গুজবের মহামারী প্রযুক্তির ভয়াবহ গজব

  আল ফাতাহ মামুন ২৯ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গুজবের মহামারী প্রযুক্তির ভয়াবহ গজব

প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সঙ্গে সঙ্গে গুজবেরও প্রসার ঘটেছে। আগে হয়তো একটি নির্দিষ্ট এলাকায় গুজবের মহামারী ছড়িয়ে পড়ত, আর এখন পুরো দেশই শিকার হচ্ছে গুজব নামক প্রযুক্তির গজবে।

খুব অবাক হতে হয়, কোনো ঘটনার সত্যতা যাচাই না করেই আমরা প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছি। মুহূর্তেই ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত করছি এলাকা, মেরে ফেলছি মানুষ, অস্থিতিশীল করে তুলছি বাজার, অশান্ত হয়ে উঠছে রাষ্ট্র... পর মুহূর্তে যখন বুঝতে পারি বিষয়টি আসলে গুজব ছিল তখন মাথার চুল ছেঁড়া ছাড়া কিই-বা করার থাকে।

আমরা কী পারব গুজবের কারণে যাদের স্বজনদের মেরে ফেলেছি, যেসব ঐতিহ্য ধ্বংস করে ফেলেছি সেসব ক্ষতি পুষিয়ে দিতে। কেন আমরা বুঝি না, ইন্টারনেট কোনো ফেরেশতা চালায় না, আমাদের মতো মানুষ অর্থাৎ আমরাই চালাই।

আমরা যেমন সত্য-মিথ্যা বলে পরিবেশ ঘোলাটে করে নোংরা ফায়দা লোটার ধান্ধায় থাকি, ইন্টারনেট আসাতে সে ধান্ধা এখন আরও সহজ হয়ে গেছে। একটা কিছু ছেড়ে দিলেই হল, মুহূর্তেই তা হাতে হাতে পৌঁছে যায়। ধর্মীয়-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিবেশ অস্থিতিশীল ওয়ে ওঠে চোখের পলকেই।

পৃথিবীর আর কোনো দেশে আর কোনো জাতি যদি গুজব নামক প্রযুক্তির গজবের শিকার হতো তাহলে মনকে কিছুটা হলেও সান্ত্বনা দেয়া যেত। কোরআনি প্রযুক্তির ধারক মুসলমান জাতি কীভাবে গুজবের শিকার হয়ে ইমান-আমল সব বিকিয়ে দিচ্ছে আমার বুঝে আসে না।

মানুষ যখন কোরআনের প্রযুক্তি ছেড়ে নিজের বানানো প্রযুক্তির পাখায় ভর করে সামনে এগোতে চায়, তখন প্রযুক্তি এভাবেই ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে যখন আজকের এই আধুনিক প্রযুক্তির কথা মানুষ কল্পনাও করতে পারেনি, তখন আল্লাহতায়ালা চিরপ্রযুক্তিময় গ্রন্থ আল কোরআন নামক অ্যাপসে সামাজিক ভাইরাস গুজব থেকে বেঁচে থাকার অ্যান্টিভাইরাস ইনস্টল করে দিয়েছেন।

আল্লাহ বলছেন, ‘হে বিশ্বাসীরা! কোনো অনির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের সত্যতা অবশ্যই যাচাই করে নেবে। নতুবা গুজবের বশে কেন জনগোষ্ঠীর মারাত্মক ক্ষতি তোমরা করে ফেলতে পার। তখন তোমরাই ভীষণ অনুতাপে ভুগবে।’ (সূরা হুজুরাত, আয়াত : ৬।)

অনির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই করে নেয়া ফরজ। চাই তা ফেসবুকে পাই কিংবা ইউটিউব অথবা অন্য কোথাও পাই, আগে নিশ্চিত হতে হবে তা কতটুকু সত্য। অচেনা-অজানা মানুষের কথা যেমন আমরা হুট করে বিশ্বাস করি না, তেমনি অপরিচিত লিংক, আইডি থেকে ছড়ানো তথ্যও যাচাই না করে বিশ্বাস করা যাবে না।

অমুক কোরআনের অপমান করেছে, তমুক নবীকে হেন-তেন বলেছে- এরকম কিছু দেখলেই তা ছড়ানো যাবে না। খুব ভালো করে নিশ্চিত হতে হবে- এগুলো কতটুকু সঠিক ও যথার্থ? প্রয়োজনে ইন্টারনেট বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিতে হবে। একইভাবে অমুক পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে, অমুক জিনিস শেষ হয়ে যাচ্ছে এসব শুনেও প্রভাবিত হওয়া যাবে না। প্রভাবিত হলে ক্ষতি আসলে নিজেরই হবে, অন্য কারও নয়- এটাই কোরআন বলছে।

‘সত্যতা যাচাই’ কাজটি খুব সহজ মনে হলেও আসলে সহজ নয়। বার্মায় মুসলমানদের মারছে, একদল মানুষ। বলিউডের ছবির দৃশ্য একটু ঘোলা করে ইন্টারনেটে ছেড়ে দিল, কেউ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানোর জন্য নিজেই কোরআন বা গীতার কপিতে আগুন ধরিয়ে ছবি-ভিডিও আপলোড করে দিল, কোনো সিন্ডিকেট একাধিক আইডি থেকে শেয়ার দিল, অমুক জিনিস শেষ হয়ে যাচ্ছে- এসব ক্ষেত্রে সঙ্গে সঙ্গেই সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে না। বেশ কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে, সম্ভব হলে ব্যক্তিগত কিংবা সংঘবদ্ধ তদন্ত করতে হবে।

রাসূল (সা.)-এর সময়ে ঠিক এমন একটি ঘটনা ঘটে। একজন সাহাবি এসে বললেন, অমুক গোত্র আমাকে হত্যা করতে চায়। আসলে ঘটনাটি গুজব ছিল। গুজবের বশে দুই গোত্রের মাঝে যুদ্ধের দামামা পর্যন্ত বেজে ওঠে।

পরে রাসূল (সা.) গোয়েন্দা পাঠিয়ে বুঝতে পারলেন, আসলে দু’দলের মাঝেই ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। সূরা হুজুরাতের ৬ নম্বর আয়াতের শানেনুজুলে ঘটনাটি বিস্তারিত পাওয়া যাবে (তাফসিরে মাজাহারি, ইবনে কাসির ও মাআরেফুল কোরআন)।

মনে রাখবেন, গুজব খুব বেশি সময় ধরে স্থায়ী হয় না। যে অল্প সময় স্থায়ী হয়, ওই সময়টুকুতেই ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে যায়। তাই ইন্টারনেটে কিছু পাওয়ার পর তা যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেনো, যথাযথভাবে সত্যতা যাচাই না করে তা প্রচার-প্রসার শেয়ার করা পুরোপুরি হারাম।

রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে প্রচার করা, শেয়ার করা- কোনো মানুষ মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট’ (মুকাদ্দিমায়ে মুসলিম)। ইন্টারনেট সম্পর্কে যাদের অভিজ্ঞতা কম, এ ভয়াবহ গোনাহ থেকে বাঁচার একটি সহজ টিপস হচ্ছে, যত গুরুতর খবরই হোক না কেন, সঙ্গে সঙ্গে এটা শেয়ার দেবেন না। প্রচার করবেন না। কিছু সময় অপেক্ষা করুন। ঘটনা সত্য হলে, দেশ-বিদেশের সব জাতীয় প্রচারমাধ্যম ঘটা করে সে সংবাদ প্রচার করবে। তখন যদি আপনার কিছু করণীয় থাকে, করবেন। এর আগে নয়। প্রভু হে, গুজব থেকে এ জাতিকে রক্ষা করুন।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

Email : [email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×