পুণ্য কামাতে গিয়ে শূন্যতা অনুভব
jugantor
পুণ্য কামাতে গিয়ে শূন্যতা অনুভব

  হাফেজ শাহ শরীফ  

১৭ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ইজতেমার ১ম পর্বে জুমার নামাজে লাখো মুসল্লির ঢল। ছবি: যুগান্তর

ইসলাম শান্তির ধর্ম, সম্প্রীতির বন্ধন। ভ্রাতৃত্ব ইসলামের শিক্ষা। এক হয়ে চলা নবীর দীক্ষা। একতা ইসলামের সৌন্দর্য। প্রিয় নবী বলেছেন, বিশ্ব মুসলিম একটি দেহের মতো। শরীরের কোনো অঙ্গ আক্রান্ত হলে পুরো শরীরে ব্যথা অনুভব হয়। আমরা নিজেদের মাঝে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করছি। নিজেদের ঝগড়ার কারণে মুসলিম জাতি আজ খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত।

আল্লাহ আমাদের এক হয়ে তার ইবাদত করার কথা বলেছেন। কোরআনে বলা হয়েছে, তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ কর, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমরা সে নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা আল্লাহ তোমাদের দান করেছেন। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে, অতঃপর আল্লাহ তোমাদের মনে সম্প্রীতি দান করেছেন। ফলে তোমরা তার অনুগ্রহের কারণে পরস্পর ভাই ভাই হয়েছ (সূরা-আল ইমরান-১০৩)।

আফসোস! আমাদরে মধ্যে সম্প্রীতি নষ্ট হয়ে গেছে। এবার টঙ্গীর ময়দান ঘুরে কেমন যেন শূন্যতা অনুভব করলাম। পুণ্যতার অভাব ছিল। একই মাঠে একই শামিয়ানার নিচে এক ইসলামের দাওয়াতে কেন বিভক্তি? সেই মিম্বর থেকে ভ্রাতৃত্বের দাওয়াত আসত সেই মিম্বরের ভাঙনের চিত্র দেখছে পুরো বিশ্ব। কত দরদমাখা কণ্ঠে বলা হতো মুহতারাম দোস্ত বুজোর্গ। বর্তমানে কি সেই বন্ধুত্বের লেশমাত্র আছে?

যেই মাঠ লাখো মুসল্লি আল্লাহু আকবর ধ্বনিতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আল্লাহর সিজদায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, তাদের জন্য ঐক্য গড়া কি কঠিন ব্যাপার? এ বিষয়ে সাধারণ মুসল্লিরা কী ভাবছে? কথা বলছিলাম কয়েকজনের সঙ্গে।

মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, বগুড়া থেকে এসেছেন। তিনি বলেন, দাওয়াতে তাবলিগ ইসলাম প্রচারে অনেক বড় ভূমিকা রাখছে। ইলিয়াস (রহ.) দ্বীনের জন্য যে কোরবানি করে গেছেন, আমাদের উচিত তার মেহনতের কদর করা। তাবলিগের মাধ্যমে অনেক মানুষ দ্বীনের পথে আসতে পেরেছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখার জন্য আমাদের ঐক্য দরকার। তাবলিগের সব কাজ মাশওয়ারার মাধ্যমে সমাধান করা হয়। চলমান পরিস্থিতি মুরব্বিদের মাশওয়ারার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব।

মোহাম্মদ আবদুস সাত্তার জামালপুর থেকে এসেছেন। মাঠে জায়গা না পেয়ে রাস্তার পাশে তাঁবু টানিয়ে অবস্থান নিয়েছেন। দ্বীনের জন্য কষ্ট করছি এতে কোনো খারাপ লাগছে না; কিন্তু আমাদের ঐক্য ভাঙার জন্য আফসোস হয়। এক সময় মুসল্লি বেশি হওয়ার কারণে ইজতেমা দুই পর্বে ভাগ করা হয়েছিল। এটি ছিল দ্বীনের দাওয়াতের বিজয়। আর এখন দু’পক্ষ হওয়ার কারণে বিভক্ত হয়েছে, এটি ইসলামের পরাজয়। তাবলিগে কোনো গ্রুপ থাকবে না এটাই আমি আশা করি।

কলেজপড়ুয়া ছাত্র মুহাম্মদ আল আমিন, সাভার থেকে এসেছেন। ইজতেমার মাঠে প্রবেশপথে পাহারার দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, লাখো মানুষের জমায়েত কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। অজু-গোসল-টয়লেট সব জায়গায় সিরিয়াল। তারপরও কোনো অভিযোগ নেই। এখানে এসে ধৈর্যের শিক্ষা পাচ্ছি।

লিটন সরকার, মালিবাগ থেকে এসেছেন আখেরি মোনাজাতে শরিক হতে। তিনি বলেন, লাখো মানুষের জামাতে শরিক হতে পেরে অনেক আনন্দ লাগছে। পাশাপাশি তাবলিগ জামাতের দু’ভাগে বিভক্ত হওয়াতে মনে কষ্ট পাচ্ছি। টঙ্গীর ময়দান মুসলমানদের মিলনমেলার ঐতিহ্য ছিল। বর্তমানে এ সম্পর্কের ফাটল ধরেছে। আমাদের ঐক্য নষ্ট হয়েছে। মুসলমানদের জন্য এটি কাম্য নয়। এখান থেকে বিশ্ব শান্তি কামনায় মোনাজাত করা হয়। আমরা চাই দু’দল এক হয়ে এক ইজতেমা করবে। তা না হলে বিশ্ব ইজতেমা আর বিশ্ব ইজতেমা থাকবে না একদিন।

প্রতি বছর ইজতেমা শেষে কয়েক হাজার জামাত বের হয় দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার জন্য। দুই দল থেকে দুই ভাগে জামাত বের হলে মানুষের মাঝে বিভক্তি আরও বাড়বে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক মতভেদ আর আধিপত্য ছেড়ে দিয়ে ইসলামের জন্য এক হওয়া দরকার। আল্লাহ আমাদের আগামীতে এক হয়ে বিশ্ব ইজতেমা করার তৌফিক দান করুন।

লেখক : প্রাবন্ধিক

ই-মেইল : mdshahsharif@gmail.com

পুণ্য কামাতে গিয়ে শূন্যতা অনুভব

 হাফেজ শাহ শরীফ 
১৭ জানুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
ইজতেমার ১ম পর্বে জুমার নামাজে লাখো মুসল্লির ঢল। ছবি: যুগান্তর
ইজতেমার ১ম পর্বে জুমার নামাজে লাখো মুসল্লির ঢল। ছবি: যুগান্তর

ইসলাম শান্তির ধর্ম, সম্প্রীতির বন্ধন। ভ্রাতৃত্ব ইসলামের শিক্ষা। এক হয়ে চলা নবীর দীক্ষা। একতা ইসলামের সৌন্দর্য। প্রিয় নবী বলেছেন, বিশ্ব মুসলিম একটি দেহের মতো। শরীরের কোনো অঙ্গ আক্রান্ত হলে পুরো শরীরে ব্যথা অনুভব হয়। আমরা নিজেদের মাঝে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করছি। নিজেদের ঝগড়ার কারণে মুসলিম জাতি আজ খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত।

আল্লাহ আমাদের এক হয়ে তার ইবাদত করার কথা বলেছেন। কোরআনে বলা হয়েছে, তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ কর, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমরা সে নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা আল্লাহ তোমাদের দান করেছেন। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে, অতঃপর আল্লাহ তোমাদের মনে সম্প্রীতি দান করেছেন। ফলে তোমরা তার অনুগ্রহের কারণে পরস্পর ভাই ভাই হয়েছ (সূরা-আল ইমরান-১০৩)।

আফসোস! আমাদরে মধ্যে সম্প্রীতি নষ্ট হয়ে গেছে। এবার টঙ্গীর ময়দান ঘুরে কেমন যেন শূন্যতা অনুভব করলাম। পুণ্যতার অভাব ছিল। একই মাঠে একই শামিয়ানার নিচে এক ইসলামের দাওয়াতে কেন বিভক্তি? সেই মিম্বর থেকে ভ্রাতৃত্বের দাওয়াত আসত সেই মিম্বরের ভাঙনের চিত্র দেখছে পুরো বিশ্ব। কত দরদমাখা কণ্ঠে বলা হতো মুহতারাম দোস্ত বুজোর্গ। বর্তমানে কি সেই বন্ধুত্বের লেশমাত্র আছে?

যেই মাঠ লাখো মুসল্লি আল্লাহু আকবর ধ্বনিতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আল্লাহর সিজদায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, তাদের জন্য ঐক্য গড়া কি কঠিন ব্যাপার? এ বিষয়ে সাধারণ মুসল্লিরা কী ভাবছে? কথা বলছিলাম কয়েকজনের সঙ্গে।

মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, বগুড়া থেকে এসেছেন। তিনি বলেন, দাওয়াতে তাবলিগ ইসলাম প্রচারে অনেক বড় ভূমিকা রাখছে। ইলিয়াস (রহ.) দ্বীনের জন্য যে কোরবানি করে গেছেন, আমাদের উচিত তার মেহনতের কদর করা। তাবলিগের মাধ্যমে অনেক মানুষ দ্বীনের পথে আসতে পেরেছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখার জন্য আমাদের ঐক্য দরকার। তাবলিগের সব কাজ মাশওয়ারার মাধ্যমে সমাধান করা হয়। চলমান পরিস্থিতি মুরব্বিদের মাশওয়ারার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব।

মোহাম্মদ আবদুস সাত্তার জামালপুর থেকে এসেছেন। মাঠে জায়গা না পেয়ে রাস্তার পাশে তাঁবু টানিয়ে অবস্থান নিয়েছেন। দ্বীনের জন্য কষ্ট করছি এতে কোনো খারাপ লাগছে না; কিন্তু আমাদের ঐক্য ভাঙার জন্য আফসোস হয়। এক সময় মুসল্লি বেশি হওয়ার কারণে ইজতেমা দুই পর্বে ভাগ করা হয়েছিল। এটি ছিল দ্বীনের দাওয়াতের বিজয়। আর এখন দু’পক্ষ হওয়ার কারণে বিভক্ত হয়েছে, এটি ইসলামের পরাজয়। তাবলিগে কোনো গ্রুপ থাকবে না এটাই আমি আশা করি।

কলেজপড়ুয়া ছাত্র মুহাম্মদ আল আমিন, সাভার থেকে এসেছেন। ইজতেমার মাঠে প্রবেশপথে পাহারার দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, লাখো মানুষের জমায়েত কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। অজু-গোসল-টয়লেট সব জায়গায় সিরিয়াল। তারপরও কোনো অভিযোগ নেই। এখানে এসে ধৈর্যের শিক্ষা পাচ্ছি।

লিটন সরকার, মালিবাগ থেকে এসেছেন আখেরি মোনাজাতে শরিক হতে। তিনি বলেন, লাখো মানুষের জামাতে শরিক হতে পেরে অনেক আনন্দ লাগছে। পাশাপাশি তাবলিগ জামাতের দু’ভাগে বিভক্ত হওয়াতে মনে কষ্ট পাচ্ছি। টঙ্গীর ময়দান মুসলমানদের মিলনমেলার ঐতিহ্য ছিল। বর্তমানে এ সম্পর্কের ফাটল ধরেছে। আমাদের ঐক্য নষ্ট হয়েছে। মুসলমানদের জন্য এটি কাম্য নয়। এখান থেকে বিশ্ব শান্তি কামনায় মোনাজাত করা হয়। আমরা চাই দু’দল এক হয়ে এক ইজতেমা করবে। তা না হলে বিশ্ব ইজতেমা আর বিশ্ব ইজতেমা থাকবে না একদিন।

প্রতি বছর ইজতেমা শেষে কয়েক হাজার জামাত বের হয় দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার জন্য। দুই দল থেকে দুই ভাগে জামাত বের হলে মানুষের মাঝে বিভক্তি আরও বাড়বে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক মতভেদ আর আধিপত্য ছেড়ে দিয়ে ইসলামের জন্য এক হওয়া দরকার। আল্লাহ আমাদের আগামীতে এক হয়ে বিশ্ব ইজতেমা করার তৌফিক দান করুন।

লেখক : প্রাবন্ধিক

ই-মেইল : mdshahsharif@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : বিশ্ব ইজতেমা ২০২০

১৮ জানুয়ারি, ২০২০