দেশে দেশে কারবালা পালন

  আল ফাতাহ মামুন ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কারবালা পালন

ইমাম হোসাইনকে নৃশংসভাবে হত্যার পর প্রতিবাদটুকু পর্যন্ত করতে দেয়নি আহলে বায়েত প্রেমিকদের। তখন হোসাইনপ্রেমিকরা কান্নাকে বেছে নিয়েছে প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে হোসাইনপ্রেমিকরা কাঁদত আর বুক চাপড়াত। হায় হোসাইন! হায় হোসাইন! বলে মাতম করত। এতটুকুও সহ্য হয়নি পাপীষ্ঠ এজিদের। নিষেধাজ্ঞা জারি করে হোসাইনের জন্য মাতম করার ওপর।

রে পাপীষ্ঠ এজিদ! আজো হোসাইনের জন্য মানুষ কাঁদে, অথচ তোর বিজয়ে তোর পক্ষের লোকেরাও হাসে না। এটাই কী তোর চরম পরাজয় নয়? এজিদ নেই, আছে এজিদের উত্তরসূরি। যুগে যুগে হোসাইনপ্রেমিকরাই তাদের টার্গেটে পরিণত হয়েছে। আজো যারা হোসাইনের জন্য কাঁদেন, এজিদের উত্তরসূরিরা নানাভাবে সে কান্নায় বাদসাধে। পাঠক! আসুন দেখে নিই দেশে দেশে হোসাইনপ্রেমিকদের কারবালা পালনের চিত্র।

ভারতের হিন্দুরাও তাজিয়া মিছিল এবং আশুরার রোজা পালন করেন : ভারতজুড়েই বেশ আড়ম্বরের সঙ্গে আশুরা উৎসব পালন করা হয়। শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে সব হোসাইনপ্রেমিক ১০ মহররম তাজিয়া মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। ইন্টারনেটে পাওয়া তথ্যমতে, এ দিন ভারতের স্কুল-কলেজ এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো ছুটি যাপন করে। দিল্লি-কেরালাসহ কিছু কিছু শহরে স্থানীয় হিন্দুরাও আশুরা উৎসব পালন করেন। টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়- আশুরা শিয়াদের প্রধান উৎসব হওয়া সত্ত্বেও ভারতের সুন্নি মুসলমান এবং ব্রাহ্মণ হিন্দুরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ উৎসবে অংশ নেন। ওই প্রতিবেদনে একজন ব্রাহ্মণের মন্তব্য উল্লেখ করা হয়। তিনি বলেন, ‘মুহাম্মদের নাতিকে নৃশংসভাবে হত্যার প্রতিবাদ জানাতেই আমরা তাজিয়া মিছিলে অংশ নিই।’ মজার ব্যাপার হল, খোদ ভারতের অনেক মুসলমানই হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের আশুরা উদযাপনের বিষয়টি জানেন না। তারা এও জানেন না, অনেক সনাতন ধর্মবলম্বী আশুরার সিয়াম পালন করেন। কেউ কেউ পুরো দশ দিনই রোজা রাখেন। অনেক হোসাইনপ্রেমিক হিন্দু ধর্মাবলম্বী জল স্পর্শ না করেই পুরো মহররম মাস কাটিয়ে দেন।

দুর্ভোগ মাথায় নিয়েই তাজিয়া মিছিল পাকিস্তানে : সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তানে অনেকটা কোণঠাসা জীবনযাপন করে শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলমানরা। বছরজুড়েই শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব এবং সন্ত্রাসী হামলার মেঘ আনাগোনা করে পাকিস্তানের আকাশে। পাকিস্তানের চরমপন্থী সুন্নিরা মনে করেন, শিয়াদের হত্যা করা বৈধ। আর মহররম এলে এ নৃশংসতা সীমা ছাড়িয়ে যায়। আত্মঘাতী হামলাসহ নানা দুর্ভোগ পোহাতে হয় হোসাইনপ্রেমিকদের। ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি করে জানা গেল, শত বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও অনেকটা বীরদর্পেই মহররম উৎসব করেন পাকিস্তানের আহলে বায়েতপ্রেমিকরা। অনেক জায়গায় তাজিয়া মিছিলের আগের দিনই রাস্তায় ঘুরে ঘুরে জানিয়ে দেয়া হয় মিছিলের কথা। এ সময় হোসাইনপ্রেমিকরা তাজিয়া মিছিলের মতোই ছুরি নিয়ে নিজেদের দেহে আঘাত করতে থাকে। এর তাৎপর্য অনেকটা এ রকম, তোমরা আমাদের রক্ত ঝরাতে চাও, অথচ হোসাইনের জন্য আমরা সেচ্ছায় জীবন পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত।

আফগানিস্তানে আতঙ্ক নিয়ে শুরু হয় তাজিয়া মিছিল : পাকিস্তানের পাশের দেশ আফগানিস্তান। এটিও সুন্নি অধ্যুষিত দেশ। তবে পাকিস্তানের তুলনায় সন্ত্রাসী হামলার পরিমাণ এখানে অনেক বেশি। সাধারণ সুন্নি মুসলমানরাও সন্ত্রাসী হামলার আতঙ্কে ততটস্থ থাকেন। আতঙ্ক নিয়েই আফগানিস্তানের রাজপথে এগিয়ে চলে তাজিয়া মিছিল। প্রায় বছরই তাজিয়া মিছিলে সন্ত্রাসী হামলা হয়ে থাকে। তবুও হোসাইনপ্রেমিকরা সত্য ও সন্ত্রাসবিরোধীর প্রতীক স্বরূপ তাজিয়া মিছিল করে থাকেন।

গত বছরের তাজিয়া মিছিলের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, আফগানিস্তানের হোসাইনপ্রেমিকরা ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিজেদের জর্জরিত করছে। স্থানীয় নেতা বলছেন, হামলার আতঙ্ক মাথায় নিয়েই আমরা মিছিল করি। পুলিশ সহযোগিতায় থাকে, তবে আমাদের আসল ভরসা আল্লাহর ওপর।

মিসরে আশুরার দিন আল হোসাইন মসজিদ বন্ধ করে দেয়া হয় : আশুরা উৎসব এবং তাজিয়া মিছিল করতে গিয়ে ব্যাপক বাধার মুখে পড়তে হয় প্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি মিসরের শিয়া মুসলমানদের। এখানের সুন্নি মুসলমানরা অতটা কট্টর না হলেও সালাফি মুসলমানরা ভয়ংকর অসহিষ্ণু। তারা কোনোভাবেই শিয়া মুসলমানদের সবচেয়ে বড় উৎসব আশুরাসহ কোনো ধরনের ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেবে না বলে শপথ নেয়।

তাজিয়া মিছিল শুরু হয়ে কায়রোর বিখ্যাত আল হোসাইন জামে মসজিদে এসে শেষ হওয়া দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। কিন্তু শেষ দশকে প্রচণ্ড বাধার মুখে এ ঐতিহ্য রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় মিসরের হোসাইনপ্রেমিকরা। আশুরার দিন পুলিশ প্রহরায় আল হোসাইন জামে মসজিদ বন্ধ করে দেয়া হয় বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং মিসরের পর্যটকদের লেখালেখি থেকে জানা যায়।

মরক্কোর ভিন্ন চিত্র : মহররমের প্রথম দিন থেকেই মরক্কোর চেহারা বদলে যেতে থাকে। এ যেন শিয়া-সুন্নি বিভেদহীন এক দেশ। যেন সাম্য-শান্তির অনন্য চিত্র। মহররম উপলক্ষে কোথাও অর্ধমাস কোথাও মাসজুড়ে সাংস্কৃতিক এবং শৈল্পিক মেলা চলে। চলে অনন্য সব সঙ্গীত উৎসব। সুন্নিরা মেলার সময়টুকু বেশ ফুরফুরে মেজাজে কাটান। ভালো খাবার, ঘুরতে যাওয়া, ফুর্তি করে বেড়ানোই যেন মরক্কোর মহররম। এক কথায় মহররম নতুন উদ্যমে জাগিয়ে তোলে মরক্কোর মুসলমানদের। শিয়া মুসলমানরা তাদের মতো করে জমকালো উৎসবের প্রস্তুতি নিতে থাকে। তারাও সুন্নিদের মেলায়, আনন্দানুষ্ঠানে অংশ নেয়, সুন্নি মুসলমানরাও শিয়াদের মিছিলে, শোকগাথায় স্বতঃস্ফূর্ত আসা-যাওয়া করে। হ

লেখক : মার্স্টাস ইন ইসলামিক স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Email : [email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×