বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস পড়ানো হোক কওমি মাদ্রাসায়

  আমিনুল ইসলাম হুসাইনী ২৭ মার্চ ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাধীনতা। ছোট্ট একটি শব্দ; কিন্তু এর তাৎপর্য আকাশের চেয়েও বিশাল। ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি আজকে আমরা যতটা সহজে বলতে পারছি, ততটা সহজে কিন্তু এর মালিকানা আমরা পাইনি।

এর জন্য কোরবানি দিতে হয়েছে প্রায় ত্রিশ লাখ বাঙালির তাজা প্রাণ।

হারাতে হয়েছে অগণিত মা-বোনদের সম্ভ্রম। যুদ্ধের দাবানলে পুড়ে ছারখার হয়েছে আমাদের বিস্তৃত ফসলের মাঠ, নিরীহ পশু-পাখি, তিল তিল করে গড়ে তোলা বাড়িঘর। সেই সাগর সাগর রক্ত দিয়ে কেনা এ স্বাধীনতা মামুলি কোনো বিষয় নয়।

পাকিস্তানি হানাদারদের কবল থেকে আমাদের এ মাতৃভূমিকে মুক্ত করার লক্ষ্যে, বাংলার সূর্যসন্তানরা টানা নয় মাস যে যুদ্ধ করেছেন, সেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ওজন যৎসামান্য নয়। এ ইতিহাস, আমাদের পূর্ব পুরুষদের রক্তের অক্ষরে লেখা ইতিহাস। তাদের রেখে যাওয়া আমানত।

এ আমানতের জিম্মাদারি করা আমাদের নৈতিক কর্তব্য। আর এ কর্তব্য পালন হবে তখনই, যখন স্বাধীনতার এ ইতিহাসকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দেয়া হবে; কিন্তু আফসোসের বিষয়, আমরা এ কর্তব্য থেকে সম্পূর্ণ গাফেল। আর তাই এ মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে পারছে না নতুন প্রজন্মের অনেকেই। এ অবক্ষয়ের সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে পাঠ্যবইয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে উপেক্ষা করা।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার যে ক’টি ধারা আছে, তার সবক’টির সিলেবাসেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে উপেক্ষিত করা হয়েছে। সবচেয়ে হতাশার কথা হল আমাদের কওমি মাদ্রাসার সিলেবাস নিয়ে। সেই শতাধিক বছরের আগের কারিকুলামে পরিচালিত এ শিক্ষাব্যবস্থার পাঠ্যবইগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শূন্যের ঘরে। অথচ এ মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের সমান অংশীদার কওমি আলেমরাও।

ইতিহাস সাক্ষী। একই ধর্মের মানুষ হিসেবে ভাই ভাই হয়ে বসবাস করার যে আশা আমরা করেছিলাম, যে ইসলামী জীবনাদর্শের কথা ভেবে পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলাম, পাকিস্তানিরা সে আশাকে নিরাশায় পরিণত করেছিল অল্প ক’দিনেই। পাকিস্তানের নেতারা ভুলে গেল তাদের প্রদত্ত ওয়াদার কথা। ওরা মুখে মুখে ধর্মকে আলিঙ্গন করে রাখলেও কার্যত অধর্মের ডালপালা বিস্তার করতে শুরু করে দেয়।

ওরা এ দেশের সম্পদ পাচার করে নিজেদের দেশকে সমৃদ্ধ করেছে। আর আমাদের উপহার দিয়েছে ক্ষুধা-দারিদ্র্যের বরণডালা। লাখো মানুষকে মরতে হয়েছে ক্ষুধার জ্বালায়। ওরা আমাদের বাঁচার মতো বাঁচতে দেয়নি। আমরা যেন ছিলাম তাদের খেলার পুতুল। নিজ ভূমে থেকেও ছিলাম পরাধীন। আমাদের মান-সম্মানকে ওরা বুটের তলায় পিষ্ট করেছে। আমাদের প্রতিবাদী কণ্ঠকে করতে চেয়েছে রুদ্ধ।

ব্রিটিশ শোষকদের প্রেতাত্মা যেন ভর করেছিল তাদের ওপর। ঔদ্ধত্যা তাদের এতটাই অন্ধ করে দিয়েছিল যে, এ দেশের শত বছরের নির্যাতিত-নিপীড়িত সহজ-সরল মানুষের বুকে গুলি চালাতেও তারা দ্বিধাবোধ করেনি। পাকিস্তানি শোষকদের এ নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো ছিল আমাদের অবশ্য কর্তব্য। কেন না আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত, যারা ন্যায়ের প্রতি আহ্বান করবে, ভালো কাজের নির্দেশ করবে এবং প্রতিরোধ করবে অন্যায়ের। আর তারাই হল সফলকাম।’ (সূরা : আল ইমরান, ১০৪)।

কোরআনের এ শাশ্বত বাণীর আলোয় আলোকিত আলেমরা তখন পাকিস্তানি হানাদারদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। স্বাধীনতার লক্ষ্যে যুদ্ধ করেছেন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের জন্য, স্বাধীন মানচিত্রের জন্য কোরবানি দিয়েছেন নিজেদের জীবন। তাদের সেই ত্যাগের বিনিময়ে আল্লাহ আমাদের যে স্বাধীনতা উপহার দিয়েছেন, তা আমাদের জন্য অপার নেয়ামত। আর এ নেয়ামতের শুকরিয়ার ধারা তখনই প্রবহমান থাকবে, যখন প্রজন্মের পর প্রজন্মকে এ ইতিহাস জানানো হবে। পড়ানো হবে।

কওমি মাদ্রাসার পাঠ্য তালিকায় ‘তারিখ উল ইসলাম’, ‘তারিখ ই মিল্লাত’র মতো ‘স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস’ পড়ানোও সময়ের দাবি। আলহামদুলিল্লাহ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কওমি মাদ্রাসার ‘দাওরা’র সনদকে মাস্টার্সের সমমান মূল্যায়ন করেছেন। এর যথার্থ পুরস্কার আল্লাহতায়ালা তাকে নিশ্চয় দেবেন। কিন্তু আমরা যারা এ ডিগ্রি অর্জন করে চাকরির বাজারে যাব, তাদের জন্য থাকবে লাল সংকেত।

কারণ, দীর্ঘ বারো বছর এত এত কিতাব পড়ে নানা বিষয়ে জানা হলেও জানা হয়নি নিজেদের ইতিহাস। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস। আর চাকরির বাজারে এ বিষয়টি পাস কাটিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগই নেই। চাকরির কথা বাদ দিলেও বাদ দেয়া যাবে না এ মহান ইতিহাসকে। কারণ যে জাতি নিজেদের ইতিহাস ভুলে যায়, সে জাতির ওপর গজব হয়ে ভর করে অন্য কোনো জাতি। তাই তো পবিত্র কোরআনে অনেক বড় অংশজুড়ে রয়েছে পূর্ববর্তী বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর উত্থান-পতনের ইতিহাস। এসব ইতিহাস স্মরণ করানোর লক্ষ্যে আল্লাহতায়ালা জোর তাগিদ দিয়ে বলেছেন, ‘উজকুরু’ বা স্মরণ কর।

কাফেরদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের যেসব হক বাতিলের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, আল্লাহতায়ালা সেসবের বিবরণও তুলে ধরেছেন বিভিন্ন সূরায়। পবিত্র কোরআনের সূরা তাওবায় হুনায়নের যুদ্ধ, সূরা আনফালে বদরের যুদ্ধ, সূরা আহযাবে খন্দকের যুদ্ধের ঘটনাবলী আলোচিত হয়েছে বিশদভাবে।

কোরআন মাজিদের এসব ইতিহাস সংশ্লিষ্ট বিবরণ প্রমাণ করে, কোনো জাতির উন্নতির জন্য, পতন বা ধ্বংস থেকে বাঁচার জন্য পূর্ববর্তীদের ইতিহাস জানা এবং তা থেকে শিক্ষা নেয়ার বিকল্প নেই। আমাদের বোঝা দরকার, কওমি মাদ্রাসার প্রতিটি শিক্ষার্থীই স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস জানতে ও পড়তে চাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে কসবা দারুল উলুম মাদ্রাসার শরহে বেকায়াহর (উচ্চমাধ্যমিক) এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘মাদ্রাসায় সিলেবাসে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নেই। তবে অনেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার জন্য আউট বই পড়েন। বিষয়টি পাঠ্য হলে আমাদের জন্য অনেক ভালো হবে।’ সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের হক আছে এ মহান ইতিহাস জানার, হৃদয়ঙ্গম করার। মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্বে যারা আছেন, তারা সেই হক পূরণে গড়িমসি করছেন না তো?

আরেকটি বিষয় হচ্ছে, যে পতাকার জন্য সাগর সাগর রক্ত ঢাললেন আমাদের সূর্যসন্তানরা, সেই পতাকাও উড্ডীন হয় না অনেক কওমি মাদ্রাসায়। কিন্তু কেন? পতাকা উড্ডীন করা কিনা জায়েজ? অথচ ইসলামের প্রতিটি অভিযানেই ছিল কালেমার পতাকা। সেনাপতিরা সেই পতাকাকে নিজেদের জীবনের বিনিময়ে হলেও উড্ডীন রাখতেন। তাহলে আমরা কেন পতাকা উড়াব না? সেই পতাকা ছিল ইমানের পতাকা। আর এ পতাকা হল দেশপ্রেমের পতাকা। দেশপ্রেম তো ইমানেরই বহিঃপ্রকাশ। ইসলাম কোনো কোণঠাসা ধর্ম নয়, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ বিধানের নাম। সেই ইসলামই দেশপ্রেমকে ইমানের অংশ বলে ঘোষণা করেছে।

আর বলেছে, ‘আল্লাহর পথে একদিন ও এক রাত সীমান্ত পাহারা দেয়া এক মাস পর্যন্ত সিয়াম পালন ও এক মাস ধরে রাতে সালাত আদায়ের চেয়ে বেশি কল্যাণকর। যদি এ অবস্থায় সে মৃত্যুবরণ করে তাহলে যে কাজ সে করে যাচ্ছিল, মৃত্যুর পরও তা তার জন্য অব্যাহত থাকবে, তার রিজিক অব্যাহত থাকবে, কবর-হাশরের ফিতনা থেকে সে নিরাপদ থাকবে।’ (মুসলিম শরিফ, ১৯১৩)।

যদি আমাদের দেশের প্রত্যেকটি মাদ্রাসায় স্বাধীনতার এ পতাকা উড়ত, তাহলে মাদ্রাসাগুলোর ভাবমূর্তি জনসাধরণের কাছে আরও বেশি উজ্জ্বল হতো। বন্ধ হতো মাদ্রাসাবিরোধীদের বিষোদগার। আর খোদ সরকারই হতেন মাদ্রাসার প্রধান পৃষ্ঠপোষক। তখন আর কারও সাহস হতো না এ কথা বলার, ‘মাদ্রাসা জঙ্গি প্রজনন কেন্দ্র’।

বিষয়গুলো ভেবে দেখার বিনীত অনুরোধ মাদ্রাসা সম্পৃক্ত বোদ্ধাদের কাছে।

লেখক : প্রাবন্ধিক

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত