এক বুক আশা নিয়ে মাঠে গিয়েছিলাম

  আল ফাতাহ মামুন ১৭ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্ব ইজতেমার ১ম পর্ব। ছবি: যুগান্তর

বড় সাধ ছিল ইজতেমার বরকতময় জুমার নামাজে শরিক হওয়ার। আফসোস! পথেই নামাজ পড়ে নিতে হল। ইজতেমার মাঠে পা দিতেই মনটা আনন্দে নেচে ওঠে।

কহর দরিয়ার তীরে কালেমা তৈয়্যেবার বাগানে লাখো ‘মোমিনফুল’ হাসি ছড়িয়ে ফুটে আছে। কোনো তাঁবুতে দুপুরের খাবারের আয়োজন চলছে, কোনো তাঁবুতে খাওয়া শুরু হয়েছে, কোনো দলের অর্ধেক খাওয়া শেষ, কেউবা খাওয়া শেষে ভাতঘুমের ভান করে চোখ বুঝে বয়ান শুনছেন। আমি তখনও হেঁটে চলছি। জুতসই জায়গা পেলে বসে যাব।

হাঁটছি আর সাথীদের মজার সব কাণ্ডকারখানা দেখছি। কেউ খেতে চাইছে না, জোর করে খাইয়ে দিচ্ছে। কেউ বসে আছে তাকে জোর করে বিশ্রামের জন্য শুইয়ে দিচ্ছে। কেউ ঝুটা ফেলার জন্য দস্তরখান ভাঁজ করছে, তার আগেই আরেকজন দস্তরখান উঠিয়ে পরিষ্কার করতে নিয়ে যাচ্ছে, কারও মুখে হাসি না থাকলে পাশের জন মিষ্টি হেসে জিজ্ঞেস করছে ভাইয়ের কি মন খারাপ! এসব দেখে মনে হল, কোনো সন্দেহ নেই ইজতেমার মাঠ তিন দিনের জন্য প্রেম-মমতায়সিক্ত আনন্দের ঝরনা বর্ষিত এক অনাবিল জান্নাতের বাগানে পরিণত হয়েছে। জান্নাত মানেই তো হাসি। জান্নাত মানেই তো সালামান সালামা।

এখনও হাঁটছি। কানে ভেসে আসছে বয়ানের সুর। বিদেশি আলোচক উর্দুতে বলছেন, ‘আমাদের আলেমদের সঙ্গেই থাকতে হবে...।’ মুহূর্তেই মনে পড়ে গেল, আমি ‘খণ্ডিত ইজতেমায়’ এসেছি। হঠাৎ বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। এই যে আমার সামনে যারা হাসি হাসি মুখে পাশের সাথী ভাইয়ের সঙ্গে খোশগল্পে মেতে আছেন, কয়েক বছর আগে তো তারা ইজতেমার অন্য গ্রুপের সাথী ভাইদের সঙ্গেও এমন হাসি-গল্পেই মেতে ছিলেন...।

খুব ইচ্ছা হল, প্রতিটি সাথীকে ধরে ধরে জিজ্ঞেস করি, ভাই আমার! তোমার কী ওই সাথী ভাইয়ের কথা মনে পড়ে না, মনে পড়ে না বহু বছর একসঙ্গে ইজতেমায় এসেছ, একসঙ্গে খেয়েছ, ঘুমিয়েছ, আবার মোনাজাত শেষে একসঙ্গে বাড়ি ফিরে গেছ...। নিজের অজান্তেই দু’চোখ ভিজে উঠল।

ইজতেমার মাটি আলত ছুঁয়ে বললাম, হে মাটি! হাদিস শরিফে নবীজি (সা.) তোমাকে মায়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন। দু’ভাইয়ের দ্বন্দ্বে মায়ের যেমন বুকফাটা কষ্ট হয়, ইজতেমা সন্তানদের লড়াই দেখে তোমারও কি তেমন কষ্ট হয়...?

প্রায় এক ঘণ্টা হাঁটার পর সিলেটের কয়েকজন ভাইয়ের সঙ্গে বসলাম। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম- এটি কাদের ইজতেমা? তিন-চারজন একসঙ্গে বলে উঠল, ওলামা হজরতদের ইজতেমা। ইজতেমার ঐক্য এবং খণ্ডিত ইজতেমা সম্পর্কে মাঠের সাথীদের ভাবনা জানার জন্য কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছি। সাধারণ সাথীরা বলেছে, আমরা অতশত বুঝি না। আলেমরা যে পথে আছেন, আমরাও ওই পথেই আছি।

এক-দু’জন আলেমকে ঐক্যের কথা বলতেই চোখ গরম করে গলা চড়া করে বলেছেন, ইজতেমার নেতৃত্বে আলেমরাই থাকবে। কোনো ধরনের ঐক্য চলবে না।

হায়! নেতৃত্বের জন্যই খোলাফায়ে রাশেদিনের সোনালি শাসনব্যবস্থা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। তাবলিগেও ‘নেতৃত্বের লড়াই’! নেতৃত্ব যে কত ভয়ংকর হতে পারে এবারের ইজতেমায় তা নিজ চোখেই দেখলাম। আমাদের ইজতেমা সবচেয়ে বড় বা এ ইজতেমাই আসল ইজতেমা- এমনটি দেখানোর জন্য রাজধানী ও বিভিন্ন জেলার মাদ্রাসা থেকে ছোট-বড় সব ছাত্রকে বাধ্য করা হয়েছে টঙ্গীতে আসতে। এমন তথ্যও আমাদের কাছে আছে, যেসব ছাত্র ইজতেমায় যাবে না মাদ্রাসায় তাদের খাওয়া বন্ধ, এমনকি ভর্তি বাতিলের ভয়ও দেখানো হয়।

