আখেরি চাহার শোম্বা : নবীপ্রেমিকদের আনন্দের দিন

  আল ফাতাহ মামুন ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আম্মাজান আয়শার ছোট্ট ঘরটি আজ বেদনায় নীল হয়ে আছে। আহলে বায়েতের সদস্যরা ঘরের ভেতর আসছেন-যাচ্ছেন, সাধারণ সাহাবিরা ঘরের আশপাশে বসে-শুয়ে অপেক্ষা করছেন- ‘এখন নবীজি ভালো আছেন’ এই মধুমাখা কথাটি শোনার জন্য। মাওলা আলী-ফাতেমা, কেউই বলল না, ‘নবীজি সুস্থ হয়েছেন’।

সামান্য মাথাব্যথা থেকে শুরু হয়ে প্রচণ্ড জ্বর এবং অসহ্য বুকের ব্যথায় ছটফট করছেন পেয়ারা রাসূল (সা.)। আম্মাজান আয়শাসহ উপস্থিত আহলে বায়েত সদস্যরা বললেন, আমাদের জীবনে এমন যন্ত্রণাকাতর আর কাউকে দেখিনি। রাসূল (রা.) বললেন, নবীরা আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় বান্দা। তাদের কষ্ট যেমন তীব্র, প্রতিদানও বেশি। আম্মাজান আয়শা বলেন, এ সময় নবীজি (সা.) রোগযন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে একবার এদিকে আরেকবার ওদিকে, একবার বসে আকেরবার শুয়ে কিছুটা আরাম পাওয়ার বৃথা চেষ্টা করছিলেন। কিছুক্ষণ পরপর যন্ত্রণায় তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলছিলেন।

এরই মধ্যে একদিন সকালে নবীজি বললেন, ‘আয়শা! কিছুটা সুস্থবোধ করছি। আমি গোসল করব। সাত কুয়োর সাত বালতি পানি দিয়ে নবীজি গোসল করলেন। শরীরটা বেশ ঝরঝরে ফুরফুরে মনে হল। মুহূর্তেই আনন্দের ঢেউ খেলে গেল সাহাবিদের মনে। সে ঢেউ আছড়ে পড়ল মদিনার প্রতিটি ঘরে। পূর্ণিমার চাঁদ থেকে মেঘের আঁধার সরে গেলে যেমন পৃথিবী জোসনার বন্যায় ভেসে যায়, তেমনি মদিনাবাসীর মনও খুশির জোয়ারে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠল। আনন্দে আত্মহারা হয়ে সাহাবিরা দানের প্রতিযোগিতায় মেতে উঠলেন। আবু বকর পাঁচ হাজার দেরহাম, ওমর সাত হাজার দেরহাম, আলী তিন হাজার দেরহাম এবং অন্য সাহাবিরা সাধ্যমতো স্বর্ণ-রুপা, উট-ভেড়া নগদ অর্থ খোদার রাহে খয়রাত দিলেন।

অসুস্থতার শুরুতে হজরত বলেছিলেন, ‘আয়শা! এবারের অসুখ ভালো হওয়ার নয়। এ আমার শেষ যাত্রার অসুখ।’ এই যে প্রচণ্ড অসুস্থতার মাঝে হঠাৎ নবীজির সুস্থ হয়ে ওঠা, প্রেমিকদের কাছে এটাই পরম পাওয়া, চরম আনন্দের খবর। তাই তো সাহাবিরা অকাতরে দান-খয়রাত করে তাদের খুশি প্রকাশ করেছেন, খোদাকে শোকরিয়া জানিয়েছেন। সে থেকেই নবীজির সুস্থতার দিনটিকে প্রেমিকরা আনন্দ এবং শোকরিয়ার দিন হিসেবে উদযান করে আসছে। ওসিলা মনে করছে নিজের এবং সবার সুস্থতার জন্য। মুসলিম বিশ্বে দিনটি ‘আখেরি চাহার শোম্বা বা সফর মাসের শেষ বুধবার’ নামে পরিচিত। নবীজির সুস্থতার দিনটি সফর মাসের শেষ বুধবার ছিল, তাই এমন নামকরণ করা হয়েছে।

ঢাকার আজিমপুর দায়রা শরিফে বেশ আড়ম্বের সঙ্গে আখেরি চাহার শোম্বা পালন করা হয়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নবীপ্রেমিকদের পদচারণায় মুখরিত থাকে দায়রা শরিফ প্রাঙ্গণ। দায়রা শরিফের আখেরি চাহার শোম্বায় একটু ভিন্নতা, রয়েছে। এবার ২১৩তম আখেরি চাহার শোম্বা উদযাপন করতে যাচ্ছে দরবারটি। দরবারের গদিনশীন পীর শাহ সুফি সাইয়্যেদ আহমাদুল্লাহ যোবায়েরের সঙ্গে কথোপকথন তুলে ধরছি নবীপ্রেমিকদের জন্য।

