আধ্যাত্মিক পথের রুহানি শিক্ষক

মারেফাতের নিগূঢ়তম জ্ঞানগর্ভ আলোচনা বাংলা ভাষায় দুর্লভ। তার গ্রন্থগুলোয় হজরত ইমাম গাজ্জালী (র.) ও হজরত জালাল উদ্দীন রুমী (র.)-এর রুহানি আধ্যাত্মিক তত্ত্বময়তার পরিচয় থাকলেও শায়খে আকবর হজরত মহিউদ্দীন ইবনুল আরাবি (র.)-এর প্রভাব সুস্পষ্ট। তিনি নুরে ওহাদানিয়াতের তত্ত্বাবলী ও তাসাউফের সূক্ষ্ম বিষয় সাবলীল ভাষায় রচনা করেছেন-

  সৈয়্যেদ নূরে আখতার হোসাইন ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দরবারে আউলিয়া সুরেশ্বর দায়রা শরিফের প্রতিষ্ঠাতা রাসূল (সা.)-এর অনন্য প্রেমিক মহান সুফি-সাধক রাসূলনোমা পীর আল্লামা হজরত শাহ্ সুফি সৈয়্যেদ ফতেহ আলী ওয়াইসি পীর কেবলা (র.)-এর অন্যতম মুরিদ খলিফা শামসুল উলামা আল্লামা হজরত শাহ্ সুফি সৈয়্যেদ আহমদ আলী ওরফে হজরত মাওলানা শাহ্ সুফি সৈয়্যেদ জানশরিফ শাহ্ সুরেশ্বরী (র.)।

আল্লাহপ্রদত্ত জ্ঞানকে বলা হয় এলমে লাদুনি। এ জ্ঞান স্কুল-মাদ্রাসা কিংবা বইপুস্তকে অর্জিত হয় না। হজরত সুরেশ্বরী (র.) লিখেছেন, মাদ্রাসায় পড়ে কেউ নবী হননি। কোরআনে আল্লাহ নবীকে ‘উম্মি’ বলেই সম্বোধন করেছেন। তিনি লিখেছেন, জাহেরি বিদ্যায় নবী আছিলেন আম, বাতেনি এলেম সিদ্ধ ছিল মনস্কাম। তাই আধ্যাত্মিক পথে উন্নতির জন্য রুহানি শিক্ষকের প্রয়োজন। উপযুক্ত পথপ্রদর্শকই পারে শিষ্যকে তাত্ত্বিক জ্ঞানে জ্ঞানী করতে এবং আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছে দিতে।

তিনি শরিয়ত, তরিকত, হাকিকত, মারেফত, ইলমে বেলায়েত ও ইলমে তাসাউফের মাধ্যমে সিরাতুল মোস্তাকিমের পথ দেখিয়েছেন।

শরিয়তের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে তিনি লিখেছেন :

মূল তত্ত্বে ফল হবে আমল দরকার

শরিয়ত উৎপন্নের এ ঘর সার॥

তিনি আরও লিখেছেন, ‘তরিকতের ওপর আমল করলে আল্লাহতায়ালা এবং তাঁর রাসূলের ভালোবাসা অর্জিত হয়, আবার শরিয়তের আদেশ-নির্দেশ পালন করলে তা মজবুত হয়।

হজরত সুরেশ্বরী (র.) আল্লাহপ্রদত্ত জ্ঞান ও ইলমে শরিয়তে পাণ্ডিত্যের কারণে ‘শামসুল উলামা’ বা ‘আলেমগণের সূর্য’ উপাধি লাভ করেন। আল্লাহর গুপ্ত রহস্য উন্মোচন ও আধ্যাত্মিকতার তত্ত্ব জ্ঞানসমৃদ্ধ রচনার জন্য তিনি ‘বাংলার ইবনুল আরাবি’ খ্যাতি লাভ করেন। তিনি আধ্যাত্মিক জ্ঞানসমৃদ্ধ ৯টি গ্রন্থ রচনা করেছেন। সেগুলো হল- নূরেহক গঞ্জেনূর, ছফিনায়ে ছফর, মদিনা কলকি অবতারের ছফিনা, আইনাইন, মাতলাউল উলুম, লতায়েফে শাফিয়া, কৌলুল কেরাম, শরহে সদর ও সিররে হক্ক জামেনূর। আধ্যাত্মিক জ্ঞানের উৎস হিসেবে গ্রন্থগুলো জ্ঞানপিপাসুদের জন্য বিশেষভাবে সমাদৃত। তার রচনায় পারস্যের কবি-সাহিত্যিকদের মারেফাত তত্ত্বের মতো আল্লাহর গূঢ় রহস্যের পর্দা উন্মোচিত হয়েছে। মারেফাতের নিগূঢ়তম জ্ঞানগর্ভ আলোচনা বাংলা ভাষায় দুর্লভ। তার গ্রন্থগুলোয় হজরত ইমাম গাজ্জালী (র.) ও হজরত জালাল উদ্দীন রুমী (র.)-এর রুহানি আধ্যাত্মিক তত্ত্বময়তার পরিচয় থাকলেও শায়খে আকবর হজরত মহিউদ্দীন ইবনুল আরাবি (র.)-এর প্রভাব সুস্পষ্ট। তিনি নুরে ওহাদানিয়াতের তত্ত্বাবলী ও তাসাউফের সূক্ষ্ম বিষয় সাবলীল ভাষায় রচনা করেছেন।

