স্বাধীনতার মাসে মনে পড়ে তাকে

  কাজী শফিকউদ্দিন আহমদ আলো ০৯ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাধীনতার মাসে মনে পড়ে তাকে
নারিন্দার পীর হজরত নজর ইমাম (রহ.)

একজন আল্লাহর ওলি দেশের স্বাধীনতার জন্য আল্লাহর দরবারে কেঁদেছেন। তিনি হলেন নারিন্দার পীর হজরত নজর ইমাম (রহ.)। মে মাসের শেষের দিকে ঢাকার নারিন্দায় তখন এত জনবসতি ছিল না। বেশিরভাগ মানুষ দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। কিছু সংখ্যক শিশু, বৃদ্ধ, বৃদ্ধা ও মহিলা যারা যেতে পারেননি, তারাই জীবনের মায়া ত্যাগ করে নান্দিয়ায় রয়ে গেছেন।

রাতে রাস্তার লাইট জ্বলে না। দু-চার ঘরে যারা আছেন তারা সন্ধ্যা বেলাতেই রাতের খাবার খেয়ে ঘর অন্ধকার করে মৃত্যুর প্রহর গোনেন। কোনো একটি শব্দ হলে বুকটা আঁতকে ওঠে। মনে হয় এই বুঝি মৃত্যু এগিয়ে এলো। একদিন হঠাৎ করে এ অসহায় মানুষগুলো জানতে পারেন ক্যান্টনমেন্ট থেকে অত্যন্ত আধুনিক মারণাস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বড় ট্রাকে আনুমানিক ৮-১০ জন সৈন্যসহ নারিন্দার দিকে এগিয়ে আসছে। মহিলারা প্রস্তুত হয়ে গেলেন। জীবন দেবেন তবু ইজ্জত দেবেন না।

সেনাবাহিনী বহন করা গাড়িটি দয়াগঞ্জ মোড় পার হয়ে শরৎ গুপ্ত রোডের দিকে এগুলো। এমনি সময় গাড়িটি ২-৩ ফুট ওপরে উঠে লাফ দিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে সামনে-পেছনের সবক’টি চাকা বিকট শব্দে ফেটে গেল। গাড়িতে আগুন লাগার ভয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যরা গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে রাস্তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। ভয়ার্ত, হতবিহ্বল চোখে, জীবন হাতে পেয়ে চারদিকে তাকিয়ে এক পথচারীকে প্রশ্ন করল। এখানে কোনো পীর সাহেব আছেন কিনা? পথচারী জানাল, ‘সামনেই নারিন্দার পীর সাহেব হজরত নজর ইমাম (রহ.) থাকেন। তিনি নারিন্দার পীর সাহেব হিসেবে পরিচিত। বিধ্বস্ত, অসহায় পাকিস্তানি জোয়ানরা এখানেই দাঁড়িয়ে থেকে হজরত নজর ইমাম (রহ.)কে সালাম জানিয়ে ফিরে গেল।’

নারিন্দার পীর হজরত নজর ইমাম (রহ.)-এর অত্যন্ত প্রিয় (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) এক ভদ্রলোক। অনেক বছর আগে তার শরীরের এক পাশে প্যারালাইসিসের কারণে অবশ হয়ে গিয়েছিল। চলাফেরা করতে পারতেন না। বেশ কিছুদিন ওষুধ খেয়েও কোনো লাভ হল না। সে সময় হজরত নজর ইমাম (রহ.) তাকে নারিন্দায় খানকায় কাছে ডেকে নিজের বিছানায় তাকে শোয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন। ভদ্রলোকের আপত্তি সত্ত্বেও হুজুর কেবলা তার নিজের বিছানাতে তাকে শুয়ে থাকতে বললেন।

এরপর হুজুর কেবলা তার হাতে একটা ছোট কাপড়ের পুঁটলি বের করে অবশ হয়ে যাওয়া শরীরের অংশে তিনবার বুলিয়ে দিয়ে বললেন ‘এবার হেঁটে বাড়ি চলে যান। আপনার শরীরের অপর অংশও ভবিষ্যতে প্যারালাইসিস হতে পারে।’ তিনি হেঁটেই বাড়ি চলে গেলেন। হুজুর কেবলা দুনিয়া থেকে চলে যাওয়ার পর ওই ভদ্রলোকের শরীরের অন্য অংশ প্যারালাইসিসের মতো অবস্থা দেখা দিল। তিনি নারিন্দার মাজার শরিফে হুজুর কেবলার পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আপনি বলেছিলেন আমার শরীরের অন্য অংশেও প্যারালাইসিস হতে পারে, বর্তমানে সেরকম অবস্থা অনুভব করছি। আমি কিছুই জানি না, আপনি দোয়া করে আল্লাহকে বলেন আমার যেন আর প্যারালাইসিস না হয়।

