তাসখন্দে উসমানী কোরআন

  আদিল মাহমুদ ১১ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সমরখন্দ পাণ্ডুলিপি

উজবেকিস্তানের তাসখন্দে সংরক্ষিত এ কোরআন শরিফটি দীর্ঘদিন উসমানী কোরআন নামে পরিচিত ছিল। এর পাতায় লেগে থাকা রক্তের দাগকে হজরত উসমান (রা.)-এর মৃত্যুর সময়ের রক্ত বলে মনে করা হতো। কিন্তু পরবর্তী সময়ে রেডিওকার্বন ডেটিং থেকে প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে গবেষকরা দাবি করেন, ৬৮ শতাংশ সম্ভাবনা আছে, এটি লেখা হয়েছিল ৬৪০ থেকে ৭৬৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। এ ছাড়া কোফি লিপিতে লেখা এর বিশালাকৃতির হরফগুলোর স্টাইল এবং বিভিন্ন নকশার সঙ্গে উসমানীয় সময়ের চেয়ে বরং পরবর্তী সময়ে উমাইয়া আমলেরই বেশি মিল পাওয়া যায়।

প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, কোরআনের এই পাণ্ডুলিপিটি কোফায় সংরক্ষিত ছিল। পরবর্তী সময়ে তৈমুর লং এটি লুট করে সমরখন্দে নিয়ে যান। চার শতক ধরে সমরখন্দের খোঁজা আহরার মসজিদে অবস্থান করার পর ১৮৬৯ সালে রাশিয়ান জেনারেল আব্রামভ এটি কিনে নিয়ে সেইন্ট পিটার্সবার্গের ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরিতে জমা দেন। অক্টোবর বিপ্লবের পর লেনিন পাণ্ডুলিপিটিকে বাশকরতোস্তানের মুসলমানদের উপহার দেন। পরে তাসখন্দের জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯২৪ সালে এটিকে সেখানে ফিরিয়ে দেয়া হয়।

সমরখন্দ পাণ্ডুলিপির পাতাগুলো বিশালাকৃতির। দৈর্ঘ্য ৬৮ সেন্টিমিটার এবং প্রস্থ ৫৩ সেন্টিমিটার। একেকটি পৃষ্ঠা একেকটি সম্পূর্ণ চামড়া থেকে প্রস্তুত করা হয়েছিল। পৃষ্ঠাগুলো অত্যন্ত মোটা এবং শক্ত। ধারণা করা হয়, মূল পাণ্ডুলিপিতে ৯৫০টি পাতা ছিল। কিন্তু বর্তমানে মাত্র ৩৫৩টি পাতা অবশিষ্ট আছে, যার অধিকাংশই অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং জরাজীর্ণ। বর্তমানে এটি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে সংরক্ষিত অবস্থায় রাখা আছে।

তোপকাপি পাণ্ডুলিপি

তুরস্কের ইস্তাম্বুলে তোপকাপি প্যালেস মিউজিয়ামে সংরক্ষিত কোরআন শরিফের এই পাণ্ডুলিপিটি তোপকাপি পাণ্ডুলিপি নামে পরিচিত। মিসরের গভর্নর মেহমেত আলি পাশা ১৮১১ সালে পাণ্ডুলিপিটি অটোমান সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদকে উপহার হিসেবে প্রেরণ করেন। পরবর্তী সময়ে এটি তোপকাপি প্রাসাদে স্থান পায়। পূর্বে অনেকে এটাকে হজরত উসমান (রা.)-এর কোরআন বলে ধারণা করেছিলেন; কিন্তু পরবর্তী সময়ে জানা যায়, কোরআনটি লেখা হয়েছিল হিজরি প্রথম শতকের শেষভাগে বা দ্বিতীয় শতকের প্রথম ভাগে, তথা খ্রিস্টীয় অষ্টাদশ শতকের প্রথম ভাগে। এ ছাড়া কোরআন শরিফটির লিপির ধরন এবং এতে ব্যবহৃত নকশাগুলোও নির্দেশ করে, এটি হজরত উসমান (রা.)-এর ইন্তেকালের অনেক পর লেখা হয়েছিল। তোপকাপি পাণ্ডুলিপির বিশেষত্ব হচ্ছে, এটি কোরআনের প্রাচীন পাণ্ডুলিপিগুলোর একমাত্র প্রায় অখণ্ড কপি। কোফি লিপিতে লেখা এই পাণ্ডুলিপিতে মাত্র দুটি পাতা ছাড়া সমগ্র কোরআন শরিফ একসঙ্গে আছে। গরুর বাছুরের চামড়া থেকে প্রস্তুতকৃত পাণ্ডুলিপিটির প্রতিটি পৃষ্ঠার আকার দৈর্ঘ্যে ৪৬ সেন্টিমিটার এবং প্রস্থে ৪১ সেন্টিমিটার।