: দায়রা শরিফের আখেরি চাহার শোম্বা সম্পর্কে বলুন।

:: আখেরি চাহার শোম্বা উদযাপন তো সাহাবিদের সময় থেকেই শুরু হয়েছে। যুগে যুগে নবীপ্রেমিকরা এ আনন্দের দিনটিকে দান-খয়রাত, ভালো খাওয়া-দাওয়া এবং সুস্থতার ওসিলা মনে করে আসছে। সে ধারাবাহিকতায় আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর আগে দায়রা শরিফের প্রতিষ্ঠাতা শাহ সুফি সাইয়্যেদ মোহাম্মদ দায়েম (রহ.) এ দিনটিকে যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন করতেন। তার সাহেবজাদা শাহ সুফি সাইয়্যেদ লাকিতুল্লাহর সময় থেকে আখেরি চাহার শোম্বা উদযাপনে নতুন মাত্রা যোগ হয়। তিনি ভক্তদের উদ্দেশে সুস্থতার আংটি দেয়ার প্রচলন শুরু করেন। কোরআনি দোয়া লেখা ওই রুপার আংটি পরে বহু জটিল ও কঠিন রোগ থেকে মানুষ সুস্থ হয়েছে, আজও মানুষ সুস্থতার ওসিলা স্বরূপ আখেরি চাহার শোম্বার দিন আংটি নিতে ভিড় জমায়।

: তার মানে সুস্থতার আংটি এ দরবারের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।

:: এ বছর নিয়ে ২১৩তম বছর হবে। এত সময় ধরে চলতে থাকা ট্রেন্ডকে অবশ্যই ঐতিহ্য বলা যেতে পারে।

: সুস্থতার আংটি লেখার কোনো নিয়ম আছে? আর আংটি পরেই বা রোগ ভালো হয় কীভাবে?

:: আখেরি চাহার শোম্বার দিন সকাল থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এ আংটি তৈরি হয়। কোরআনে নির্দিষ্ট কিছু আয়াত আংটিতে লেখা হয়। আংটি লেখার জন্য এজাজত লাগে। অনুমতি ছাড়া যে সে আংটিতে লিখতে পারে না। আমরা বলি না, আংটি পরেই রোগ ভালো হয়। এটা ওসিলা মাত্র। নবীজির সুস্থতার দিনটিকে ওসিলা করে প্রেমিকরা কোরআনের আয়াত লেখা আংটি ধারণ করে। আল্লাহর ইচ্ছায় সুস্থ হয়। তা ছাড়া কোরআন তো বিশ্বাসীদের জন্য শেফাও। আমাদের আংটি পাইলসের জন্য পরীক্ষিত। অন্যসব রোগও নবীর ওসিলায় আল্লাহ রহমতে শেফা হয়।

: আপনার ছেলেবেলা আর এখনকার আখেরি চাহার শোম্বা উদযাপন কেমন দেখছেন?

:: তখন মানুষ কম ছিল, এখন বেড়েছে। দায়রা শরিফেও প্রেমিকদের পদচরণা বাড়ছে। পার্থক্য এতটুকই। রৌপ্যকাররা এসে আংটি বানায়। আমি কোরআনের আয়াত লিখে দিই। মানুষ ওদের থেকেই আংটি কিনে নেয়। প্রায় একশর মতো দোকান বসে। অবশ্য আংটি বেচে দরবার কিংবা আমার ব্যক্তিগত কোনো আয় হয় না। জেনে খুশি হবেন, আমাদের দরবারের কোনো দানবাক্স, নজর-নিয়াজের নিয়ম নেই।

: আখেরি চাহার শোম্বা উদযাপনকে কেউ কেউ অপছন্দ করেন, বিদায়াত বলে, আপনাদের বক্তব্য কী?

:: নবীজি সুস্থ হয়েছেন, সাহাবিরা আনন্দ প্রকাশ করেছেন, হাদিস ও সিরাতের কিতাবগুলোতে এ ব্যাপারে আলোচনা এসেছে, এখন নবীর সুস্থতার দিনটিকে স্মরণ করে আনন্দিত হওয়া, নফল ইবাদত, দান-খয়রাত করাকে কেউ যদি অপছন্দ করে, বিদায়াত বলে তাহলে তাকে আমি গোনাহগার আর কী বলব? নবীপ্রেম ছাড়া আল্লাহ পাওয়া আর কোনো রাস্তা অন্তত আমাদের জানা নেই। সাহাবিদের মতো আমরাও নবীকে ভালোবেসে দিনটি উদযাপন করি, দোয়া-মোনাজাত করি, হাবিবের ওসিলা দিয়ে খোদার কাছে সুস্থতা চাই, কল্যাণ চাই, এগুলো বেদায়াত হলে সুন্নাত কোনগুলো? সাহাবিরা যা করেছেন, আমরাও তাই করছি। যারা এগুলোর বিরোধিতা করে আমি ব্যক্তিগতভাবে তাদের নবী প্রেমিক মনে করি না।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Email : [email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×