এরপর থেকে এ বিষয়ে কোনো শারীরিক অভিযোগ নেই তার। হুজুর কেবলা তাকে অত্যন্ত ভালো বাসতেন। সঙ্গে করে আজমির শরিফ ও শিরহিন্দ শরিফ নিয়ে গেছেন ৩৪ বার। এর মধ্যে হুজুর কেবলা ওই ভদ্রলোককে বলেন, ‘মাদ্রাজে একজন সাহাবির মাজার আছে, সেটা আপনি দেখে আসেন।’ ভদ্রলোক কোনো দিনই মাদ্রাজ যাননি। কোথায় মাজার, ঠিকানা কি কিছুই জানেন না।

সম্পূর্ণ অজানা অবস্থায় পীরের হুকুম পালন করার জন্য মাদ্রাজ রওনা হলেন। মাদ্রাজে গিয়ে কাছেই একটা মসজিদ দেখতে পেয়ে এগোলেন সামনে, দেখেন এক বৃদ্ধ বসে আছেন। তার কাছে প্রশ্ন করেন, এখানে সাহাবি হজরত তওমুম আনসারি (রা.)-এর মাজার কোথায়? বৃদ্ধ লোকটি জানিয়ে দেন, ‘সমুদ্রের কিনারায় যান, সেখানে দেখবেন।’ ভদ্রলোক সমুদ্রের পাড়ে গিয়ে দেখেন ছোট একটি মাজারের আকৃতি।

অত্যন্ত অবহেলিত ও অযত্ন অবস্থায়। মাজার দেখেই ভদ্রলোক উচ্চ স্বরে কেঁদে উঠলেন, ভাবলেন এ কি সাহাবি হজরত তওমুম আনসারি (রা.)-এর মাজার? ‘আমার পীর ও মুর্শিদ হজরত শাহ সৈয়দ নজর ইমাম (রহ.) আপনার কাছে আমাকে পাঠিয়েছেন’। ফিরে এসে হুজুর কেবলার কাছে বিস্তারিত বর্ণনা দিলেন। ৪-৫ বছর পর আবার হুজুর কেবলার নির্দেশে মাদ্রাজে ওই মাজারে গেলেন তিনি। মাজার শরিফের কাছে দাঁড়িয়ে হতবিহ্বল হয়ে পড়লেন। সমুদ্রের পাড়ে এক ঝকঝকে মাজার শরিফ তকতকে সুন্দর মিনারসহকারে অবস্থান করছে। মাজারের পাশে বিশাল এক অপূর্ব সুন্দর মারবেল পাথরের তৈরি মসজিদ। শত বছরেও যা হয়নি মাত্র ৪-৫ বছরের ব্যবধানে এই সুন্দর ঘটনা কীভাবে ঘটল। হজরত তওমুম আনসারি (রহ.)-এর মাজারের এ সৌন্দর্য ও মাজারসংলগ্ন মসজিদ দেখে অবাক বিস্ময়ে চেয়ে রইলেন।

হুজুর কেবলা তাকে আরও নির্দেশ দিয়েছিলেন। রাসূল (সা.)-এর বিশিষ্ট সাহাবি হজরত মালান (রা.)-এর মাজারে বম্বেতে যাওয়ার জন্য। বম্বে নেমে ট্যাক্সি, রিকশা ও হেঁটে সে মাজারের পাদদেশ পর্যন্ত যেতে হবে। এরপর পাহাড়ের ওপর হজরত মালান (রা.)-এর মাজার অবস্থিত। এ পথ নির্দেশনাও হুজুর কেবলা বলে দিয়েছিলেন।

মারেফাতের রুহানি জগতে হুজুর কেবলা বম্বে এবং মাদ্রাজে রাসূল (সা.)-এর বিশিষ্ট সাহাবিদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়েছিলেন। এই হলেন আমার হুজুর কেবলা হজরত নজর ইমাম (রহ.)। তার মাধ্যমে এক ঐতিহাসিক সত্য ও তথ্য জানা যায়। মক্কা বিজয়ের পর রাসূল (সা.)-এর নির্দেশে সে সময়ে তুরস্কে এসেছিলেন হজরত আইয়ুব আসারি (রা.) ঠিক তেমনি সাময়িক সময়ের জন্য ভারতে এসেছিলেন হজরত তওমুম আনসারি (রা.), হজরত মালান (রা.) প্রমুখ।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×