লোকে বলে রে ঘরবাড়ি ভালানা আমার

  শরীফ উদ্দিন পেশোয়ার ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মীর মশাররফ হোসেন বিষাদসিন্ধু উপন্যাসে বলেছেন, ‘অর্থই সকল অনর্থের মূল।’ বাউল সম্রাট আবদুল করিম বলেছেন, ‘ভব সাগরের নাইয়া/মিছা গৌরব কররে পরার ধন লইয়া।’

হাছন রাজা বলেছেন, ‘লোকে বলে বলেরে ঘরবাড়ি ভালানা আমার।’

আমাদের ছোট সময় অর্থাৎ ৩০-৩৫ বছর আগে রেডিওর খুব কদর ছিল। সারা আনন্দপুরে (আমার গ্রামে) দু-একটি রেডিও ছিল। তখন সন্ধ্যায় মানুষজন জড়ো হতেন রেডিওর মালিকের বাড়ি। সন্ধ্যায় দুর্বার নামে একটি অনুষ্ঠান ছিল। এখন আছে কিনা জানি না। সপ্তাহে এক সন্ধ্যায় লোকসঙ্গীত বাজত ওই দুর্বার অনুষ্ঠানে। মানুষ তখন আবদুল আলিমের লোকসঙ্গীত শোনার জন্য অধীর আগ্রহে বসে থাকতেন। সে সময় আবদুল আলিমের একটি খুবই জনপ্রিয় গান ছিল। সেটি শোনার জন্য মানুষ মুখিয়ে থাকতেন। গানটি হল- পরের জায়গা পরের জমি/ঘর বানাইয়া আমি রই/আমি তো সে ঘরের মালিক নই/... এই ঘরখানি মোর জমিদারি আমি পাইনা তাহার হুকুম জারি/আমি পাইনা জমিদারের দেখা মনের দুঃখ কারে কই।

বাইবেল থেকে জানা যায় ঈসা (আ.)-এর কোনো ঘরবাড়িই ছিল না। তিনি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে দ্বীনের দাওয়াত দিতেন। কালজয়ী দার্শনিক সক্রেটিসের তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য ঘরবাড়ি ছিল না। তিনি গরিব ঘরের সন্তান ছিলেন। একটি মাত্র কোট গায়ে দিয়ে খালি পায়ে হেঁটে হেঁটে যুবকদের শিক্ষা দিতেন। সবাইকে বলতেন নিজেকে জান।

এ কথাগুলো কেন আজ আমার মনে পড়ছে?

এ জন্যই পড়ছে, যেখানেই যাই সেখানেই শুধু টাকা আর টাকার কথা। সম্পদ আর সম্পদের গল্প শুনি সবার মুখে। মানুষ গড়ার কারিগর যারা তারাও সম্পদ নিয়েই চিন্তাভাবনায় দেখি ব্যস্ত। আজ শিক্ষিতজনরাও শিক্ষাকে বিনিয়োগ করেছেন অগাধ অর্থোপার্জনের মাধ্যম হিসেবে। তাদের মুখ থেকে চরিত্র গঠনমূলক, কল্যাণমূলক তেমন কিছু আজকাল শুনি না।

একবার এক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। অনুষ্ঠানটি ছিল এক ভদ্রলোক প্রবাসে অনেক দিন থেকে বাড়ি এসে সুরম্য অট্টালিকা গড়েছেন। এরপর একটা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেছেন। অনুষ্ঠানে খাবারের ব্যবস্থাও ছিল। আলোচনা সভাও ছিল। আলোচনা সভায় প্রবাসীর আত্মীয়স্বজন বক্তব্য দিলেন। শিক্ষিত সবাই বক্তৃতা দিলেন। অট্টালিকার মালিকও উচ্চশিক্ষিত ছিলেন। তিনিই বেশি সময় বক্তব্য দিলেন। এতে তার আত্মীয়স্বজন বেশ খুশি হলেন। এসব আলোচনায় সুন্দর ঘরের প্রশংসা ছিল এবং টাকা উপার্জনের বিবরণের বড়াই ছিল। একটা কথাও কেউ বলেননি চরিত্র যেন সৎ হয়। অন্যকে দান কর। কিংবা কারও বক্তৃতায় আল্লাহ রাসূল (সা.)-এর নাম শোনা যায়নি। আমি এসব বক্তৃতা শুনে খুশি হতে পারলাম না। আমি ভাবছিলাম, তারা বলবে ধন কামাই কর, দানও কর। ধন কামাই কর, হালালভাবে কামাই কর। ধন দিয়ে অন্যকে সাহায্য কর। ধন খরচ করে জ্ঞান অর্জন কর। সমাজের চরিত্র গঠন কর। আরও ভাবছিলাম, নবীজির হাদিস নিচের হাত থেকে ওপরের হাত উত্তম। যদি দান করা হয় তবে ধন বাড়ে।

ধন সম্পর্কে আল্লাহ কী বলেন? মনীষীরা কী বলেছেন, লেখার শুরুতেই উল্লেখ করেছি। এখন ধন কামাই সমন্ধে আল্লাহ যা বলেছেন সেসব কিছু বলব। আল্লাহ বলেন, মানুষ ধনসম্পদ প্রার্থনায় কোনো ক্লান্তি বোধ করে না। [সূরা হামিম সেজদা : ৪৯]।

যেদিন ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি কোনো কাজে আসবে না। সেদিন উপকৃত হবে সেই, যে আল্লাহর কাছে বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ নিয়ে উপস্থিত হয়। [শূরা : ৮৮-৮৯]।

(দুর্ভোগ প্রত্যেকের) যে অর্থ জমায় ও তা বারবার গোনে, ভাবে যে তার অর্থ তাকে অমর করে রাখবে। [হুমাজা : ২-৩]। ধন সম্পদ ও সন্তানসন্ততি পার্থিব জীবনের শোভা, আর সৎকর্মের ফল স্থায়ী, তা তোমার প্রতিপালকের কাছে পুরস্কার পাওয়ার জন্য শ্রেষ্ঠ ও বাসনা পূরণের জন্যও ভালো। [কাহাফ : ৪৬]। এসব আয়াত পড়ে প্রশ্ন তৈরি হয় মনে- আল্লাহতায়ালা কি কামাই রোজগার করতে বারণ করেছেন? ‘না’ আল্লাহ বলেছেন, তোমাদের পক্ষে তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ কামনায় (কামাই রোজগারে) দোষ নেই [বাকারা : ১৯৮]।

হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা একে অন্যের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। কিন্তু তোমরা পরস্পর রাজি হয়ে ব্যবসা করতে পারো। [বাকারা : ২৯]।

ব্যবসা-বাণিজ্য ও কামাই রোজগার করতে গিয়ে কী করতে হবে তাও আল্লাহতায়ালা এক আয়াতে বলেন, সেসব লোক যাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও কেনাবেচা আল্লাহকে স্মরণ করতে, নামাজ পড়তে ও জাকাত দিতে বিরত রাখে না। [নুর : ৩৭]। আল্লাহর কাছে যা আছে তা তামাশাও ব্যবসার চেয়ে অনেক ভালো। আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ জীবিকাদাতা [জুম্আ : ১১]। ইমাম গাযযালি (রহ.) বলেছেন, পরিবার পরিজনকে উপবাসে রেখে সব সময় ইবাদতে ডুবে থাকা তার জন্য জায়েজ নয়। সুতরাং তার উচিত কাজের সময় বাজারে যাওয়া এবং আপন পেশায় মশগুল হওয়া। তবে আল্লাহর জিকির ভুলে না গিয়ে তসবিহ পড়া অব্যাহত রাখতে হবে। ইমাম গাযযালি (র.) শাসকদের জন্য বলেছেন, মুসলমানদের প্রয়োজন মিটানো এবং শরিয়ত অনুযায়ী খাঁটি নিয়তে তাদের স্বার্থ রক্ষা করা জিকিরের চেয়ে উত্তম কাজ। দিনের বেলায় ফরজ নামাজ পড়, জনগণের অধিকার রক্ষায় নিয়োজিত থাক। আর রাতে জিকির কর। [ইয়াহইয়াউল উলুমুদ্দিন, ২য় খণ্ড থেকে]।

একই গ্রন্থে গাযযালি বলেছেন, জীবিকার ধান্দায় পড়ে পরকাল থেকে গাফেল হয়ে জীবন বরবাদ করা কারও উচিত নয়। পরকালের লোকসান জাগতিক মুনাফা দিয়ে পূরণ হতে পারে না। বুদ্ধিমানের উচিত পুঁজি বাঁচিয়ে রাখা। মানুষের পুঁজি হচ্ছে ধর্ম। আল্লাহ বলেন, দুনিয়া থেকে তুমি তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না। দুনিয়া আখিরাতের শষ্য ক্ষেত্র। পুণ্য এখান থেকেই অর্জিত হয়। ভাই বন্ধুগণ আমরা সবাই দ্বীন ধর্ম পাশে ঠেলে প্রাচুর্য অট্টালিকা আর বড় বড় চাকরির জন্য পাগলপারা হয়ে ছুটছি। সর্বদা চিন্তা করছি আমরা কেন সম্পদশালী আর বড় অফিসার হতে পারছি না! সম্পদ আর অফিসারগিরি কী চিরকাল মানুষকে বাঁচিয়ে রাখবে?

লেখক : প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×