নবীর প্রেমে দুনিয়া মাতোয়ারা

  ড. মাওলানা একেএম মাহবুবুর রহমান ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘আল্লাহকে যে পাইতে চায়

হজরতকে ভালোবেসে

আরশ কুরসি লৌহ কলম

না চাহিতে পেয়েছে সে’

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কণ্ঠে রাসূল প্রেম যে কত বড় নেয়ামত তা ফুটে উঠেছে। আল্লাহতায়ালার প্রেম-ভালোবাসা পেতে হলে হজরতকে ভালোবাসতে হবে। এ ভালোবাসার মাধ্যমে জয় করবে আরশ-কুরসি-লৌহ-কলম তথা সমগ্র জগৎ। মহাকবি ড. আল্লামা ইকবাল তাই তো বলেছেন- ‘কি মুহাম্মদ সে ওয়াফা তু-নে তু হাম তেরে হ্যায়- ইয়ে জাহাঁ চিয হ্যায় কিয়া লৌহ কলম তেরে হ্যাঁয়’। অর্থাৎ : মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাস যদি ভালোবাসা পাবে তবে আমার, এ বিশ্বজাহান তো তুচ্ছ, লৌহ কলমও তোমার। তবে এ ক্ষেত্রে সৃষ্টির মাঝে বিদ্যমান সব দেয়াল ভেঙে চুরমার করে একমাত্র খোদাপ্রেমই হবে লক্ষ্য। মাওলানা রুমি বলেছেন- মিল্লাতে এশক আযহামে মযহাব জুদা আস্ত + আশেকানরা মিল্লাত ও মযহাব খোদা আস্ত। সব মযহাব থেকে সম্পূর্ণ আলাদা-আশেকানের মিল্লাত ও মযহাব শুধুই খোদা। আল্লাহতায়ালার প্রথম সৃষ্টি প্রেম। যখন কোনো সৃষ্টি ছিল না তখন আল্লাহতায়ালার নিরাকার অস্তিত্বে প্রেমের সৃষ্টি হল। এ প্রেমের প্রতিবিম্ব, আকর্ষণ ও কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে সৃষ্টি করলেন প্রেমের নবীর নুর মোবারক। হজরত মুজাদ্দিদে আলফেসানি (র.)-এর বর্ণনায় হাদিসে কুদসিতে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন- ‘আমি ছিলাম গোপন খনি, আমার মাঝে পরিচিত হওয়ার প্রেম সৃষ্টি হল, এ প্রেমের জন্যই আমি সৃষ্টি করলাম একটি সৃষ্টি, তার নাম রাখলাম ‘মুহাম্মদ’। এ ‘মুহাম্মদ’ অর্থই হল যার প্রেমের বারতা ঘোষণা অতীতে ছিল, বর্তমানে চলছে এবং ভবিষ্যতেও চলতে থাকবে। সৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দুর মাঝে খোদাপ্রাপ্তির প্রেমাকর্ষণ যেমন মজ্জাগত, সমগ্র সৃষ্টি সে প্রেমাকর্ষণের প্রতিবিম্ব, আবার এ প্রেমের নবীর মাঝে সৃষ্টিপ্রেম অতুলনীয়। এ প্রেমের সমন্বয় এক বিস্ময় যার নেই কূলকিনারা, নেই সর্বশেষ সীমা। যার আনুগত্য, অনুসরণ আল্লাহতায়ালার ভালোবাসা পাওয়ার, জীবনের সব পাপ মোচনের মাধ্যম তিনি যে কত বড় প্রেমিক তা সহজেই অনুমেয়। যেমন ইরশাদ হয়েছে- আপনি বলে দিন, যদি তোমরা আল্লাহ প্রেমে বিভোর থাকতে চাও তাহলে রাসূল কিভাবে প্রেম নিবেদন করেছেন সে পথের অনুসারী হও, এতে তোমাদের (প্রেম বিবর্জিত) সব আমলের পাপ আল্লাহ ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ মহাক্ষমাশীল ও অসীম দয়ালু।

আল্লাহ প্রেমে প্রিয় নবীজি (সা.) কিভাবে ডুবে ছিলেন তার বর্ণনা দেয়া কারও পক্ষে সম্ভব নয়, তবে বাহ্যিক দৃষ্টিতে বলা যায়- মা আয়েশা ছিদ্দিকা (রা.)-এর বর্ণনায় তিনি বলেন, সারা রাত নফল নামাজ পড়তে পড়তে তার দু’পা ফুলে যেত। এখন প্রশ্ন হল তার তো গুনাহ নেই, গুনাহমুক্ত করেই তাকে সৃষ্টি করেছেন তাহলে তার দু’পা ফুলাতে হবে কেন? জবাব একটাই তার মাঝে ছিল আল্লাহপ্রেম। তিনি ডুবে থাকতেন কূলকিনারাহীন প্রেমসাগরে। মা আয়েশা (রা.) আরও বলেন- প্রিয় নবীজি আল্লাহ নামের জিকির করতে করতে কখনও কখনও অচেতন হয়ে যেতেন, তার দু’ঠোঁট সবসময় ভিজা থাকত। যদিও আল্লাহ নামের প্রেমমাখা জিকির নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন এটা তাদের বিষয়টি না বুঝারই ফল।

