হোসাইনি মাতম বিশ্বময় ছড়িয়ে দিচ্ছে সত্যের দাওয়াত

  আল ফাতাহ মামুন ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘হোসাইনকে কখনও মুছে ফেলা যায় না। কারণ হোসাইনকে মুছে ফেলা মানে মুহম্মাদকে মুছে ফেলা।’ পাশের জন বললেন, ‘মুহম্মাদকে মুছে ফেলা মানে তো কোরআন-আল্লাহ-ইসলামকেই মুছে ফেলা।’ তৃতীয়জন বললেন, কোরআনে আছে, ওরা চায় আল্লাহর নূরকে মুখের ফুঁয়ে উড়িয়ে দেবে, কিন্তু আল্লাহ তার নূরকে বিকশিত করবেনই। ইসলাম, মুহম্মাদ, হোসাইন এরা আল্লহর নূর। এদেরকে যত ফুঁ দিয়ে নেভাতে চাইবে, ততই বিকশিত হবে। ৭ মহররম সন্ধ্যায় হোসনি দালানের সামনে যেখানে কবরস্থান রয়েছে, সেখানে গোল হয়ে বসে কথা বলছিলেন তিন মধ্যবয়স্ক নারী। হোসনি দালানে ঢুকে প্রথমেই তাদের কথোপকথন শুনতে পেলাম। নারীদের আরও কয়েকটা ভাগ দেখলাম। সবাই সবার মতো করে শোক প্রকাশ করছে।

জানতে চাইলাম, খালাম্মা কোত্থেকে এসেছেন? যিনি বলছিলেন, ‘ইসলাম, মুহম্মাদ, হোসাইন এরা আল্লহর নূর...’ তিনি বললেন, ‘জুরাইন থেকে এসেছি বাবা।’ আমার বাসাও জুরাইন শুনে খুব খুশি হলেন। বললাম, ‘খালাম্মা! আপনারা কী প্রতি বছর এখানে আসেন?’ খালাম্মা বললেন, ‘ওনারা দু’জন ছোটবেলা থেকেই হোসনি দালানে আসেন। আমি আসছি তাও বছর বিশেক চলছে। ওনারা দু’জনই চিকিৎসক। আমি গৃহিণী।’

রাত ৯টার পর থেকে হোসনি দালানে ভিড় বাড়তে শুরু করল। উপচে পড়া ভিড় বা তিল ধারণের ঠাঁই নাই যেন। তরুণ-তরুণীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আলিম ও জাফরের সঙ্গে কথা হয়। জাফর বলল, ‘যদিও আমরা শিয়া নই, তবুও কয়েক বছর ধরে নিয়মিতই হোসনি দালানে আসছি। এখানে এলে আমাদের ভালো লাগে।’ আলিম বলল, ‘এখানে এসে কিছু ভুল ধারণা ভেঙেছে। আগে মনে করতাম, আশুরা বা কারবালা এগুলো শিয়াদের বিষয়। কিন্তু হোসাইন তো শুধু শিয়াদের নয়। তিনি সবার। তিনি সত্যের। প্রথম যখন এসেছি, অবাক হয়ে দেখেছি, বহু হিন্দুরাও আসছেন। নজরানা দিচ্ছেন। পরে জানলাম, পুরান ঢাকার অনেক হিন্দুই হোসাইনকে ভালোবাসেন। হোসাইনের জন্য রোজা রাখেন।’

হোসাইনকে ভালোবেসে ধর্ম-মাজহাব নির্বিশেষ সবাই হোসনি দালানে আসছেন। বরকতি পানি পান করছেন, তবারক খাচ্ছেন, ভক্তিভরে নজরানা দিচ্ছেন। কেউবা আবার ভিন্নভাবে ভালোবাসা জানাচ্ছেন। আমাকে এক শ্রদ্ধেয় মুরব্বি জানালেন, গতকাল হোসনি দালানে এসে শুনি দুই বুড়ো কথা বলছে। একজন আরেকজনকে বলছে, জানো মিয়া! এ দশদিন আমি গোসল করব না। শরীরে তেল লাগাব না। আরেকজন বলল, এ দশদিন আমি দিনে একবার মাত্র পানি খাব। পানির অভাবে ইমামের নির্মম জীবনকে স্মরণ করে ওই দুই বুড়োর কাণ্ড হয়তো আমাদের কাছে পাগলামো মনে হবে, কিন্তু প্রেমের বিচারে তাদের দরজা যে কত ওপরে তা মাপা বা বোঝার অন্তরচক্ষু অনেকেরই নেই।

পরদিনও হোসনি দালানে গেলাম। মানুষ আসছে যাচ্ছে। প্রেম জানাচ্ছে। তবে প্রেমিকদের চোখে-মুখে কেমন যেন অস্বাভাবিকতা ঠেকল। এ রহস্যময় অস্বাভাবিকতা খোলসা হল দশই মহররম সন্ধ্যার মাতম জলসায়। দিনে মিছিল শেষে সন্ধ্যায় মর্সিয়া আসর বসে। কারবালার শোকবাহ বিভিন্ন ঘটনা সুরে সুরে গেয়ে মাতম করা হয়। সে কী মাতম! সে কী কান্না। কারবালার একেকটি বেদনাময় মুহূর্ত সুরের তুলিতে আঁকা হয়, আর প্রেমিকরা বুক চাপড়ে মাথা চাপড়ে হু হু করে কেঁদে ওঠেন। যেন এই মাত্রই হোসাইনকে শহীদ করা হয়েছে, আর তার লাশ সামনে নিয়ে প্রেমিকরা মাতম করছে। এই প্রথম আমার মনে হল, কারবালার নির্মমতা যুগ যুগ ধরে তাজা রাখার জন্যই প্রতীকী মাতম অনুষ্ঠান শুধু প্রয়োজনই নয় অনিবার্য ছিল।

মাতমের আসরে বসে হৃদয় থেকে বারবার একটি কথাই উচ্চারিত হচ্ছিল, ওরে এজিদ! আজও হোসাইনের জন্য মানুষ কাঁদে, অথচ তোর কবরের চিহ্নটুকুও ইতিহাস বুকে ধারণ করেনি। এখানেই হোসাইনের জয়। এখানেই সত্যের জয়। মাতমের আগে পরে কয়েকজনের সঙ্গে কথা হল। তারা বললেন, তাজিয়া মিছিলের অন্যতম একটি কর্মসূচি হল জিঞ্জির মারা। বোমা হামলার পর থেকে কোনো ধরনের অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেয়া কিংবা মিছিল করা নিষেধ করা হয়েছে। তাই আমাদের মহররম এক ধরনের আফসোস নিয়েই শেষ হয় বলা চলে।

তার মানে কি বলতে চাচ্ছেন, বোমাবাজদের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে? বংশালের ব্যবসায়ী আমির আলী বললেন, মোটেও না। ওরা হয়তো বোমা মেরে জিঞ্জির মারাটা বন্ধ করেছে। কিন্তু কপাল চাপড়ানো, বুক চাপড়ানো আটকাবে কীভাবে? ওরা তো জানে না, প্রেমকে বেঁধে রাখা যায় না। আমাদের মাতম উৎসব সংক্ষিপ্ত হয়েছ হয়তো আরও হবে, কিন্তু হৃদয়ের গহিনে যেখানে ইমাম হোসাইনের জন্য রক্ত ঝরে তা কীভাবে বন্ধ করবে?

একটু থেমে আমির আলী আবার বললেন, হোসাইনী মাতম বিশ্বময় ছড়িয়ে দিচ্ছে সত্যের দাওয়াত ইতিহাস সাক্ষী! যখনই হোসাইনকে থামাতে চেয়েছে তখনই তিনি আগ্নেয়গিরির মতো লাভা ছড়িয়ে সত্যের জানান দিয়েছেন। হোসনি দালানেও তাই হয়েছে। বোমা মারার পরের বছর থেকে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। সঙ্গে সঙ্গে ওই খালাম্মার কথা মনে পড়ল, ‘আল্লহর নুরকে যত ফুঁ দিয়ে নেভাতে চাইবে, ততই বিকশিত হবে।’

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Email : [email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×