প্যারিসিনো-পেট্রোপলিটানাস পাণ্ডুলিপি

প্যারিসিনো-পেট্রোপলিটানাস কোডেক্স নামে পরিচিত কোরআন শরিফের এ পাণ্ডুলিপিটি রাখা ছিল মিসরের ফুসতাতের আমর ইবন আল-আস মসজিদে। নেপোলিয়ানের মিসর অভিযানের সময় এক ফরাসি গবেষক প্রথমে এর কয়েকটি পাতা ফ্রান্সে নিয়ে যান। পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে এর আরও কিছু পাতা আবিষ্কৃত হয় এবং সেগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লাইব্রেরি এবং জাদুঘরে স্থান পায়। কোরআন শরিফের এ পাণ্ডুলিপিটি সপ্তদশ শতকের শেষভাগে, কিংবা অষ্টাদশ শতকের প্রথমভাবে সিরিয়াতে লেখা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। বর্তমানে এর ৭০টি পাতা প্যারিসে, ৪৬টি পাতা রাশিয়াতে, একটি পাতা ভ্যাটিক্যানে এবং আরেকটি পাতা লন্ডনে সংরক্ষিত আছে। সব মিলিয়ে পাণ্ডুলিপিটিতে কোরআনের প্রায় ৪৫ শতাংশ আয়াত লিপিবদ্ধ আছে। হিজাজি লিপিতে লেখা পাণ্ডুলিপিটিতে মোট পাঁচ ধরনের হাতের লেখা পাওয়া যায়। সম্ভবত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করার জন্য একই সঙ্গে পাঁচজন লেখক এটি লেখার কাজে নিযুক্ত ছিলেন।

নীল পাণ্ডুলিপি

কোফি রীতিতে লিখিত কোরআন শরিফের এ পাণ্ডুলিপিটি ফাতেমি যুগের নিদর্শন। নীল রঙে রঞ্জিত বাছুরের চামড়ায় তৈরি কাগজের পাণ্ডুলিপিটিতে সোনালি হরফে কোরআন শরিফের আয়াত ও রুপালি হরফে নকশা করা হয়েছে। ৯ম শতাব্দীর শেষে বা ১০ম শতাব্দীর শুরুতে লিখিত এ পাণ্ডুলিপিটি বর্তমানে তিউনিসের বারদো জাতীয় জাদুঘরের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব আর্ট অ্যান্ড আর্কিওলজিতে সংরক্ষিত রয়েছে।

ইবনুল বাওয়াবের পাণ্ডুলিপি

নাসখ রীতিতে লিপিবদ্ধ কোরআন শরিফের এ পাণ্ডুলিপিটি বর্তমানে আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে চেস্টার বেটি লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে। ৩৯১ হিজরিতে আরব ক্যালিওগ্রাফার হাসান আলী ইবনে হিলালি এ পাণ্ডুলিপিটির সংকলন করেন। বাগদাদে তিনি সাধারণভাবে ইবনুল বাওয়াব নামে পরিচিত হওয়ায় তার সংকলিত এ পাণ্ডুলিপিটি ইবনে বাওয়াবের পাণ্ডুলিপি নামে পরিচিত।

সেভিল পাণ্ডুলিপি

১৩ম শতাব্দীর কোরআন শরিফের এ পাণ্ডুলিপিটি স্পেনের অল্প কিছু টিকে থাকা কোরআনের প্রাচীন পাণ্ডুলিপিগুলোর মধ্যে একটি। আন্দালুসিয় লিপিতে রচিত এ পাণ্ডুলিপিটির কাজ ১২২৬ সালে সেভিলে সমাপ্ত করা হয়। চামড়ার কাগজের ওপর লিখিত এই পাণ্ডুলিপিটি বর্তমানে জার্মানির মিউনিকের ব্যাভেরিয়ান স্টেট লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে।

মাগরিবি পাণ্ডুলিপি

মাগরিবি ছাঁচে লিখিত কোরআন শরিফের এ পাণ্ডুলিপিটি ১৩ম শতাব্দীতে সংকলিত হয়েছিল। উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার জনপ্রিয় এ লিপিটি চামড়ার তৈরি কাগজের ওপর সংকলিত হয়েছে।

সূত্র : muslimmemo.com I islamic-awareness.org

লেখক : আলেম ও কবি

ইমেইল : [email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×