বিশ্ব ইজতেমার বিশেষ বিশ্লেষণ

  আহমাদ জামিল ১৭ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ছবি: যুগান্তর

শুক্রবার সন্ধ্যার পর উত্তরার ভেতর দিয়ে আমরা যখন টঙ্গীর দিকে এগোচ্ছি, তখন প্রথম পর্বের ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের সমাগম উত্তরা ১০ নং সেক্টরেও ঢুকে পড়েছে। মানুষের ভিড় ঠেলে যত সামনে এগিয়েছি, ততই আমাদের বিস্মিত হতে হয়েছে।

গাড়িতে থাকা সিনিয়র একজন মুবাল্লিগ আলেম জানালেন, বিগত ২৫ বছর ধরে তিনি বিশ্ব ইজতেমায় নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন। কিন্তু এবারের উপস্থিতি অন্যবারের তুলনায় ব্যাপক হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে শিল্পনগরী টঙ্গী পরিণত হয়েছিল ধর্মীয় নগরীতে। বুধবার থেকে শুরু হয়ে ইজতেমাস্থলে মুসল্লিদের আগমন অব্যাহত ছিল আখেরি মোনাজাতের আগ পর্যন্ত।

ময়দানের কোথাও ঠাঁই না পেয়ে মুসল্লিদের উপচে পড়া ভিড় আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছিল। কনকনে শীত উপেক্ষা করে মুসল্লিরা খোলা আকাশের নিচে রাস্তায়ও অবস্থান নিয়েছেন।

১১ জানুয়ারি ইজতেমার মাঠ ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা যায়, চারদিকে প্রচুর মানুষের সমাগম। অনেকে ইজতেমা ময়দানে জায়গা না পেয়ে বা দলছুট হয়ে ঘোরাঘুরি করছেন এদিক-সেদিক।

ইজতেমার মুরব্বিরা জানিয়েছেন, অন্যবারের তুলনায় এবারের ইজতেমায় মুসল্লির সংখ্যা বেশি ছিল। ইজতেমা মাঠের পূর্ব ও পশ্চিম পাশে নতুন ১৪টি খিত্তা (নির্ধারিত স্থান) যুক্ত করার মাধ্যমে মাঠের পরিধি বাড়ানো হয়েছে।

আর পুরো ইজতেমাকে ৯১টি খিত্তায় ভাগ করা হয়েছে। এরপরও জায়গা না পাওয়ায় ময়দানের বাইরে রাস্তায় অবস্থান করেছেন মুসল্লিরা।

ইজতেমায় অনেক বছর পর বিপুলসংখ্যক মানুষের এমন উপস্থিতিতে যতটুকু খুশি হওয়ার কথা, তার সবটুকুই বেদনায় পরিণত হয়েছে বিদেশি তাঁবুতে ঢুকে।

বাংলাদেশের বিশ্ব ইজতেমা ছিল গোটা বিশ্বের বিস্ময়। ইজতেমার মূল আকর্ষণই হল বিদেশি মুসল্লিদের অংশগ্রহণ। হজের পর এটিই মুসলমানদের সর্ববৃহৎ জমায়েত, যেখানে গোটা পৃথিবী থেকে মুসল্লিরা অংশগ্রহণ করে থাকেন। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার বিদেশি মুসল্লিদের অংশগ্রহণ ছিল অনেক কম।

ইজতেমা মাঠের একেবারে উত্তর-পশ্চিম কোণে কামারপাড়া ব্রিজ ঘেঁষে নির্মিত ফরেনার টেন্ড এবার প্রায় খালিই ছিল। আরবদের তাঁবুসহ বিভিন্ন দেশের জন্য নির্মিত তাঁবুগুলোর প্রায় বেশিরভাগই ছিল মেহমানশূন্য।

মতপার্থক্যগত কারণে তাবলিগ জামাতের সাম্প্র্রতিক বিভাজনে টঙ্গীর ইজতেমা যে বৈশ্বিক আবেদন হারাচ্ছে, এ বছরের ইজতেমায় সেটিই প্রমাণিত হল।

তাবলিগের অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে এবার বাহ্যত দুই পর্বে ইজতেমা হলেও দুই পক্ষ পৃথক পৃথক ইজতেমা করছে। তাবলিগ জামাতের সদর দফতর দিল্লিতে থাকা সত্ত্বেও এর বার্ষিক সমাবেশের জন্য বাংলাদেশকে বেছে নেয়া হয়েছিল।

ভারতের মুম্বাই ও ভূপালে এবং পাকিস্তানের রায়বেন্ডে ইজতেমা হলেও জনসমাগমের বিচারে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমাই বড় এবং বিশ্ব দরবারে বিশ্ব ইজতেমা বলতে বাংলাদেশের টঙ্গীতে অনুষ্ঠিত ইজতেমাকেই বুঝায়।

কিন্তু টঙ্গীর ইজতেমার এ ব্যাপকতা কেন ছিল? কারণ ভৌগোলিক ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যার কারণে ভারত-পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশই ছিল নিরাপদ। তাই প্রতি বছর বিশ্বের সব দেশের তাবলিগি মুরব্বিরা টঙ্গীতে হাজির হতেন।

টঙ্গীর ইজতেমায় বিশ্বের প্রতিটি দেশ থেকে তাবলিগ জামাতের শুরা সদস্যরা আসেন। এখানে সব দেশের মুরব্বিদের নিয়ে পরামর্শ হয়। এ জন্যই এটিকে বিশ্ব ইজতেমা বলা হয়।

বিদেশি মেহমানদের মধ্যে প্রতি বছর আরবদের আধিক্য থাকে। কিন্তু এবার সবচেয়ে কম মেহমান এসেছে আরব দেশগুলো থেকে।

অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলেও এটিই এখন সত্য, এ বছরের ইজতেমার মধ্য দিয়ে তাবলিগ জামাত আনুষ্ঠানিকভাবে দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে।

বিষয়টি নিয়ে গত শুক্রবার ইজতেমার প্রথম পর্বে প্রবাসী এক আলেম আফসোস করছিলেন। তিনি জানালেন, আগের ইজতেমাগুলোয় কাতার থেকে প্রায় হাজারখানেক সাথী অংশ নিতেন। এমনও হয়েছিল যে, কাতার থেকে বিমান রিজার্ভ করেও সাথীরা ইজতেমায় আসতেন। কিন্তু এ বছর হাতেগোনা কয়েকজন এসেছেন। দ্বিতীয় পর্বে হয়তো এমনই অল্প কয়েকজন আসবেন।

ইজতেমার বিদেশি শাখার আরেক দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, দুই পক্ষ আলাদাভাবে ইজতেমা করায় মৌলিকভাবে বিদেশি সাথীরা বাংলাদেশে আসেননি। তবুও হাতেগোনা যে ক’জন এসেছেন, এদের অনেকেই নতুন করে শুরা সদস্য হওয়ার জন্য এসেছেন। অর্থাৎ তাবলিগের বিভক্তির কারণে সব দেশেই দুই পক্ষ প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে।

সে হিসেবে অপর পক্ষের শুরাদের শূন্যস্থান পূরণ করতে নতুন করে অনেকেরই শুরা সদস্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমন ব্যক্তিরাই কিছু সঙ্গী নিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন।

আফসোস, লিল্লাহিয়াতের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বৈশ্বিক ইমানি আন্দোলন তাবলিগ জামাতে আজ একি নোংরা খেলা চলছে। বিভক্তির এ চিত্র ফুটে উঠেছে মিম্বার থেকে চলা বয়ানেও। আগের মতো ইমান-আমলের মেহনতের বদলে এবারের বয়ানে প্রাধান্য পেয়েছে সঙ্গদানের কথা। পরিস্থিতি মোকাবেলা করায় বাংলাদেশি সাথীদের ধন্যবাদও জানিয়েছেন ভারতের এক শীর্ষ মুরব্বি। আহ, এমন দিনও আমাদের দেখতে হল!

আলাদাভাবে আয়োজন করায় এ বছর দু’পক্ষই বেশি লোক জমায়েতের প্রাণান্ত চেষ্টা করেছে। সে হিসেবে প্রথমপর্বে ব্যাপক লোক সমাগমও হয়েছে। যেহেতু এ বিভক্তি বিশ্বব্যাপী, তাই বিদেশি মেহমানও উভয়পক্ষের বেশি হওয়ার কথা। তাবলিগের মরহুম এক মুরব্বির ছেলে ও পুরনো সাথীর কাছে এ প্রশ্নটি করেছিলাম।

তিনি বললেন, মতপার্থক্যগত সমস্যার কারণে তাবলিগ জামাতে এখন দু’পক্ষ হয়েছে এটা সত্য। কিন্তু আমাদের দেশে বিষয়টির চর্চা বেশিই হয়েছে। বিশ্বের অন্য কোনো দেশে তাবলিগ নিয়ে এত ঝগড়া ও হানাহানি হয়নি। জাতিগতভাবে আমরা হিংসুটে ও ঝগড়াপ্রবণ, সে সুযোগটি কাজে লাগিয়ে ভারত-পাকিস্তানের মুরব্বিরা বাংলাদেশকে প্লেয়িং ফিল্ড হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাদের দেশে এতায়াত-ওয়াজাহাত নামে কোনো পরিভাষা সৃষ্টি না হলেও আমাদের দেশে এ নিয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছে।

ওই আলেম জানালেন, তাবলিগ নিয়ে বাংলাদেশে যে যুদ্ধযুদ্ধভাব, এর একটি নেতিবাচক প্রভাব সারা বিশ্বের সাথীদের মধ্যেই পড়েছে। এ জন্য আরবসহ বিদেশি সাথীরা বাংলাদেশে আসতে আগ্রহবোধ করেননি। বিশেষত গত বছর টঙ্গী ময়দানে দু’পক্ষ যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়েছিল, এতে তারা টঙ্গী ইজতেমা অনিরাপদবোধ করছেন।

চলতি সপ্তাহে শুরু হওয়া ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বে বিদেশি মেহমানের সংখ্যা হয়তো আগের চেয়ে সামান্য বেশি হবে। কিন্তু এতে আহ্লাদের কোনো কারণ দেখছেন না পুরনো সাথীরা। কারণ আলাদাভাবে ইজতেমার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যে বিভক্তি শুরু হয়েছে, এতে সিনিয়র মুরব্বিদের নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা সাময়িকভাবে পূরণ হলেও আখেরে ক্ষতিগ্রস্ত হবে গোটা জামাত। এভাবে নিজেদের মধ্যে মোরগ লড়াই অব্যাহত থাকলে সামনে এটি আর বিশ্ব ইজতেমা থাকবে না, হয়ে যাবে দেশীয় বা আঞ্চলিক ইজতেমা।

মুরব্বিদের বিপরীতমুখী দৃঢ় অবস্থানের কারণে তুরাগ তীরের ইজতেমা বৈশ্বিক আবেদন হারাতে বসেছে। এখন উভয় পক্ষের মুরব্বিরা আলাদা ইজতেমা করতে পেরে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছেন। ইতিহাস আমাদের বলে, বর্বর তাতারীদের আক্রমণের আগেও ইরাকের আলেমরা এ লড়াইয়ে লিপ্ত ছিলেন যে, হজরত আলীর (রা.) মর্যাদা বেশি না মোয়াবিয়ার (রা.) বেশি।

বিশ্ব মুসলমান আজ সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। নিজেদের মাঝে বিভেদ আর হানাহানির পাশাপাশি গোত্র, সম্প্রদায়কেন্দ্রিক আকিদা বিশ্বাসে হাজারও মত, চিন্তা-চেতনায় শতধাবিভক্ত বিশ্ব মুসলিম। ঠিক সেই সময়ে তাবলিগ জামাত ও বিশ্ব ইজতেমার এমন বিভক্তি আমাদের করুণ কোনো পরিস্থিতিরই ইঙ্গিত দেয়। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুক।

লেখক : প্রাবন্ধিক

ই-মেইল : [email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : বিশ্ব ইজতেমা ২০২০

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত