আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম!

  শরীফ উদ্দিন পেশোয়ার ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম!

সমাজে অনেক কিছু জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। আবার অনেক কিছু কমছে। বাড়ছে অপরাধ। কমছে প্রেম। একে অন্যের খোঁজখবর নেওয়া।

শাহ আবদুল করিম বলেছেন, দিন হতে দিন আসে যে কঠিন/করিম দ্বীনহীন কোন পথে যাইতাম/আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম।

পল্লীকবি জসীমউদ্দীন বলেছেন, ‘তুমি যাবে ভাই, যাবে মোর সাথে আমাদের ছোট গাঁয়/গাছের ছায়ায়, লতায় পাতায়, উদাসী বনের বায়।’ আগের সেই গ্রাম নেই, বন নেই, সেই মনও নেই। এখন মানুষ মানুষে প্রেম করবে দূর থাক খোঁজখবর বা কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করতেই যেন ইচ্ছুক নয়। আগে দেখেছি কেউ বিদেশে বা হজে গেলে সমাদর করে বিদায় জানাতে কিছুটা পথ এগিয়ে দিত মানুষ।

প্রবাস থেকে ফিরলেও বাড়ি ভরে যেত মানুষের কোলাহলে। এখন চুপচাপ বিদেশ যাওয়া। চুপচাপ বিদেশ থেকে ফিরে আসা। প্রবাসীরা চিঠি লিখে সবার খবর নিতেন এক সময়। তখন আরেকটা বিষয় লক্ষ করতাম হাওর এলাকায় ধান কাটা শেষ হলে খড়ের ঢিবি দেয়ার সময় পাড়াশুদ্ধ ছেলেমেয়ে কৃষকদের বাড়ি বাড়ি খড়ের ঢিবি দিতে সাহায্য করত।

গৃহস্থঘরে সে দিন বড় খাবারের ব্যবস্থা হতো। ছেলে-বুড়ো সবাই পেটভরে খেতে পেতেন। খড়ের ঢিবি দিতেন বড় গৃহস্থরা ধান পেতেন কয়েকশ মন। কেউ কেউ পেতেন কয়েক হাজার মণ। এখনও হাজার মন ধান ঘরে তোলেন কোনো কোনো কৃষক। কিন্তু ঘটাকরে সেই খড়ের ঢিবি আর দেয়া হয় না। দরিদ্রদের বা কাউকে খাওয়ানো হয় না। আগের মতো আনন্দও হয় না। এ দৃশ্য আজও আমার মনে পড়ে।

কী দিন এলো, এখন টাকার বিনিময়ে খড়ের ঢিবি দেয়া হয়। টাকার বিনিময়ে একদল শ্রমিক খড়ের ঢিবি দিয়ে যায়। খাওয়াবে বলে রান্নাবাড়া কেউ করতে চান না। খাওয়াবেন দূরের কথা কেউ আজকাল কারও খোঁজ নিতেই রাজি নন। কী দিন এলো? এখন দেখছি, পাশের ঘরের মানুষ উপস কিংবা অসুস্থ। কেউ জানেন না। মরলে, মাছি ভনভন করে মানুষকে জানান দেয়। বলুন আজকের সভ্যতা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে!

আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত বলেন তোমাদের মধ্যে যারা ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী তারা যেন শপথ না করে যে, তারা আত্মীয়স্বজন ও অভাবগ্রস্তকে এবং আল্লাহর রাস্তায় যারা গৃহত্যাগ করেছে তাদের কিছুই দেন না। তারা যেন ওদের ক্ষমা করে এবং ওদের দোষত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ্ তোমাদের ক্ষমা করবেন! [নুর : ২২]।

অবশ্যই ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়স্বজনকে দান কর [নাহল : ৯০]। আর আত্মীয়স্বজন, পিতৃহীন বা অভাবগ্রস্ত থাকলে সম্পত্তি ভাগের সময় তার থেকে কিছু দাও আর তাদের সঙ্গে ভালো কথা বল। [নিসা : ১]।

আল্লাহর রাসূল বলেছেন, যাকে আল্লাহতায়ালা শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছেন অথচ সে জনগণের সঙ্গে ন্যায়-পরায়নপূর্ণ ও সৃহৃদ আচরণ করেনি, আল্লাহতায়ালা তার ওপর বেহেশত অবৈধ করে দেবেন।

হজরত ওমর ফারুক (রা.) আমির থাকাবস্থায় বলতেন, ফোরাত নদীর তীরে যদি একটি কুকুর বা ছাগল ছানা হারিয়ে যায় তাহলে আমার ভয় হয় : রোজ হাশরের দিন আমি কী জবাব দেব?