সৃষ্টিপ্রেমে, মানবপ্রেমে তিনি ছিলেন বে-নজির, বে মিসাল। হজরত আনাস (রা) নবী করিম (সা.)-এর খেদমতে ৯ বছর ছিলেন। ঘরের কাজ, বাজার করা, প্রিয় নবীজির জামাকাপড় ধোয়া, ঘর পরিষ্কার করা ইত্যাদি কাজ করতেন। এ ছোট শিশুকে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এতই সম্মান করতেন, ভালেবাসতেন যে, দীর্ঘ ৯ বছর বারবার চেষ্টা করেও হজরত আনাস (রা.) প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একবারও আগে সালাম দিতে পারেননি। মানবপ্রেম, মানুষের প্রতি সম্মানের এ ধরনের নজির কি খুঁজে পাওয়া যাবে? যিনি ঘোষণা দিয়েছেন ‘যে বড়কে সম্মান করে না, ছোটকে মায়া করে না সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়’। যে আরব সমাজে মেয়েদের জীবন্ত কবর দেয়া হতো, সে সমাজে নারী জাতির মর্যাদা এ উচ্চাসনে উঠিয়েছেন যে, নিজের মেয়ে হজরত ফাতেমা জাহরা (রা.) তাঁর ঘরে এলে তার সম্মানে দাঁড়িয়ে নিজের বসার স্থানে তাকে বসতে দিতেন। বিশ্বের কেউ কোনো দিন ওই জাহেলি আরব সমাজে এত মায়া, এত সম্মান, এত মমত্ববোধ কল্পনা করতে পারে? মা আয়েশা (রা.) প্রচণ্ড জ্বরে ভুগছেন। তাকে আদর-যত্ন করে, সেবা শুশ্রূষা দিয়ে সুস্থ করতে এক সপ্তাহ সময় লেগে গেল। হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) সুস্থ হয়ে দেখেন, তার ব্যবহারের জন্য কাপড়গুলো নেই। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ওগো প্রাণের রাসূল আমার পোশাকগুলো কোথায়? প্রিয়নবী (সা.) জবাবে বললেন, ওই যে তাকের ওপর। মা আয়েশা (রা.) দেখলেন সব কাপড় পরিষ্কার করে কাঠ দিয়ে ইস্ত্রি করে রেখেছেন। জিজ্ঞেস করলেন- কে ধুয়েছে? উত্তরে মুচকি হেসে রাসূল (সা.) বললেন, ধোপা ধুয়েছে। মা আয়েশা (রা.) জানতে চাইলেন, কোন ধোপা ধুয়েছে? মায়ার নবী, দয়ার নবী মুচকি হেঁসে বললেন এই যে ধোপা বসে আছে। মা আয়েশা (রা.) মহব্বতে কেঁদে ফেললেন। স্ত্রীর প্রতি এই মহব্বত, স্বামী হিসেবে স্ত্রীর প্রতি এত দায়িত্ব পালন, রোগী হিসেবে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর সেবার নজির কি খুঁজে পাওয়া যায়?

প্রিয় নবীজি (সা.) ছিলেন প্রেমের সাগর। স্রষ্টার প্রতি প্রেম, সৃষ্টির প্রতি প্রেমের সেতুবন্ধ। তাই তো প্রেমের কবি আল্লামা ইকবাল বলেছেন- ‘কুওয়াতে এশকসে হার পাস্ত কো বালা কর দে + দাহার মে এসমে মুহাম্মদ সে উজালা কর দে’- এশকে মুহাম্মদির শক্তি দিয়ে সব পতিতকে উন্নত করে দাও + মুহাম্মদ নামের মাধ্যমে যুগকে আলোকোজ্জ্বল করে দাও। আজকের বিশ্বমানবতার মুক্তির একমাত্র উপায়, প্রেম, প্রেম আর শুধুই প্রেম। আর এ প্রেমের আকর, প্রেমের প্রতিবিম্ব আর কেউ নন, তিনি হলেন প্রেমিক নবী, প্রেমের নবীজি (সা.)। কবির ভাষায়- এশকে মাহবুবে খোদা জিস দিল মে হাসেল নেহি + লাখো মুমিন হো মাগার ইমান মে কামেল নেহি- যার অন্তরে মাহবুবে খোদার প্রেম নেই + লাখোবার মুমিন দাবি করলেও পূর্ণাঙ্গ ইমানদার নয়। আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত আমাদের রাসূল (সা.)-এর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে ইমানকে পূর্ণ করার তাওফিক দিন। আমিন। বিহুরমাতি সাইয়্যিদিল মুরসালিন।

লেখক : অধ্যক্ষ, ফরিদগঞ্জ মজিদিয়া কামিল মাদ্রাসা, ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×