প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা ও জাহেরি আলেমদের বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্যের গঠনমূলক সমালোচনা করেছেন। তিনি খোদার নুরের রহস্য, খোদার নুর তালাশ করার প্রয়োজনীয়তা, মুরিদ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা, আধ্যাত্মিক মোকামগুলোর বিবরণ, তেইশটি মোরাকাবা, জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমল, রেয়াজত, ইবাদত-বন্দেগি, আত্মসংযম, রিপু দমন, শরিয়ত, তরিকত, হাকিকত ও মারেফাতের বিধান, সৃষ্টিতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, সেজদায়ে তাহিয়্যা, পীরের প্রতি রাবেতা বা মোর্শেদের বরজখ, মাহফিলে সামা, ওয়াজদ ও হালসহ ইলমে মারেফাতের গূঢ় রহস্য উন্মোচন করেছেন।

পবিত্র কোরআনে সত্যবাদীদের সান্নিধ্য লাভের তাগিদ দেয়া হয়েছে। যে জ্ঞান প্রকাশ্য পুস্তকে নেই তা সিনা-ব-সিনা লাভ করতে আধ্যাত্মিক দীক্ষা গ্রহণ অপরিহার্য।

তাই তিনি লিখেছেন,

পীর ধর যথা পার কহিয়াছে সাঁই

পীরের অসিলা বিনা হবে না ভালাই॥

ওহে লোক যাদের তকলিদি ইমান

ডরাও খোদাকে হও সঙ্গী সাদেকান॥

আউলিয়া কেরামগণের মর্যাদা উপলব্ধি করার জন্য তিনি পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হজরত মূসা (আ.) ও হজরত খিজির (আ.)-এর ঘটনা গভীরভাবে উপলব্ধি করার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, হজরত মূসা (আ.) নবী হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহতায়ালা হজরত খিজির (আ.)-এর কাছে তাকে এ রহস্যাবৃত্ত জ্ঞান শিক্ষা করার জন্য পাঠিয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি বাহ্যিক শরিয়তের দৃষ্টিকোণে খিজির (আ.)-এর আপত্তিকর কার‌্যাবলিকে দোষণীয় মনে করলেন। তার এটা মনে হল না, আল্লাহতায়ালা তাকে নুরে সদরের কাছে যেহেতু পাঠিয়েছেন, তাই তার অনুসরণ করা তার জন্য অবশ্য করণীয়, বিরোধপূর্ণ কিছু করা উচিত নয়।

তিনি বলেছেন, এভাবেই দরবেশ এবং আহ্লুল্লাহ্গণের অনুসরণ করা উচিত। কারণ অলি-আল্লাহদের হাত আল্লাহতায়ালার হাতের ওপর রয়েছে। আল্লাহতায়ালা তাদের মাধ্যমে যে কাজ সম্পাদন করান তাই তারা করেন যদিও তা দেখতে বিরোধপূর্ণ হয়। শরিয়ত এবং তরিকতের আদেশ-নির্দেশের মধ্যে প্রচুর পার্থক্য আছে। যেমন রাত-দিন, মৃত এবং জীবিত। হ্যাঁ, আরেফ ও আশেকগণ সহজেই এগুলো হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন। কেননা, আলোকিত অন্তরকে নুরানি বাক্যালাপ এবং হৃদয়গ্রাহী কথা আলোকিত করে। এসব বিষয় আহালদের জন্য খোরাক। অর্থাৎ এর মাধ্যমেই আল্লাহকে পাওয়া যায়।

এ দৃষ্টিকোণেই আল্লাহতায়ালা তাঁর বিশেষ বান্দাদের উদ্দেশে বলেন, তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমাদের দিব্যদৃষ্টি দেয়া হয়েছে। যে দেখেছে সে নিজের সত্তাকেই দেখেছে, আর যে অন্ধ রয়ে গেছে তার জন্য সেই দায়ী। (সূরা আন্আম, আয়াত-১০৪)।

অর্থাৎ যে ব্যক্তি নিজের আত্মার কামালিয়াত হাসিল থেকে বিরত রয়েছে, তার মধ্যে দিব্যদৃষ্টি ও আমিত্বের পর্দা ও প্রতিবন্ধকতা থেকেই যায়।

হজরত জানশরিফ শাহ সুরেশ্বরী (র.) যে কত উঁচু স্তরের আল্লাহর অলি ছিলেন তা তার আধ্যাত্মিক গ্রন্থগুলো অধ্যয়নেই উপলব্ধি করা যায়। তিনি যে তারিখে জন্মগ্রহণ করেন সেই তারিখেই ইন্তেকাল করেন। তিনি ৬৩ বছর হায়াত পান। এ মহান অলির ১৬৩তম শুভ জন্মদিন এবং ১০০তম ইন্তেকাল দিবস ১৯ নভেম্বর, ২০১৯ খ্রি. দরবারে আউলিয়া সুরেশ্বর দায়রা শরিফে উদযাপন করা হবে। খোদাপ্রেমিকদের দাওয়াত জানাচ্ছি।

লেখক : ইসলামি চিন্তাবিদ ও প্রধান গদিনশীন পীর, দরবারে আউলিয়া সুরেশ্বর দায়রা শরিফ

Email : [email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×