সত্যের দিশারি রক্তাক্ত কারবালা

  সৈয়্যেদ নূরে আখতার হোসাইন ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কারবালা ময়দানের প্রতীকি ছবি।
কারবালা ময়দানের প্রতীকি ছবি।

ঐতিহাসিক কারবালা সত্যের দিশারি হয়ে মুমিন-মুসলিমের অন্তরে আজো জাগ্রত। কেয়ামত পর্যন্ত অন্যায়-অসত্যের বিরুদ্ধে কারবালার আদর্শ আত্মত্যাগের প্রেরণা হয়ে থাকবে। রাসূল (সা.)-এর অন্তর্ধানের প্রায় ৫০ বছর পর ৬১ হিজরিতে ঘটে যাওয়া কারবালার ঘটনাবলী কোরআন-হাদিসে বিশদভাবে না আসায় অনেকে ততটা গুরুত্ব দিতে চান না, কিন্তু তাদের জানা উচিত ইমানের প্রশ্নে কারবালার আদর্শ ও শিক্ষা মুসলিম জীবনে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে, যা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই।

কী ঘটেছিল কারবালায়? নামধারী মুসলমান ইয়াজিদ বাহিনীর ২২ হাজার সৈন্যের বিরুদ্ধে হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) ৭২ জন সঙ্গীসহ প্রাণ বিসর্জন দিলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নত না করে ইমানি দায়িত্ব পালন করলেন। জীবনের শেষ রক্তবিন্দু ইসলাম বৃক্ষের মূলে ঢেলে বৃক্ষটিকে চির সজীব রাখার জন্য চেষ্টা করলেন। রাসূল (সা.)-এর পরিবারের ১৮ জন সদস্যকে নির্মমভাবে খুন করা হল। যাদের মধ্যে ছিলেন হজরত হোসাইন (রা.)-এর ২ পুত্র, হজরত হাসান (রা.)-এর ৩ পুত্র, হজরত আলী (রা.)-এর ৩ পুত্রসহ অনেক শিশু সদস্য।

কী উদ্দেশ্য ছিল ঘাতকদের? একচ্ছত্র ক্ষমতা কুক্ষিগত করা ও ক্ষমতা চিরস্থায়ী করা। যা সুপরিকল্পিতভাবেই করা হয়েছিল। রাসূল (সা.)-এর বংশধরদের নিশ্চিহ্ন করতে পারলেই তাদের মসনদ নিরাপদ হবে মনে করেই এ ধরনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। যে কারণে রাসূল (সা.)-এর পরিবারের শিশুদেরও তারা হত্যা করতে কুণ্ঠিত হয়নি।

কে ছিলেন হজরত হোসাইন (রা.)? প্রথমত তিনি ছিলেন রাসূল (সা.)-এর প্রিয়তম নাতি। মা ফাতিমা ও হজরত আলী (রা.)-এর কলিজার টুকরা। তিনি হলেন বেহেশতি যুবকদের সর্দার। রাসূল (সা.)-এর সঙ্গে তার ভালোবাসার বহু ঘটনা হাদিস গ্রন্থগুলোয় বর্ণিত হয়েছে। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যে এ দুজনকে (হাসান ও হোসাইন) মুহব্বত করল, সে আমাকে মুহব্বত করল। আর যে এদের সঙ্গে দুশমনি করল, সে আমার সঙ্গে দুশমনি করল।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘আমি হোসাইন থেকে এবং হোসাইন আমার থেকে। আল্লাহ পাক তাদের ভালোবাসেন, যারা হোসাইনকে ভালোবাসে। ’

বেহেশতবাসীদের সর্দারকে হত্যা করে যারা মুসলমানিত্ব দাবি করে ও বেহেশত লাভের প্রত্যাশা করে তাদের চেয়ে বড় আহমক আর কে আছে? যারা হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর পবিত্র মস্তক ছিন্ন করতে বিলম্ব হওয়ার কারণে বলেছিল, তাড়াতাড়ি কার্য সমাধা কর, আসরের ওয়াক্ত কাজা হয়ে যাচ্ছে।

তারা কারা? তাদের নেতৃত্বে ছিল মুয়াবিয়া পুত্র ইয়াজিদ ও তাদের দোসররা। নিজেদের হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে তারা ইতিহাসের জঘন্যতম ঘটনার খলনায়ক হয়েছে। রাসূল পাক (সা.)-এর আদর, ভালোবাসা, মহব্বত উপেক্ষা করে, কোরআন-হাদিসের নির্দেশ ভূলুণ্ঠিত করে, মানবতা ও মনুষ্যত্ববোধ বিসর্জন দিয়ে তারা মুসলিম অন্তরের ভালোবাসাকে রক্তে রঞ্জিত করেছে। আর অন্তস্থলে দগদগে অগ্নিকুণ্ড জ্বালিয়েছে যা কোনো দিনও নিভে যাওয়ার নয়।

ইয়াজিদ তার প্রতিনিধি ইবনে জিয়াদকে কী নির্দেশ দিয়েছিল তা অপ্রকাশিত। কিন্তু ইবনে জিয়াদ যে ঘৃণ্য-জঘন্য কাজ করেছিল তাতে ইয়াজিদের পূর্ণ সমর্থন ছিল, তা তার পরবর্তী কার্যক্রমে প্রকাশ পেয়েছিল। কারবালার ঘটনা শুনে ইয়াজিদ অনুতপ্ত মনে দুঃখ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু সেসবই ছিল ভণিতাপূর্ণ। মুখে একরকম বললেও কাজ করেছিল বিপরীত। সে শহীদগণের মস্তক মোবারকগুলোকে রাতে রাষ্ট্রীয় ভবনের শাহি দরজায় টাঙ্গানোর জন্য এবং দিনে দামেস্কের অলি-গলিতে ঘুরানোর নির্দেশ দিয়েছিল। তার নির্দেশ মতো মস্তক মোবারক দামেস্কের অলি-গলিতে ঘুরানো হয়েছিল। এতে প্রমাণিত হয়েছে, ইয়াজিদ ভণিতাপূর্ণ দরদমাখা কথাবার্তা বলেছিল, যাতে লোকজন তার বিরুদ্ধে চলে না যায় এবং লোকেরা যেন মনে করে, সে এ ধরনের আচরণ করার পক্ষপাতি ছিল না। কিন্তু ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিশ্লেষণ করলে এটি পরিষ্কার হয়ে যায়, হজরত আলী (রা.)-এর ইন্তেকালের পর হজরত ইমাম হাসান (রা.) কে বিষপানে শহীদ করা, কারবালার প্রান্তরে হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) ও রাসূল (সা.)-এর পরিবারের প্রায় সব সদস্যকে নিঃসংকোচে হত্যা করা সবই অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে করা হয়েছিল।

ইয়াজিদ ও তার অনুসারীরা কেমন মুসলমান ছিল তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের প্রয়োজন পড়ে না। কর্মই তাদের পরিচয় পরিষ্কার করে দিয়েছে। মুয়াবিয়ার পিতা আবু সুফিয়ান সারা জীবন রাসূল (সা.)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল এবং মক্কা বিজয়ের পর যখন দলে দলে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিল তখন তিনি ও মুয়াবিয়া ইসলাম গ্রহণ করেন। আর মুয়াবিয়ার মা হিন্দা রাসূল (সা.)-এর চাচা হজরত আমির হামজার হৃৎপিণ্ড কাঁচা চিবিয়ে খেয়েছিল। সুতরাং তাদের ইমান তো ওই পর্যন্ত, যা নামমাত্র মুসলমান স্তরে পৌঁছতে পেরেছিল কিনা প্রশ্ন সাপেক্ষ। তাই তো ইমাম হোসাইন (রা.) জীবনের অন্তিমলগ্নে ইয়াজিদের সৈন্যদের উদ্দেশে বলেছিলেন, আমাকে হত্যা করলে আল্লাহর কাছে কী জবাব দেবে? কী জবাব দেবে বিচার দিবসে রাসূল (সা.)-এর কাছে? তোমাদের মাঝে কি একজন মুসলমানও নেই?

বর্তমানেও একশ্রেণির মুসলিম দেখা যায়, যারা ইয়াজিদের পক্ষে সাফাই গায়। তাদের অনেকেই বলতে চায়, কারবালার ঘটনা সম্পর্কে রাসূল (সা.) আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তাই ইয়াজিদ এ ঘটনার জন্য দায়ী ছিল না। আবার অনেকেই বলতে চায়, ইয়াজিদের পিতা রাসূল (সা.)-এর সাহাবি ছিলেন। সাহাবিদের প্রতি দোষারোপ করা যাবে না। এ রকম নানা অসংলগ্ন কথাবার্তার মাধ্যমে ইয়াজিদের পক্ষাবলম্বনের পাশাপাশি কোরআন-হাদিসবহির্ভূত বিষয় ইমানের অন্তর্ভুক্ত নয় বলে কারবালার ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে চায়।

তাদের জানা উচিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, আমি আমার পরে দুটি মূল্যবান জিনিস রেখে যাচ্ছি, প্রথমটি হল আল-কোরআন, দ্বিতীয়টি আমার ‘আহলে বায়েত’। আল্লাহর কোরআন ও আমার আহলে বায়েত একে অপর থেকে কখনও বিচ্ছিন্ন হবে না। যারা এ দুটি জিনিসকে আঁকড়ে থাকবে, তারা কেয়ামতের দিন হাউজে কাউসারে আমার সঙ্গে মিলিত হবে এবং এ দু’বস্তু থেকে দূরে থাকলে ধ্বংস হয়ে যাবে।

হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর মস্তকহীন শরীর মোবারক ইরাকে কারবালার কুফায় দাফন করা হয়েছিল। আর মস্তক মোবারক যথামর্যাদায় সমাহিত করার জন্য প্রথমে কুফা থেকে দামেস্ক এবং এমনিভাবে বিভিন্ন স্থান প্রদক্ষিণের পর ভূমধ্যসাগরের তীরে ফিলিস্তিনের আস্কালান নামক স্থানে দাফন করা হয়। সেখান থেকে ১০ জমাদিউল আখের ৫৪৮ হিজরিতে কায়রোতে প্রখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের মাঠে পুনঃসমাহিত করা হয়। পরবর্তীতে মাজারের ওপর গম্বুজ এবং মাজার সংলগ্ন বিশাল এক হোসাইনি মসজিদ নির্মাণ করা হয়।

বিশ্বময় ইয়াজিদের দোসরদের তৎপরতা থাকলেও রাসূল (সা.)-এর প্রেমিকরা ও সত্যপন্থী ওলামা-মাশায়েখরা শুধু মহররম মাসে নয় সমগ্র জীবনব্যাপী হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর সঙ্গে একাত্ম হয়ে কারবালার আদর্শ বাস্তবায়নে সচেষ্ট। আল্লাহ পাক সবাইকে আহলে বায়েতের ভালোবাসায় উদ্ভাসিত ও ইসলামের মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে হোসাইনি আদর্শ বাস্তবায়নে সচেষ্ট হওয়ার তৌফিক দান করুন। হ

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক ও প্রধান গদিনশীন পীর, দরবারে আউলিয়া সুরেশ্বর দ্বায়রা শরিফ

Email : [email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×