আমলা সুধীজনরা রাষ্ট্রীয় টাকায় প্রায় ৪০০ জনের বহর নিয়ে হজ তদারকির জন্য সৌদি যাচ্ছেন। এ রাষ্ট্রীয় হজযাত্রায় রাষ্ট্রীয় কোষাগারের প্রায় ২০ কোটি টাকা খরচ হবে। জরুরি প্রয়োজনে ফরজ ইবাদতও ছাড় দেয়ার হুকুম আছে। সেখানে তারা যাচ্ছেন হাজীদের সেবার নামে নফল হজে। এ ডিজিটাল যুগে হাজী হজ এজেন্সির পেছনে পেছনে ঘুরে তদারকি করতে হবে তা আমাদের বুঝে আসে না।

হজযাত্রীদের সেবায় আমলারা যত কম যাবেন হাজীদের সেবার মান তত বেড়ে যাবে। কারণ সৌদিতে বসবাসরত আমাদের কর্মচারীরা এ আমলাদের নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকেন এটাই আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রী লন্ডনে চিকিৎসারত থেকে জরুরি ফাইলে ডিজিটাল সাইন করতে পারলে হজে দায়িত্বরত কর্তৃপক্ষের বাইরে অন্যদের যেতে হবে কেন? মূলত এখানে ভিন্ন উদ্দেশ্য আছে। বড় বড় গরু-মহিষ কোরবানির বিষয়টাও তেমনি। এখানে ইবাদতের চেয়ে সামাজিক স্ট্যাটাসকে প্রাধান্য দেয়া হয়। বাজারে গিয়েই আগে দেখা হয় কোন গরুতে গোশত বেশি হবে বা কোনটা কিনলে পাড়াময় নাম ছড়িয়ে পড়বে।

অথচ আমাদের ওয়াজিবটুকু আদায়ের জন্য বড় গরুর প্রয়োজন নেই; একটি খাশি বা ছোট একটি গরু কোরবানি দিয়ে ওয়াজিব আদায় করে বাকি টাকাগুলো আর্তমানবতার সেবায় ব্যয় করলে আরও বেশি আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়া যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস। যেহেতু কোরবানি শব্দের সঙ্গে নিকটবর্তী হওয়া জড়িত।

আমরা আজ কোরবানিকে আত্মোৎসর্গের উৎসব নয়, একটি সামাজিক উৎসবের আমেজে পালন করে থাকি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোরবানি মাংস খাওয়ার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। সমাজে কোরবানি নিয়ে আলোচনা হলে প্রায়ই শোনা যাবে, কে কার চেয়ে দামি কোরবানি দিয়েছে। কার গরুতে কত মণ মাংস হয়েছে। কিংবা আগামী কয় মাস আর মাংস কিনতে হবে না।

আমাদের একশ্রেণির আলেমরাও কোরবানির পশুর দাঁত, শিং আর লেজ কেমন হবে খুতবায় এ বয়ান করতে করতেই জীবন পার করে দিচ্ছেন। কোরবানির আসল হাকিকত ও তাৎপর্য ব্যাখা না করে ফজিলতের বয়ান এমনভাবে করেন যাতে হারাম মাল দিয়ে কোরবানিদাতারাও চরম আত্মতৃপ্তি লাভ করে হারাম থেকে বেঁচে থাকার তাগিদ অনুভব করেন না।

যেমন কোরবানির পশুর গায়ে যত লোম আছে কোরবানিদাতার আমলনামায় তত নেকি লেখা হবে। এসব ফজিলতের হিসাব-নিকাশের আড়ালে কোরবানির আসল শিক্ষা সমাজ থেকে হারিয়ে গেছে। যে কোনো আমলের ফজিলতের মহত্ত্ব অবশ্যই আছে, তবে কোরবানির মূল উদ্দেশ্য এবং শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে ফজিলত বর্ণনা করা উচিত, যাতে মানুষের আত্মসংশোধন সহজ হয়।

ওয়া তারাকনা আলাইহে ফিল আখেরিন। আল্লাহ বলেন, ‘দৃষ্টান্ত রেখে দিলাম পরের প্রজন্মের জন্য’ অর্থাৎ নবী ইবরাহিমের (আ.) ত্যাগের শিক্ষায় যেন তার পরবর্তী প্রজন্ম উদ্বুদ্ধ হয়ে আত্মত্যাগ করে নিজেদের জানমাল আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করতে পারে। আল্লাহ বলেন, ‘লান তানালুল বিররা হাত্তা তুন ফিক্বু মিম্মা তুহিব্বুন। তোমরা ততক্ষণ কল্যাণ লাভ করবে না যতক্ষণ না তোমাদের প্রিয় বস্তু আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করবে’।

এখানে কোরবানির ঘটনার মাধ্যমে এ দৃষ্টান্ত স্থাপিত হল যে নবী ইবরাহিম (আ.) পার্থিব সবকিছু থেকে এমনকি নিজের সন্তানের জীবনের চেয়েও আল্লাহর হুকুমকে প্রাধান্য দিয়ে আল্লাহতায়ালার হুকুমের কাছে নিজ এবং সন্তানের জীবন তুচ্ছ করে দিলেন। তিনি নিজের সন্তানকে কোরবানি দিতে গিয়ে কোন দ্বিধাদ্বন্দ্ব বা ইতস্তত বোধ করেননি কিংবা কোনো অজুহাতও তুলে ধরেননি।

তিনি ইচ্ছা করলে বলতে পারতেন, আল্লাহ! আমার পরিণত বয়সের একমাত্র সন্তানকে তুমি এমন কঠোর আদেশ থেকে অব্যাহতি দিয়ে আমাকে ক্ষমা কর, কিংবা হে দয়াময় মাবুদ তোমার দ্বীন প্রচারের জন্য ছেলে চেয়েছিলাম, তোমার দ্বীনের কাজের জন্য এ ছেলেটাকে বেঁচে থাকতে দাও, কিংবা যেহেতু তিনি বিষয়টি স্বপ্নে দেখেছেন, তাই স্বপ্নের ওপর ভিত্তি করেই সন্তান কোরবানি করা উচিত হবে কিনা, কিংবা স্বপ্নের ব্যাখ্যা ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে সন্তান কোরবানি করা থেকে বিরত থাকার পথ খুঁজতে পারতেন। তিনি এ রকম কোনো অজুহাত না তুলে আল্লাহর হুকুমের কাছে সন্তানের জীবনকে উৎসর্গ করে দিলেন।

কারণ তিনি জানতেন ইন্নামা আমওয়ালুকুম ওয়া আওলাদুকুম ফিতনাতুন ওয়াল্লাহু ইন্দাহু আজরুন আজীম। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের ধনসম্পদ এবং সন্তানসন্তুতি কেবল পরীক্ষাস্বরূপ; আর আল্লাহর কাছে রয়েছে মহাপুরস্কার’।

নবী ইবরাহিম (আ.) সে পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হলেন। মূলত তার প্রকৃত ওয়ারিশ মুসলিমদের জন্য এটা আল্লাহ উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে স্থাপন করে রেখেছেন। যাতে তারা সব অবস্থায় নিজেদের জানমাল, সন্তানসন্তুতি সবকিছু আল্লাহর হুকুমে বিলিয়ে দিতে পারেন। আমাদের উচিত মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহিম (আ.)-এর পথ অনুসরণ করে তার সুন্নাহ কোরবানিকে ধরে রাখা। আল্লাহ আমাদের যথাযথভাবে কোরবানি করার তৌফিক দান করুন।

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×