উত্তম তারাই যারা তওবা করেন

  মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান ৩০ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন কেবল তার ইবাদত করার জন্য। তার আদেশ ও নিষেধগুলো জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে পালন করার জন্য। কিন্তু জীবনচলার পথে অনেক মানুষই তা ভুলে যান। শয়তানের কুমন্ত্রণা, প্রবৃত্তির অসৎ তাড়না, পরিবেশ ও সমাজের মন্দ প্রভাবসহ নানা কারণে আল্লাহর কথা অমান্য করেন।

কিছু মানুষ আল্লাহর আদেশ নিষেধ মান্য করেই জীবন অতিবাহিত করেন। তারা আল্লাহকে ভয় করেন। কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করেন না। তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, ‘প্রতিপালকের কাছে উপস্থিত হতে ভয় করে এবং কুপ্রবৃত্তি থেকে নিজেকে বিরত রাখে, জান্নাতই হবে তার আবাস।’ (সূরা নাজিয়াত আয়াত ৪০-৪১)।

তবে কোনো মানুষ যে ভুল করবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ প্রকৃতিগতভাবেই মানুষ দুর্বল এবং বিপরীত বা মন্দ কর্মের প্রতি আসক্ত। কোরআনে এসেছে, ‘নিশ্চয়ই মানব মন মন্দকর্ম প্রবণ।’ (সূরা ইউসুফ, আয়াত : ৫৩)। হাদিসে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক আদম সন্তান ত্রুটিশীল ও অপরাধী, আর অপরাধীদের মধ্যে উত্তম তারা যারা তওবা করে।’ (তিরমিজি)।

মানুষের অপরাধ হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু মানুষের কর্তব্য হল পাপের জন্য সঙ্গে সঙ্গে তওবা করে নেয়া।

তা ছাড়া গুনাহ বা অপরাধ করা হোক আর নাই হোক গোলাম (বান্দা) তার মনিবের (আল্লাহর) কাছে সব সময় শির নত করে থাকবে এটাই সাধারণ ও স্বাভাবিক নিয়ম। আল্লাহর প্রিয় বান্দারা তওবার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আরও প্রিয় হতে পারেন। তা ছাড়া তওবা করা নবীর (সা.) দেখানো ও শেখানো সুন্নত। কেননা বিশ্বনবী (সা.) নিষ্পাপ হওয়া সত্ত্বেও শুধু শোকরগুজারের জন্য দিনে শতবার পর্যন্ত তওবা করেছেন তিনি। রাসূল (সা.) বলেন, আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং দৈনিক সত্তরের অধিকবার আল্লাহর কাছে তওবা করি।’ (বুখারি)। অন্য হাদিসে রাসূল (সা.) আরও বলেছেন, ‘হে লোক সকল! তোমরা আল্লাহর দরবারে তওবা কর এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর; আমিও প্রতিদিন একশবার তওবা করি।’ (বুখারি)।

যে কোনো অপরাধ যদি হয় নিরাশ না হয়ে আল্লাহর দয়া ও রহমতের আশায় তওবা করে আল্লাহর পথে ফিরে এলেই দয়ালু আল্লাহ ক্ষমা করে দেবেন।

কোনো অপরাধ যদি হয় মানুষের হক নষ্ট সম্পর্কিত এ ক্ষেত্রে শুধু আল্লাহর কাছে তওবা করলেই হবে না বরং নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে মাফ চাইতে হবে। যদি ওই ব্যক্তি মাফ না করেন তবে আল্লাহও মাফ করবেন না। আর যদি ওই ব্যক্তি মাফ করে দেন তবে আল্লাহও মাফ করে দেবেন।

বান্দাকে অবশ্যই আল্লাহর নাফরমানি ও মানুষের হক নষ্টসহ যাবতীয় পাপাচার থেকে ফিরে আসতে হবে। আর যথাযথ প্রক্রিয়ায় বান্দা ফিরে এলে আল্লাহপাক সব গুনাহ মাফ করে দেবেন। যেমন আল্লাহপাক বলেন, ‘হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ; তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হইও না। নিশ্চয় আল্লাহ সব গোনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সূরা যুমার, আয়াত : ৫৩)।

আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে বনি আদম! তুমি যতক্ষণ আমাকে ডাকবে ও আমার আশা পোষণ করবে আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব। তোমার থেকে যা কিছুই প্রকাশ পাক, এতে আমি কোনো পরোয়া করি না। হে বনি আদম! তোমার গুনাহ যদি ঊর্ধ্ব আকাশ পর্যন্ত পৌঁছায়, আর তুমি আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব, এতে আমি সামান্য পরোয়া করি না। হে বনি আদম! তুমি যদি আমার কাছে দুনিয়া ভরা গুনাহ নিয়ে আস আর শিরকে লিপ্ত না হয়ে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ কর, আমি তোমার জন্য জমিন ভরা ক্ষমা নিয়ে উপস্থিত হব।’ (তিরমিজি)।

তওবা করলে আল্লাহতায়ালা বান্দার ওপর অত্যন্ত খুশি হন। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তওবায় আল্লাহতায়ালা এই পরিমাণ খুশি হোন যে, যেমন ধর তোমাদের কেউ গরম মরুভূমিতে উট গাছের ডালে বেঁধে ঘুমিয়ে পড়ল। সে উটের সঙ্গে তার খাদ্য-পানীয়সহ সব আসবাব ছিল। ঘুম থেকে জেগে দেখল তার উটটি আগের স্থানে নেই। এদিক ওদিক খুঁজে কোথাও পাওয়া গেল না। যখন সে একেবারে নিরাশ হয়ে গেল। তখনই দেখল তার উটটি যথাস্থানে রয়েছে। এমন মুহূর্তে সে ব্যক্তি যতটুকু খুশি হবে, কোনো বান্দা তওবা করলে আল্লাহতায়ালা তারচেয়ে বেশি খুশি হন।’ (মুসলিম)।

তওবা করে আল্লাহর পথে ফিরে এলে আল্লাহপাক কেবল গুনাহগুলোই মাফ করে দেন না, বরং আগের অপরাধগুলোকে সওয়াবে পরিণত করে দেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যারা তাওবা করে, ইমান আনে এবং ভালো কাজ করে, আল্লাহতায়ালা তাদের খারাপ কাজগুলোকে ভালো কাজে পরিণত করে দেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর যারা তওবা করে এবং নেক কাজ করে আল্লাহর প্রতি তাদের তাওবা-ই সত্যিকারের তাওবা।’ (সূরা ফুরকান, আয়াত : ৭০-৭১)।

তওবাকারীকে আল্লাহপাক জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আশা করা যায় তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ (তওবার বদৌলতে) মোচন করবেন এবং তোমাদেরকে এমন জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত।’ (সূরা তাহরিম, আয়াত : ৮)।

কেবল মুখেমুখে তওবা বললে বা করলেই হবে না; বরং তওবা করতে হবে একনিষ্ঠভাবে। কেননা আল্লাহতায়ালার নির্দেশ হল, ‘হে ইমানদার! তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি মনে তওবা (তওবাতুন নাসুহা) কর। (সূরা তাহরিম, আয়াত : ৮)।

পাপের রাস্তা থেকে চিরদিনের জন্য মনে-প্রাণে ফিরে আসতে হবে। অনুতপ্ত হয়ে অন্যায়কে ঘৃণা করে ন্যায়ের ওপর থাকতে হবে।

সুতরাং তওবার জন, কোনো ক্ষণ, দিন, সপ্তাহ, মাস বা বছরের অপেক্ষা করা যাবে না। অপরাধবোধ হলেই তওবা করে আল্লাহর পথে ফিরে আসতে হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাবি

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×