আমাদের শেরে বাংলা ফজলুল হকও জনগণের খোঁজখবর নেয়ার জন্য ছদ্মবেশে বের হতেন। শেরে বাংলা কৃষকের গোপন দুঃখ জানতে কৃষকের ঘরে বসে হুঁক্কার আসরে বসে খবর নিতেন। আল্লাহ্র প্রিয়তম হাবিব (সা.) বলেছেন, সে মমিন বান্দা নয়, যে পেট ভরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী উপস থাকে।

ধনীদের দায়িত্ব বেশি গরিবদের খোঁজখবর এবং সাহায্য করার। আল্লাহ হাশরের দিন ধনীদের বলবেন, তুমি আমাকে খাওয়াওনি! তুমি আমার চিকিৎসা সেবা দাওনি! ধনীরা বলবে, আপনার (আল্লাহর) তো পেট নেই! আর আপনি কীভাবে অসুস্থ হলেন? আল্লাহ তখন বলবেন, গরিব ভুখাকে খাওয়ালেই আমার খাওয়া হতো। মানুষ রোগীর সেবা করলেই আমার সেবা হতো। শেখ সাদী (র.) বলেন, ‘তরিকত্ বজুয খেদমতে খল্কে নিস্ত্/বা তাসবিহ্ ও সাজ্জআদাহ্ ওদল্কে কিস্ত্।’

অর্থাৎ : জনগণের সেবা ছাড়া মারেফাত আর কিছুই নয়। শুধু তাসবিহ ও জায়নামাজ এবং ছেঁড়া পোশাক পরে আল্লাহ্র প্রিয় বান্দা হওয়া যায় না। আজকাল দেখেছি, সবাই চায় অমুক আমাকে জিজ্ঞেস করুক। অমুক আমাকে ফোন দিক। আমাকে সালাম দিক।

অথচ যে কোনো সাধারণ হাদিস এবং কিতাবে এ ব্যাপারে নিয়মকানুন লেখা আছে। মুসলমানের ধনীরা সালাম পেতে, সমাজের চেয়ারম্যানরা সালাম পেতেই যেন জন্ম নিয়েছেন।

হাদিসে এসেছে হজরত খাজিদা (রা.) সারা জীবনে মাত্র তিনবার স্বামী হজরত মুহাম্মদ (সা.) কে সালাম দিতে পেরেছেন। অর্থাৎ সুযোগ পেয়েছেন। তাকে হজরতই আগে সালাম দিয়ে ফেলতেন!

সেই নবীর উম্মতই তো আমরা। প্রশ্ন তুলতে পারি আমাদের আজ কী হল? আমি, আমরা, আপনি অহংকার, হিংসা আর লোভে পুড়ে মরছি। হাদিসে এসেছে, আজাব গজব মানুষের দু’হাতের কামাই।

কেয়ামত তখনই হবে যখন পাপ বা অপরাধ ষোলো কলায় পূর্ণ হবে।

সুদ, ঘুষবাণিজ্য, হত্যা, গুম, ধর্ষণ ও অপরের সম্পদের লোভ আগের মানুষের তেমন ছিল না। একজন আরেকজনকে এমনিতেই দান করে দিতেন। আজকের দিনে ক্ষমতা অর্থবিত্ত আর উচ্চবিলাশ বেড়ে গেছে এ জন্য সমাজে অপরাধ বাড়ছে। প্রেমপ্রীতি হ্রাস পাচ্ছে। কিউ কেউ নিজেকে বড় একটা কিছু ভাবছি বলে ভাবা যায়। বাংলাদেশ যেন কেবল নেতার দেশ। কেউ এখন জনগণ হতে রাজি নয়। আকাশেতে তারা যত বাংলাদেশে নেতা তত। করিম শাহ বলেন, রাজনীতির নেতার সংখ্যা অনেক গুণ বেড়ে গেছে/অতীত-বর্তমান কি মিল আছে?

আমি মনে করি, এ সবের একটা কারণ আছে। কারণটি হচ্ছে, আমরা কোরআন থেকে বহুদূরে সরে পড়েছি।

দার্শনিক ফিলিপকে হিট্টি বলেছে, কোরআন শুধু ধর্মগ্রন্থ নয়, বেহেশত লাভের চাবিও নয়- এটা বিজ্ঞান ও রাজনীতির প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃত। আসুন, কোরআন পড়ি জীবন গড়ি। আগের মতো সহজ সুন্দর দিন কাটাই।

লেখক : প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×