এ বিষয়ে ইজতেমার মিডিয়া জিম্মাদার মুফতি জহির ইবনে মুসলিমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন। কোনো মাদ্রাসা এমনটি করেছে আমাদের জানা নেই। তবে আমরা শুনেছি মাওলানা সাদপন্থীরা কয়েকটি মাদ্রাসার পরিচালককে ম্যানেজ করে ছাত্রদের ইজতেমায় যেতে বাধ্য করেছে। এ জন্য অভিযোগের আঙুল আমাদের দিকেই ওঠে!

আসরের আজান হয়ে গেল। নামাজ পড়ে বাসার উদ্দেশে হাঁটা শুরু করেছি। আবার দীর্ঘ পথ হেঁটে রাস্তায় উঠতে হবে। মঞ্চ থেকে একজন বলছে, এবারের ইজতেমায় বিপুল পরিমাণ বিদেশি মেহমান এসেছে। এত সংখ্যক বিদেশি মেহমানকে সামাল দিতে আমরা হিমশিম খাচ্ছি...। এমন কথা শুনে যে কারোই মনে হবে, বাহ! ইজতেমাওয়ালারা তো বেশ সফলভাবেই দেশ-বিদেশের মানুষ নিয়ে ইজতেমা করছে।

কতজন বিদেশি এসেছেন এবারের ইজতেমায়? যুগান্তরের অনুসন্ধানের সংখ্যাটি পরে জানাচ্ছি। আগে শুনুন ইজতেমার অফিসিয়াল সংখ্যাটি। মুফতি জহির ইবনে মুসলিম বললেন, সব মিলিয়ে প্রায় তিন হাজারের মতো বিদেশি মেহমান এসেছেন। আর এসবির হিসাবে দুই হাজারের বেশি। অথচ যুগান্তরের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসা সংখ্যাটি মাত্র ৪৪০! আরেক হিসাবে বিদেশি মেহমানের সংখ্যা ৯০০-এর কিছু বেশি। যার বেশিরভাগই নিজ দেশে তাবলিগের শুরার নেতৃত্বের পদপ্রার্থী অথবা প্রবাসী বাংলাদেশি।

মুফতি জহির বিষয়টি অস্বীকার করলেও এটা স্বীকার করেছেন, ইজতেমার দ্বন্দ্বের কারণে আগে বহির্বিশ্ব থেকে মুসল্লি আসত ১২ থেকে ১৫ হাজার; কিন্তু খণ্ডিত ইজতেমায় তার অর্ধেকও আসছে না। সোজা কথায়, বিশ্ব ইজতেমা বাংলাদেশের গর্ব-বুক ফুলিয়ে এ কথা বলার সুযোগ পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে এখন।

অসংখ্য মানুষের ভিড় ঠেলে সামনে এগোচ্ছি। বেশিরভাগই মাদ্রাসার ছাত্র। ছোট ছোট ছাত্রের সংখ্যাও ছিল চোখে পড়ার মতো। এক বুক আশা নিয়ে ইজতেমার মাঠে এসেছিলাম। এক পৃথিবী দুঃখ নিয়ে মাঠ থেকে বেরোচ্ছি। ইজতেমার মাঠে-মঞ্চে ঐক্যের কোনো সুর তো পাই-ইনি, উল্টো ভাঙনকে আরও মজবুত করে গেঁথে দেয়া হচ্ছে সাথীদের মনে। সাথীরাও ভাঙনের সবক পেয়েই যেন মহাখুশি!

মুফতি জহিরকে বললাম, আপনি তো যুগান্তর থেকেই লেখালেখি শিখে আজ ইজতেমার মিডিয়া জিম্মাদার হয়েছেন। যুগান্তর চায় কোরআনের আলোয় ঐক্য-ভ্রাতৃত্ব-বন্ধন, যা নবীজির জীবনেও বলা হয়েছে। মুফতি জহির বললেন, কোনো সন্দেহ নেই আমার এ পর্যন্ত আসার পেছনে পুরোটাই যুগান্তরের অবদান। আমরাও চাই মিলেমিশে থাকতে; কিন্তু সেটি হতে হবে আলেমদের নেতৃত্বে, ইমান-আকিদা ঠিক রেখে, কারও কাছে বিকিয়ে দিয়ে নয়।

ইজতেমার মাঠ থেকে বেরিয়ে এলাম। লাখো মোমিনফুলের ভিড়ে আমি নাদান-নাখান্দা কিছু সময় থেকেছি, শেখ সাদীর গল্পের মতো আমার ভেতর জগতে কিছুটা হলেও ইমানি সুবাস ছড়িয়ে পড়ার কথা। কিন্তু হায়! কাগজের ফুলে কি সৌরভ ছড়ায়! লোকদেখানো সমাবেশে কি রুহু তাজা হয়? বিশ্ব ইজতেমা আজ শুধুই খবর, প্রেমপ্রীতির হয়েছে কবর!

লেখক : শিক্ষার্থী, মাদ্রাসা-ই আলিয়া, ঢাকা।

Email : [email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : বিশ্ব ইজতেমা ২০২০

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত