হজরত সুরেশ্বরীর স্বপ্ন ব্যাখ্যা

  প্রফেসর ড. আনিসুজ্জামান ৩১ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

হজরত জান শরিফ (র.)-এর নাম এ অঞ্চলে সুবিদিত। তিনি একজন বড় মাপের সুফিসাধক হিসেবে পরিচিত। আমি আমার এ ক্ষুদ্র প্রবন্ধে সেদিকে যাব না। আমি বলতে চাইব, হজরত জান শরিফ শাহ সুরেশ্বরী (র.) একজন বড় মাপের দার্শনিক ও মনোবিজ্ঞানী ছিলেন। আমার এ বক্তব্যের সমর্থনে আমি স্বপ্ন সম্পর্কে তার ধারণাটি তুলে ধরব।

স্বপ্ন একটি রহস্যময় ও দুর্জ্ঞেয় প্রপঞ্চ। বিভিন্ন দার্শনিক ও মনোবিজ্ঞানীরা নানাভাবে স্বপ্ন দেখার কারণ, স্বপ্নের বিষয়বস্তু ও ব্যাখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। অনেকে স্বপ্নকে কোনো গুরুত্বই দেননি। কেউবা স্বপ্নকে বিকারগ্রস্ত মানুষের এক ধরনের প্রতীকী প্রকাশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বিশ্ববিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ফ্রয়েড স্বপ্ন নিয়ে অনেক আলোচনা করেছেন। তিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে চেতনার জগতকে চার স্তরে ভাগ করেছেন : যথা- ১. অচেতন স্তর, ২. চেতন স্তর, ৩. সচেতন স্তর এবং ৪. আত্মসচেতন স্তর। তার মতে, স্বপ্নের সম্পর্ক মানব মনের অবচেতন স্তরের সঙ্গে। নানা পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কারবশত আমরা আমাদের মনের সম্যক অবস্থাকে জনসমক্ষে পূর্ণভাবে তুলে ধরি না। এসব সংস্কারবশত পাছে নিন্দিত হই, এ আশঙ্কায় আমরা আমাদের মনের জগতের অনেক কিছুই অবদমন করি- মনের সচেতন স্তর থেকে আমাদের অবচেতন স্তরে পাঠিয়ে দেই। ঘুমের সময় যখন আমরা একটু রিলাক্সড হই, তখন সেই অবচেতন স্তরের অনেক কিছুই স্বপ্নের আকারে সামনে আসে। তাই তো আমরা অনেক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখি। আমরা এমন স্বপ্ন দেখি, যেগুলো আমরা সচেতন অবস্থায় ভাবতেই চাই না, এমনকি পারি না। ফ্রয়েডের মতে স্বপ্ন অবদমিত মানসিক স্তরের সচেতন স্তরে উঠে আসা। তার মতে, মানুষের পূর্ণ ব্যক্তিত্ব বোঝার জন্য তাই প্রয়োজন মনঃসমীক্ষণ।

এখন আমরা দেখব হজরত জান শরিফ (র.) স্বপ্ন সম্পর্কে কী বলেছেন? তার মতে, মানব জীবনে স্বপ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। এটি কেবল বা কোনো অবদমনের ফল নয় বরং একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব, কর্ম ও পরিবেশের সঙ্গে ক্রিয়া-প্রক্রিয়াজাত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তার চিন্তায় অবদমনের ধারণাটি অমূলক। বস্তুত, স্বপ্ন জ্ঞানের, বিশেষ করে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের একটি উৎস। তাই তো সত্য স্বপ্নকে নবুয়তের অংশ বলা হয়েছে। স্বপ্নের মাধ্যমে অনেক গূঢ রহস্য উন্মোচিত হয়। তবে, এ ক্ষেত্রে যে স্বপ্ন দেখছে, তার ব্যক্তিত্ব, সৎ চিন্তা ও যাপিত জীবন খুব গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে স্বপ্ন একদিকে প্রতীকী, অপরদিকে তা সত্যের দ্যোতক। তার মতে, স্বপ্নে আমাদের আত্মা শারীরিক বন্ধন থেকে অনেকটা মুক্ত হয় এবং এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তার আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ বা অপকর্ষ অনুযায়ী অনেক জিনিস প্রত্যক্ষ করে। হজরত জান শরিফের (র.) কথায় : স্বপ্ন জগৎ একটি রুহানি এলাকা। মানুষ যখন নিদ্রা যায়, তখন রুহ বা আত্মার বোধশক্তি প্রসারিত হয়ে যায় এবং হিকমতে জাতিয়ার বা মূল সত্তার কৌশলীক রূপ প্রকাশ পায়। হাকিকতে রুহিয়া বা আত্মার সত্য রূপ যা সমগ্র পৃথিবীকে ঘিরে রেখেছে, তার মাধ্যমে সর্বত্র আপন অস্তিত্ব প্রদর্শন করে।

কাজেই দেখা যাচ্ছে, ফ্রয়েড যেখানে স্বপ্নকে একটি অবদমনমূলক প্রপঞ্চ হিসেবে দেখেছেন, সেখানে হজরত জান শরিফ (র.) এটিকে যেমন বিভিন্ন স্তরে নিয়ে গেছেন, তেমনই সে জগতের প্রকৃতি অনুযায়ী স্বপ্নে দৃষ্ট জিনিসকে ব্যাখ্যা করেছেন। যেসব মানুষের সম্পর্ক কেবল ‘আলমে নাসুত’ বা নশ্বর জগতের সঙ্গে তাদের স্বপ্ন সে স্তরের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় এবং সে হিসেবে সেসব স্বপ্ন সীমিত ও নিুস্তরের হয়। অপরদিকে যারা আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে পরিচ্ছন্ন ও উঁচু মর্যাদার অধিকারী, তাদের স্বপ্ন আধ্যাত্মিক জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় এবং অনেক অজানা জিনিসের আগাম জানান দেয়। তার কথায়, আহলে বাতিন বা আধ্যাত্মবাদীদের অবস্থা এর বিপরীত। তারাও স্বপ্ন দেখেন, যা সত্য হয়। আর যদি, কখনও কোনো বিপরীত কিছু হয়, তবে তার কারণ, সে সময় সেই আহলে বাতিন ব্যক্তি জাগতিক পর্দায় আবৃত অথবা আড়াল করা অবস্থায় ছিলেন।

ওপরের আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, হজরত জান শরিফ (র.) স্বপ্নকে জ্ঞানের একটি অন্যতম উৎস হিসেবে দেখেছেন, এবং স্বপ্ন যে আধ্যাত্মিক অনেক কিছুই ব্যাখ্যা করে সে সম্বন্ধে আমাদের অবহিত করেছেন। আমরা যদি পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণ থেকে বেরিয়ে আসতে পারি, তাহলে দেখব, হজরত জান শরিফ (র.)-এর কাছে ফ্রয়েড একজন অপরিপক্ব ব্যক্তি যার জ্ঞান অতি সীমিত।

প্রিয় পাঠক, ফেব্রুয়ারি ৩, ৪ ও ৫ বা ১৯, ২০ ও ২১ মাঘ হজরত সুরেশ্বরীর ১৪৭তম উরস শরিফ উদযাপিত হবে। আহলে বায়াত প্রেমিকদের আমন্ত্রণ থাকল।

লেখক : ভাইস চ্যান্সেলর, গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, বরিশাল

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত