গরিব দুঃখী টাকা চাইলে ভাংতি নাই

  জামাল আস-সাবেত ২৩ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কত ব্যথা নিয়ে কতশত কষ্ট নিয়ে পথে পথে ঘুরি/ কেউ তো বলেনি ঈদ মোবারক ভাই/ কেমন কাটল দিনগুলো?

জীবনে কত ঈদ এলো-গেল; রঙিন কাপড় পরে ঈদের মাঠে হাজির হয়েছি। মাওলানা সাহেবের বয়ান শুনেছি, ঈদ সাম্যের। ঈদ আনন্দের। ঈদ ধনী-গরিবের। ঈদ কাঁধে কাঁধ মেলানোর। মুখে হাসি ফুটানোর ইত্যাদি। আরও কত ধরনের সুন্দর সুন্দর বুলি!

বড় সাধ জাগে একবার জিজ্ঞাসা করি, হুজুর! আপনি কি কখনও কোনো গরিবের সঙ্গে কোলাকোলি করেছেন? বলেছেন কি, আসো কায়সার বুকে আসো। আসো কালু মিয়া বুকে আসো। আজ তোমাকে ঈদের শুভেচ্ছা, ঈদ মোবারক। বিশ্বাস করি, যদি আপনি এই কাজটি শুরু করতেন, তাহলে সমাজের বাকি লোকগুলোও গরিবের সঙ্গে বুক জড়াতেন। ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন। কথাগুলোর আমল শুরু হয়ে যেত বহু আগেই। কিন্তু এই দৃশ্য দেখার দিন যে কতদূর কে জানে!

মুখের বুলি বাতাসে ওড়ে, বুকে কখনও লাগে না হায়!/ কখনও গরিবের দুঃখ বুঝিনি; সীমাবদ্ধ কেবল জাকাত ফেতরায়।

মফস্বলের ঈদগাহেও দেখি গরিব লোকটি ত্রস্ত হয়ে থাকে। মুখের ছায়া যেন অসহায়, গোটা ময়দানজুড়ে এই দৃশ্য। মুখে হাসির রেখা ফুটে না, ঈদের আনন্দ ছুঁয়ে যায় না তার হৃদয়ে। এই বিভাজনের দৃশ্য দেখে জাগ্রত হৃদয় কখনও স্থির থাকতে পারে না। ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে না। খণ্ডিত আনন্দে কখনও বুক ভরে না। কখনও চিন্তা করি না, গরিবের চোখের ভাষা কী। কখনও ভাবি না তারা কী চায়। বছর শেষে দু’টো ঈদেও তাদের বুকে জড়িয়ে আনন্দ দিতে পারি না। ঈদের দিনেও জামাত শেষে গরিব লোকটির চোখেমুখে করুণ দৃষ্টি থাকে! তিনি যেন সমাজের কেউ নন! এ সমাজ থেকে যেন এক বিচ্ছিন্ন কেউ! তাকে বুকে জড়ানোর যেন কেউ নেই! কে জানে তার সঙ্গে মোলাকাত করলে আবার মানসম্মান ডুবে যায় কিনা! পাছে কে কি বলে বেড়ায়!

‘মুসলিম মুসলিম ভাই ভাই/ উঁচু নিচুর জায়গা নাই/ জাত-পাতের বালাই নাই/ আমরা সবাই মানুষ ভাই।

সাম্যের ধর্ম ইসলামের এই শিক্ষা সত্যিই কি আমাদের চেতনা জাগ্রত করে? যদি জাগ্রত করেই থাকে তাহলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় এরকম বৈষম্য ও অচ্ছুত চেতনা দেখা যায় কেন? এটা তো সত্য ধর্মের শিক্ষা হতে পারে না। শুধু তাই নয়, আমাদের সমাজের অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, পাশের লোক ভাতের অভাবে না খেয়ে থাকে আর আমি মসজিদ-মন্দিরে রংচং লাগিয়ে বেহেশতের আশা করি! মুক্তির আশা করি! খোদার তুষ্টি হয়েছে বলে শুকরিয়ার ঢেঁকুর তুলি!

জানি না, এসব কোন কিতাবে লেখা আছে। যদি এ কথা কোনো কিতাবে লেখাই থাকে তাহলে সে কিতাব আগুনে পোড়ানো হোক। ওই কিতাব শয়তানের বানানো; মাবুদের নয়।

বুভুক্ষায় মানুষ মরে আর তুমি ভাই মিনার গড়!?/ আশ্চর্য! মানুষের পেট থেকে কি মসজিদ মিনার বড়?/ যতসব মূর্খের দল! কোথায় পেল এ শিক্ষা? এ যে দেখি খান্নাসি মন।

ইসলামকে আমরা কেন গভীরভাবে জানতে চাই না? ঈদের জামাতে বা যে কোনো জামাতে যখন শরিক হই তখন কেন দেখব যে, পাশের লোকটি মনমরা হয়ে বসে আছে? কেন দেখব যে, তার মনে কোনো উচ্ছ্বাস নেই? কেন জানবার চেষ্টা করব না, এ ব্যক্তি কীভাবে দিন কাটায়? আমরা তার চোখের জল কেন মোছার চেষ্টা করি না। সৃষ্টির সেরা মানুষের দুঃখ মোচন না করে কি ধর্ম সঠিকভাবে পালন করা হয়?

কেন মুসলিম হয়ে অমুসলিমি ধ্যান করে আছ ভাই?/ তোমার কাঁধে যে ভার পড়েছে নামাজ দিয়েই কি তা শুধিতে চাও?/ যদি তাই হয়, তবে তোমার ধর্ম নাই; সমাজ নাই, বনবাসে যাও।

দলের ঊর্ধ্বে না উঠে এবং ধর্মকে সঠিকভাবে কাজে না লাগালে সমাজের অধঃপতন সুনিশ্চিত তা যুগযুগ ধরেই প্রমাণিত। গোঁড়ামি দূর করতে না পারলে কখনও এ সমাজ অন্ধকার থেকে আলোর পথ পাবে না।

ও হুজুর! তোমার ধর্ম কী/ তোমার কথায় কাজ হবে না/ যদি না তুমি সমাজ পরিবর্তন চাও/ যদি না তুমি দলের ঊর্ধ্বে উঠতে পার/

আগে মানুষ বাঁচাও পরে ধর্ম শুনাও/ তবেই ইসলাম হবে।

পাশের বাড়ির মানুষ যদি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীও হয় এবং তারা যদি অসুস্থ হয় তাদের সুস্থতার দেখভাল করতে হবে। যদিও সেদিন উৎসবের দিন থাকে।

ও মুসলিম ভাই! গরিব দুঃখী, বর্ণবৈষম্য, জাতপাতের ভেদাভেদ দূর করতেই তো ইসলামের আবির্ভাব। দলাদলিকে গলাগলিতে রূপ দিতেই তো ইসলামের অবতারণা। তবে, যুগযুগ ধরে সে ধর্মের লোকদের মাঝে কেন গরিব দুঃখী থাকবে? কেন দলাদলিকে বড় করে সমাজচ্যুত আচরণে প্রলুব্ধ করে নিজে পরিতৃপ্তের ঢেঁকুর তুলবে?

এ বড় আশ্চর্যের কথা ভাই!/ ধর্ম আছে মসজিদে, অন্তরেতে নাই।/ মুখে মুখে।

গরিব দুঃখীর কথা বলি/ সাম্য কোথাও নাই।/মারামারি রেষারেষি সবই আছে ভাই/ কেবল টুপিওয়ালা মুসল্লিদের অভাব দেখি নাই।/ গরিব দুঃখী টাকা চাইলে,/ কাম কর গে, ভাঙতি টাকা নাই।

আমাদের এসব অন্ধ ধ্যানধারণা দূর করতে হবে। পরিচ্ছন্ন করতে হবে আমাদের মানসিকতা। বছরজুড়ে যাতে সব মানুষ সুখে থাকতে পারে সে চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। বিশেষ করে, খতিব মাওলানারা এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারেন।

লেখক : কলামিস্ট

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×